Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কেমন হবে ‘নিউ-নরমাল’ কালে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা?

এই বাস্তবতায় কীভাবে ও কোন পরিস্থিতিতে একজন রিক্সাওয়ালা কাজে যোগ দেবেন, উপসর্গ হলে পৃথক কক্ষে থাকবেন সে বিষয়গুলো পরিষ্কার নয়

আপডেট : ২৮ মে ২০২০, ১০:১৫ পিএম

২০০৭-০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য করণীয় পলিসি নির্ধারণে অর্থনীতিবিদরা “নিউ-নরমাল” প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। উন্নয়ন শাস্ত্রে নিউ-নরমাল বলতে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনকে নির্দেশ করে, যে আচরণ পূর্বে অস্বাভাবিক ছিল পরবর্তী অবস্থায় তা স্বাভাবিক হিসেবেই পরিচিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ কে কেন্দ্র করে নিউ নরমাল প্রত্যয়টি পুনরায় আলোচিত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, এ বিষয়ে বিশ্বের সকল বিজ্ঞানী একমত। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির চাকাকে সচল করার উদ্দেশ্যে লকডাউন তুলে দিয়ে নতুন কিছু আচরণে অভ্যস্ত হয়ে কাজে যোগদানের পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশ্বের অনেক দেশই এই পলিসি গ্রহণ করতে যাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারও ইতিমধ্যে এ ধরনের ঘোষণা দিয়েছে।

কোভিড-১৯ বাস্তবতায় তৈরি হওয়া নিউ নরমাল আচরণে সবসময় মুখে মাস্ক পরিধান করা, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, যতটা সম্ভব ঘরে থাকা, ঘরে থেকে কাজ করা, হ্যান্ড-গ্লাভস/স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, ডিজিটাল মাধ্যম বা অনলাইনের মাধ্যমে কাজ করা বা পাঠদান ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের পরামর্শ পালন বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?

একটি চলমান গবেষণার অংশ হিসেবে আমরা গত ১ এপ্রিল থেকে একটি গবেষণা কাজ পরিচালনা করছি।

‘‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’’ বা ‘‘ঘরে বসে কাজ’’ ধারণাটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, এনজিও বা ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি চাকরিজীবি যাদের অফিস অবকাঠামোর সঙ্গে অনলাইন নেটওয়ার্ক আছে তাদের বাস্তবতায় সম্ভব।

কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রেণীর মানুষের কাছে তার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। যাদের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা তারা সীমিত আয় দিয়ে কীভাবে হ্যান্ড-গ্লাভস/স্যানিটাইজার কিনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাসা থেকে বের হবে সেই বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনা জরুরি। পাশাপাশি নিম্ন আয় করা পরিবারের সন্তানদের কাছে অনলাইনে শিক্ষার অভ্যস্ততা তো দূরের কথা, সেজন্য যে ব্যবস্থা (যেমন কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টেলিভিশন) বা স্থান দরকার তা পাওয়ার আর্থিক ক্ষমতাও নেই।

নিম্ন আয়ের একটি বড় অংশ হলো গার্মেন্টস শ্রমিক যাদের বেশিরভাগই গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসিত। শহরে বস্তি বা বস্তিস্বরূপ ঘর ভাড়া করে থাকে অন্যান্য দিনমজুর শ্রেণির মতোই ৫-৬ জন পরিবারের মানুষ একটি কক্ষে থাকে। ব্যাচেলর হলে বা গ্রামে যারা পরিবার রেখে এসে শহরে থাকে তারা ৫-৬ জন মিলে একটি কক্ষে বসবাস করে, যেখানে একের অধিক পরিবার বা মেসের লোকজন একটি রান্নাঘর বা পায়খানা ব্যবহার করে। তাদের বাস্তবতার সঙ্গে ‘‘বাড়ি থেকে কাজ’ ’ বা ‘‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’’ করার সুযোগ নেই।

বস্তিবাসীদের ক্ষেত্রে যেখানে ঘুমানোর জায়গাই অপর্যাপ্ত সেখানে তাদের ঘরে কাজ করার জায়গা থাকার কোনো উপায় নেই। আবার তাদের কাজের ধরণগুলো (যেমন- রিক্সা চালানো, হকারি করা, কারখানায় সেলাই করা বা অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ ইত্যাদি) এমন যা বাসায় বা বাড়ি থেকে করার সুযোগ নেই। কারখানায় শারীরিক উপস্থিতি ব্যতীত গার্মেন্টস কর্মীদের চাকরি করার উপায় নেই।

এ প্রসঙ্গে আলতাফ নামের ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টস কর্মী বলেন, আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সেলাইয়ের কাজ করি। মেশিন সুতা কাপড় সহ সবকিছু কারখানাতেই থাকে। বাড়ি বসে কাজ করব কীভাবে?

আমাদের গবেষণার আরেকটি মূল উদ্দেশ্য ছিলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যে সকল নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে সেগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা।

এখন পর্যন্ত আমরা ৩০ জন নিম্ন আয়ের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায় যে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ নির্দেশনাসমূহ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, রিক্সাওয়ালা, সবজি বিক্রেতা, ফুটপাতের হকার, গৃহকর্মীর মত পেশায় নিয়োজিত মানুষের জীবিকার সাথে ঘরে থেকে কাজ করার নির্দেশ পালন করা সম্ভব নয়। আর তাদের ঘর বলতে যা বুঝায় সেখানেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। পরিবারে বা মেসে যেখানে ৫-৬ জন মানুষ একটি ঘরে বসবাস করে, ৫-৬ টি পরিবার মিলে যৌথভাবে একটি রান্নাঘর, টয়লেট এবং বাথরুম ব্যবহার করে সেখানে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা কল্পনাতীত।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে বা কোনো ব্যক্তির করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পরামর্শ হচ্ছে- প্রথমত ঘরে থাকা, দ্বিতীয়ত এ উপসর্গ হলে পৃথক কক্ষে থাকা বা পৃথক বাথরুম ব্যবহার করা। আবার হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, নির্দেশনাবলীও ‘‘হোম’’ এর কাঠামোগত উপাদানের সঙ্গে যুক্ত।

এ ধরনের নির্দেশাবলী মূলত: ‘‘প্রথম বিশ্বের’’ মানুষের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার আলোকে গৃহীথ যা বাংলাদেশের অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসরত মানুষজনের সামর্থ্যের মধ্যে থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্যরে বাইরে।

আমরা যে ৩০ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছি তাদের কারোরই এ ধরনের ‘‘ব্যক্তিগত’ ’ পরিসর নেই যেখানে কোয়ারেন্টিন বা স্বেচ্ছায় আলাদা থাকতে পারবে। ফলে নির্দেশনাগুলো পালন করার ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নেই।

এ প্রসঙ্গে জয়নাল বলেন, ‍‍‍“আমার সর্দি-কাশি হইছিলো, ডাক্তার পাইনাই। তারপরে একজনের সাথে ফোনে কথা কইলাম। আমারে ঔষধ খাইতে কইলো। আর কইলো আলাদা থাকতে, আলাদা বাথরুম ব্যবহার করতে কইলো। আমি ঔষধ কিনে খাই কিন্তু আলাদা থাকা বা আলাদা বাথরুম পামু কই? আমরা পরিবারের ২ সন্তানসহ ৪ জন ১ রুমে থাকি, ৬ টা পরিবার মিলে একটা ১ বাথরুম ব্যবহার করি। ফলে আলাদা থাকা অসম্ভব, আল্লাহ যা চায় তা ই হইবো।”

ফলে নিউ নরমাল বাস্তবতায় যেসকল আচরন করতে হবে সেগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে তাদের পক্ষে এই আচরনগুলো পালন করা কঠিন।

একদিকে নিউ নরমাল বাস্তবতায় “ওয়ার্ক ফ্রম হোম”বা “ঘর থেকে কাজ” করা বা অনলাইন শিক্ষার যে অনুশীলন শুরু হয়েছে তা যেমন নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই নয়, তেমনি আচরণগুলোও তাদের পক্ষে মেনে চলা কঠিন। নিউ নরমাল বাস্তবতায় কিভাবে ও কোন পরিস্থিতিতে একজন রিক্সাওয়ালা বা ফুটপাতের হকার কাজে যোগ দেবেন, উপসর্গ হলে পৃথক কক্ষে থাকবেন বা পৃথক বাথরুম ব্যবহার করবেন সে বিষয়গুলো পরিষ্কার নয়।

ফলে নিউনরমাল কালে সমাজের এই প্রান্তিক বা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী কীভাবে জীবন ও জীবিকা চালিয়ে নেবেন তা একটি মৌলিক প্রশ্ন। বলা যেতে পারে, নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে নিউ নরমালের অস্তিত্ব নেই। তাই জীবিকার তাগিদে নিম্ন আয়ের মানুষ যদি করোনা-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় তাহলে তারা শুধু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেই পড়বে না তাদের জীবিকাও হুমকির মুখে পতিত হবে যা সমাজের বৃহৎ অংশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে আরও প্রান্তিকতার দিকে পর্যবেশিত করবে।


রঞ্জন সাহা পার্থ, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আবুল কালাম, গবেষক, হেলেন কেলার ইন্টারন্যালনাল, বাংলাদেশ



About

Popular Links