• রবিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৭ সকাল

সঞ্জীব’দা, হাত বাড়ালেই দেখি নেই কেউ নেই

  • প্রকাশিত ০১:৫৬ দুপুর নভেম্বর ১৯, ২০২১
সঞ্জীব চৌধুরী
কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, প্রতিরোধ যোদ্ধা ও শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী/ ছবি: সংগৃহীত

কত কিছুই না সঞ্জীব চৌধুরী হতে পারতেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের এই ছাত্র প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার লোভনীয় চাকরি হাতের মুঠোয় ছিল। আরও কত প্রলোভনের হাতছানি। কিন্তু তিনি জীবন জুড়েই যেন কড়া নাড়লেন ভুল দরজায়

যখন চলে লাগাতার প্রাণহীন সৃষ্টি, অন্তঃসারশূন্য প্রকাশ, তখন একই সঙ্গে নিজের স্বপ্ন ও অন্তরের কথা বলা সত্ত্বা সঞ্জীব চৌধুরী। গান দিয়ে লড়তে পারেন দেশ ও দুনিয়ার সব জুলুমের বিপক্ষে। সে বারুদ কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, প্রতিরোধ যোদ্ধা ও শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস ১৯ নভেম্বর।

২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর মাত্র ৪২ বছর বয়সে মস্তিকে রক্তক্ষরণজনিত কারণে অ্যাপোলো হসপিটালে চিকিৎসাধীন সঞ্জীব চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

শুধু রকই কি উদ্দীপ্ত করে মানুষকে? আছে এর নিশ্চয়তা? শুধু মন জানে তা। আর টের পায় সময়। সঞ্জীব চৌধুরী ও দলছুটের গানে ঐ অর্থে গিটার ও ড্রামর্স উচ্চকিত নয়। কিন্তু এর ধার ও ভার রককেও ছাড়িয়ে যায়।

১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রের পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার ও খুন হওয়া দিনাজপুরের ইয়াসমীনকে নিয়ে সঞ্জীব চৌধুরীর লেখা ও গাওয়া “আহ ইয়াসমীন” এরই স্মারক।

ইয়াসমীন খুনের পর সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানে দিনাজপুর হয়েছিল এক পবিত্র মুক্তাঞ্চল। উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন দেয়। হাজারো মানুষের দ্রোহী মিছিলের শহর হয় এ জনপদ। বলা যায় পালায় বা রাষ্ট্রের ভাষায় “বদলি করা হয়” জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে। টানা ৭ দিন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মুক্ত ছিল দিনাজপুর। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বিরল ঘটনার সাক্ষ্য এই দিনাজপুর। জনতার এমন উত্থানে সাংগীতিক সংহতি দিয়েছিলেন একমাত্র সঞ্জীব চৌধুরী ও তার গানের দল দলছুট।

এভাবেই বারুদ ও প্রেম একসঙ্গে ধারণে সক্ষম ছিলেন অনন্য সঞ্জীব চৌধুরী। রূপে অন্ধ করে দেওয়া মেয়ের প্রতি নৈবদ্য সাজাতে পারেন। আবার “চল বুবাইজান” গানে প্রান্তিক গ্রামের ভিজিএফ কর্মসূচি বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে দরিদ্রের হক লুটের রাষ্ট্রীয় আয়োজন তিনি উন্মোচন করেন। কিসে মুগ্ধ হয় তার এই বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা? গানে তো বলেন না সে কথা, “আমি কাউকে বলিনি সে নাম, কেউ জানে না, না জানে আড়াল…”

সঞ্জীব’দাকে প্রথম দেখি সম্ভবত ফার্মগেটে। লাল দোতলা বাস থেকে চাদর গায়ে মানুষটি নামলেন ধুপ করে। তখন একুশে টিভি এসে গেছে। দলছুটের “আমি তোমাকেই বলে দেব”, “তুমি আমার বায়ান্ন তাস” ব্যাপক হিট। অবাক লাগে মানুষটির ব্যক্তিগত গাড়ি নেই দেখে। আমি দৈনিক সমকালের ফিচার বিভাগে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে ২০০৫ সালে কাজ শুরু করি। খুব বেশি যাওয়া হতো না দাদার শেষ কর্মস্থল যায়যায়দিনে। তার সঙ্গে আমার স্মৃতিও হাতেগোনা। কনসার্টে দেখেছি কয়েকবার। ছাত্র ইউনিয়ন, কফিল আহমেদ ও তার বন্ধুদের আয়োজিত “কনসার্ট ফর ফাইটার্স” এ ছিলাম সামনের সারিতে। বিএনপিশাসিত, ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ত্রাসের ভেতর রাজু ভাস্কর্যের সামনে এ গানের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সে কনসার্টে সঞ্জীব চৌধুরী গানের মাঝে বিপ্লবী কর্নেল তাহেরকে হত্যার জন্য জিয়াউর রহমানকে অভিযুক্ত করেছিলেন। তখন মনে হয়েছিলো একটি মানুষ যখন কালাশনিকভ হয়ে ওঠেন তখনই সম্ভব এমন নির্মম সত্য উচ্চারণের।

২০০৬ সালে তারেক মাসুদ ভাইয়ের “অর্ন্তযাত্রা” ছবির প্রিমিয়ারে ব্রিটিশ কাউন্সিলে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছিলাম তাকে। শো শেষ হবার পর দাঁড়িয়েছিলেন সবুজ ঘাসের লনে। পাশাপাশি দুটি জটলায় ছিলাম আমরা। আমরা মানে তৎকালীন শাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থী, সংস্কৃতি কর্মী ও “আজ মুক্তমঞ্চ” এর সংগঠক সরদার জার্জিস আলম জেরী ও তার সহযোদ্ধা স্নেহভাজন কবি শান্ত মুসাফির।

সঞ্জীব’দা সিগারেটে আগুন চাচ্ছিলেন। কিন্তু ম্যাচ বা লাইটার ছিল না তার কাছে। আমাদের জটলায় উল্টোটা। লাইটার পকেটে কিন্তু সিগারেট ছিল না। দুই জটলায় তখন বিনিময় হয়। খুব কাছ থেকে সম্মিলিত ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সঞ্জীব চৌধুরীকে দেখি।

জীবতকালেই দাদা হয়েছিলেন মিথ। তার গান, কবিতা, সৃষ্টিশীল সাংবাদিকতা ও জীবনাচরণ সব নিয়েই আমরা কথা বলতাম। আমাদের প্রজন্মকে একটা বড় ধাক্কা দেন তিনি ও তার ব্যান্ড দলছুট। বিভিন্ন উপলক্ষে এখনও তার গান গাইতে হয়।

তার অকালে চলে যাওয়াকে মনে হয় একরকম স্বেচ্ছামৃত্যু। কারণ গানেই তো বলে গেছেন, “দড়ির টানে বেঁচে থাকা ভালো লাগে না…এই মরে মরে বেঁচে থাকা ভালো লাগে না।”

কত কিছুই না সঞ্জীব চৌধুরী হতে পারতেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের এই ছাত্র প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার লোভনীয় চাকরি হাতের মুঠোয় ছিল। আরও কত প্রলোভনের হাতছানি। কিন্তু তিনি জীবন জুড়েই যেন কড়া নাড়লেন ভুল দরজায়। দশ, পাঁচটি মানুষের চেয়ে হাঁটলেন স্বকীয় পথে।

সাংবাদিকতায় ছিলেন তুখোড় সৃষ্টিশীল। তার সম্পাদিত আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায়যায়দিনের ফিচার পাতাগুলো সে সাক্ষ্যই বহন করে।

শুধু মানুষ না শঙ্খচিলেরও কান্না শোনা এই মানুষটিকে প্রয়াণ দিবসে ও আরও অনেক সময়ে মনে পড়বে বারবার।

সঞ্জীব’দা তার দেহটি পর্যন্ত গবেষণার জন্য দান করে গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য। সঞ্জীবহীন সঙ্গীত, শিল্প, সাহিত্য কেবল “আমি তুমিতে” ভরা। খুঁজে পাইনা তাতে সবার যূথবদ্ধতার “আমরা” হয়ে উঠবার ডাক। এখনের প্রহরে তাই ''হাত বাড়ালেই দেখি নেই কেউ নেই . . ."


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail