Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

করোনা মহামারি এবং ডাক্তারদের নৈতিকতা প্রসঙ্গ

যতদূর সম্ভব সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পাওয়া ডাক্তারদের অধিকার। কিন্তু মহামারির সময় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ১০:৪৩ পিএম

যতদূর সম্ভব সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পাওয়া ডাক্তারদের অধিকার। কিন্তু মহামারির সময় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নমহামারির সময়ে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের নৈতিক দায়িত্ব কী এবং ডাক্তাররা কতটুকু ঝুঁকি নিতে পেশাগতভাবে বাধ্য-বিষয়টি নিয়ে অনেক দেশেই বিতর্ক হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের বিধিমালা অনুযায়ী, ডাক্তার রোগীদের জরুরি চিকিৎসা দিতে বাধ্য। এক্ষেত্রে তারা “যদি ও কিন্তু” (without any ifs or buts) এর অজুহাত দিতে পারবেন না। ডাক্তাররা কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার সময় এই ধরনের শপথ গ্রহণ করতে হয়।

সন্দেহ নেই, দেশে করোনা রোগীরা এবং তাদের পরিবার-পরিজন ডাক্তারদের ওপর মোটেও ভরসা করতে পারছেন না।

তারা হাসপাতালে যাওয়ার ভয় করছেন। হাসপাতাল থেকে রোগ নিয়েও কেউ কেউ পালিয়ে গেছেন। এই দুর্যোগের সময় ডাক্তারদের ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় 

বাংলাদেশে প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় করোনা আক্রান্ত ৩১ জন যেখানে স্পেন ও ইতালিতে ৪০০০ এর ওপর। ইউরোপ আমেরিকার তুলনায় দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব অতি নগন্য। আমি ডেনমার্ক প্রবাসী, এখানে ৫৬ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৯ হাজার আক্রান্ত। আমার প্রতিবেশী ও সহকর্মীর মধ্যে অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি তবু এদেশের মানুষের মতো এতো আতঙ্কে ভুগিনি।

এতো কম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানুষ এতো আতংকিত কেন? এই প্রশ্ন অনেকের কাছে করেছি। তারা একই কথা বলে, তাদের মৃত্যু ভয়ে অস্থির নয়, তারা সামাজিক ভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে আতংকিত। তারা বেশি ভয় পায় হাসপাতালে যাওয়ার। দেশের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরার ভয় অতটা করছে না। ভয় করছে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার। বিনা চিকিৎসায় মর্যাদাহীন মৃত্যুকে। আগে কুষ্ঠরোগ হলে, রোগীকে জঙ্গলে ফেলে আসা হতো। করণে আক্রান্ত হওয়ার ভয় সেই রকম।

যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে গেছেন, তারা হাসপাতালের অবস্থা বিভীষিকাময় বলেছেন। যমুনা টিভির একজন সাংবাদিক লিখেছেন, “ওয়ার্ডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ পড়ে থাকে, চিকিৎসক কয়েকদিন পর একবার আসে, কোনো প্রকার সাহায্য করে না।”

চিকিৎসকের পেশা একটা মানবিক পেশা। ডাক্তারদের এই পেশায় একচ্ছত্র অর্থাৎ তাদের বিকল্প নেই। ডাক্তার তাদের সেবা শুধু মানবিক কারণে দেন না। তারা সেবা দিতে বাধ্য এমনকি ঝুঁকি থাকলেও। মার্কিন মেডিকেল এসোসিয়েশনের বিধিমালায় বলা হয়েছে, একজন ডাক্তারের রোগীদের জরুরি সেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে এমনকি মহামারির সময়েও। এই বিধিমালা সৈনিকদের বাধ্যবাধকতার মতো। তাদের যুদ্ধে যেতেই হবে, হেরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও।

দেশের ডাক্তারদের একটা অংশ তাদের নৈতিক দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেন। কিন্তু ডাক্তারদের একটা বড় অংশ স্বাভাবিক সময়েও তাদের দায়িত্ত্ব পালন করে না. দেশের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত ডাক্তারদের উপর আস্থা রাখেন না। সর্বস্তরের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী হন।

জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের একজন ডাক্তার রোগী কন্সালটেন্সিতে   মাত্র ৪৮ সেকেন্ড সময় দেন  যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকায় ১৫ থেকে ২২ মিনিট সময় দেন। এতে মনে হয় দেশে ডাক্তারগণ অনেকটা রোগের বিবরণ না শুনেই ব্যাবস্থাপত্র লেখেন।  ডাক্তার ভালো সময়েও দায়িত্ত্ব পালন করেন না, আর করোনার ঝুঁকির সময় কর্তব্য পালন করবে আশা করা যায় না। ডাক্তারদের দায়িত্ব অবহেলায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ডাক্তার আনার কথাও ভেবেছিলেন। 

মানব সভ্যতা বিকাশের আগেরকালে মহামারির সময়ে নিজের জীবন বাঁচাতে ডাক্তারদের পালানোর ঘটনা ঘটেছে।  ১৬০ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দ  পর্যন্ত রোমে আন্তোনিন প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ওই সময় রোমের বেশিরভাগ ডাক্তার পালিয়ে আত্মগোপন করে। ১৩৮২ সালে প্লেগের আবার প্রাদুর্ভাব ঘটে। ওই সময়ও ভেনিস থেকে ডাক্তাররা পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ওই আইন করে তাদের পালানো বন্ধ করা হয়। আমেরিকায় ইয়েলো ফিভারের  আতঙ্কেও ডাক্তাররা শহর থেকে গ্রামে পালিয়ে যায়। এরপর ১৮৪৭ সালে আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ডাক্তারদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিধিমালা তৈরি করে। এই বিধিমালা অনুযায়ী দুর্যোগের সময় ডাক্তারদের কাজ থেকে বিরত থাকে না।

আধুনিক যুগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে পালানোর উদাহরণ কম। করোনার সময় দুই একটা দেশে সীমিত পর্যায়ে ধর্মঘট হয়েছে। কিন্তু ব্যাপক কর্মবিরতি ঘটেনি।

দেশে ডাক্তাররা তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার ডাক্তারদের আছে। ফায়ার সার্ভিসে কর্মীদের আগুনের মধ্য থেকে জীবনরক্ষা করার কর্তব্য আছে কিন্তু তাদের আগুন থেকে বাঁচার উপকরণ পাওয়ার অধিকার আছে। ডাক্তারদেরও পিপিই পাওয়ার প্রয়োজন আছে।

ডাক্তারদের  সুস্থ থাকার প্রয়োজন অন্যদের চেয়ে বেশি। একজন ডাক্তার আক্রান্ত হলে একশো রোগী আক্রান্ত হতে পারেন। ডাক্তারদের পরিবার আছে। তাদের স্ত্রী সন্তানদের নিরাপদ রাখার কর্তব্য আছে. পেশাগত জীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রাখা আবশ্যক। কর্তব্য শুধু ডাক্তারদের নয়, অন্যানোদেরও কর্তব্য আছে ডাক্তারদের নিরাপদে রাখার। তারা সামাজিক  দূরত্ব বজায় না রেখে নিজেরা অসুস্থ হয়ে ডাক্তারদের অসুস্থ করার অধিকার নেই।

ডাক্তার সমাজেরই একজন। ডাক্তারদের দায়িত্ব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া। সমাজেরও দায়িত্ব ডাক্তারকে রক্ষা করা। যতদূর সম্ভব সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পাওয়া ডাক্তারদের অধিকার। কিন্তু মহামারির সময় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু ডাক্তার সংক্রামিত হবেন, এটা মেনে নিতেই হবে।


ওবায়দুল করিম খান, বাণিজ্যিক পরামর্শক ও লেখক


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না। 

About

Popular Links