Thursday, June 13, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি: কিছু এলোমেলো চিন্তা ও ব্যক্তিগত উপলব্ধি

চারিদিকে লোকজন হতাশ হয়ে বলতে শুরু করলো, আমাদের ওপর আল্লাহর গজব পড়েছে, কেয়ামত অতি নিকটে, আমরা তার আলামত দেখতে পাচ্ছি

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:১১ পিএম

আশা করেছিলাম ২০২০ বছরটি ভালই যাবে। বিগত বছরের ডিসেম্বরে স্বামী, ছেলেমেয়ে, ওদের পরিবারসহ এবং ভাইবোনদের নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও রাসেল খাইমাতে বেড়িয়ে আসলাম। এসেই শুনলাম চীনের উহান প্রদেশের নভেম্বরই এক মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাসের আর্বিভাব ঘটেছে-যা অচিরেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। 

দিনে দিনে ভয়াবহ খবর আসতে থাকল। যেমন-এই ভাইরাসটি অতি সহজেই এক ব্যক্তির দেহ থেকে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। যদিও এটি বাতাসে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারে না, কিন্তু কয়েক ফিট দূর থেকে অথবা মানুষের হাত থেকেই নাক, মুখ ও চোখ দিয়ে এটি শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রমণ করে এবং সহজেই মৃত্যু ঘটায়। ভয় পেলাম জেনে যে ভাইরাসটি বয়স্ক লোকদের, বিশেষভাবে যারা আগে থেকেই নানা জটিল রোগে আক্রান্ত তাদেরকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে। 

এর মধ্যে ভাইরাসটি পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একের পর এক সতর্কতামূলক রীতিনীতি বা স্বাস্থ্যবিধি প্রচার করতে শুরু করল, যেমন-ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, এক ব্যক্তি থেকে অন্যের সামাজিক দূরত্ব রাখা। এছাড়াও আরও কিছু শব্দ নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করল-যেমন কোয়ারেন্টাইন, লক ডাউন, পিক টাইম, প্রথম ধাক্কা, দ্বিতীয় ধাক্কা, আইসোলেশন, মাস্ক পরা, ফ্রন্ট লাইনার, নিউ নরমাল, অতিমারি ইত্যাদি। অনেক দেশ সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়ে বাড়িতে থেকেই লকডাউন অবস্থায় থাকার সিদ্ধান্ত নিল। 

বাংলাদেশের প্রশাসনে নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হল। প্রথমে সরকার ছুটি বা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিল। পাবলিক পরিবহন বন্ধ হয়ে গেল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হল। অফিস ও কারখানাও বন্ধ হল। কিন্তু এরই মধ্যে গার্মেন্টস-ফ্যাক্টরির শ্রমিকগণ ছুটির মধ্যে থেকে কাজে যোগদানের নোটিশ পেয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে চাকরি বাঁচানোর জন্য বিপুল সংখ্যায় ঢাকায় চলে আসলো। কোনো সামাজিক দূরত্ব থাকলো না এবং বেশির ভাগ শ্রমিক মাস্ক পরলো না। ঢাকাতেও বহুলোক জীবিকার তাগিদে লকডাউন অমান্য করে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঘরের বাইরে চলে আসলো। 


রেহানা সিদ্দিকী


যেহেতু অদৃশ্য ও অজানা, এই ভাইরাসটির বিষয়ে কারো কোনো সম্যক ধারণা ছিল না। তাই অনেক বেসরকারি হাসপাতাল তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে ফেলল। সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়তে থাকল। কয়েকটি হাসপাতালকে শুধুমাত্র কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত করা হল। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা পেল না, যা আমরা ঘরে বসেই টিভিতে প্রত্যক্ষ করলাম। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, কয়েকটি হাসপাতাল করোনাভাইরাসের চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে অনৈতিক ব্যবসা জুড়ে দিলো। অচেনা অজানা ভাইরাসটি সংক্রমণের বিষয়ে সবাই এতটাই ভীত সন্ত্রস্ত হলো যে-আক্রান্ত আপনজনের কাছে স্বজনেরা সহজেই আসতে চাচ্ছিলেন না। মৃত ব্যক্তির দাফনের ভার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার হাতে তুলে দিয়ে স্বজনরা দূরে থাকলেন। 

অন্যদিকে মহান পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীগণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যগণ নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে থাকলেন। শুধু আমাদের দেশেই নয় সারা বিশ্বে এত অমানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কিছু মানব সন্তান তাদের ব্যক্তি উদ্যোগ ও সংগঠনের মাধ্যমে অসহায় মানুষের সাহায্য-সহযোগীতায় সরকারের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মনে হল, পৃথিবীতে মানবতার জায়গাটি এখনও হারিয়ে যায়নি। 

এইভাবেই নানা বিপর্যয়ের মধ্যেও সময় এগুতে থাকল। বিশেষ করে জুন-জুলাই’এর দিকে করোনার ভয়াবহতা চরমে উঠল। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকসহ বিদেশি নাগরিকেরা ধীরে ধীরে চাটার্ড বিমানে করে দলে দলে ঢাকা ছাড়তে লাগল। 

অন্য দিকে বিদেশে কর্মরত আমাদের প্রবাসী নাগরিকরা অনেকে নিয়মিত ছুটি কাটাতে এবং অন্য কিছুসংখ্যক প্রবাসী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রিয়জনদের সাথে মিলিতি হওয়ার আশায় দেশে ফিরে আসলো। আমাদের দেশের মধ্যেও অনেকে তাদের চাকরি হারাতে শুরু করল এবং বহু চেষ্টার পরেও কোনো সুরাহা না হওয়ায়, যাদের গ্রামে অবলম্ব আছে তারা নিজদের সহায় সম্বল নিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে থাকল। গ্রামে ফেরত লোকজন, যারা একসময় পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি ছিল তারাই নিজের পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ালো। 

মার্চ-এপ্রিল থেকে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা প্রদান ও সার্বিকভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হল। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ত্রাণ কাজে এগিয়ে আসলো। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমিও আমার সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় আমার ত্রাণ তৎপরতা আগের তুলনায় যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

এদিকে ভাইরাসটির প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ ও ঔষুধ কোম্পানির প্রতিযোগীতা শুরু হলো। স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর একাধিক স্তরে পরীক্ষামূলক ঔষধ প্রয়োগ শুরু হলো। নানা সাফল্য পাবার পাশাপাশি হঠাৎ করে ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবরও পাওয়া গেল। যুক্তরাজ্যের স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে আমার মেয়ের জামাই রিচার্ড লওসনও সংযুক্ত হলো। তবে সৌভাগ্যক্রমে তার শরীরে কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। সবকিছু সামলে নিয়ে একদিকে যখন ভ্যকসিন আবিষ্কারের তোড়জোড় চলছে অন্যদিকে আবার করোনাভাইরাস ক্ষণে ক্ষণে নিজের ভোল পাল্টিয়ে গবেষকদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। দেখা গেল গত প্রায় দশ মাসেও করোনাভাইরাসকে কেউ সঠিকভাবে চিনতেই পারল না। এত উন্নত দেশের এত বড় বড় বৈজ্ঞানিক, তারা সবাই অন্ধের মতো চলতে থাকল। বিভিন্ন কায়দায় লকডাউন দেওয়া হল। কিছু সময় পর সেটি তুলে ফেললে আবার সংক্রমণ বাড়লো। আবার লকডাউন, আবার অন্য কৌশল-একেবারে নাজেহাল অবস্থা দেখা গেল। ধনী দেশগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হলো এবং মৃতের সংখ্যা ওই দেশগুলোতেই এখনও সর্বোচ্চ লক্ষ্য করা গেল। 

এদিকে আমরা গত বেশ কয়েক মাস ধরে গৃহবন্দি অবস্থায় থেকে হাঁপিয়ে উঠেছি। এই সময়কালে আমরা অন্ততপক্ষে দুই-তিনবার গ্রামের বাড়িতে যেতাম। সেখানে আমার কিছু চলমান সামাজিক কার্যক্রম রয়েছে।

আমাদের বাড়িতে যে ছেলেটি নিজেও বন্দি অবস্থায় থেকে আমাকে সাহায্য-সহযোগীতা করে সে আমাকে সান্তনা দিয়ে বলল, “ম্যাডাম, ভয় পাবেন না। এটা কিছুই নয়। অন্য অসুখ যেভাবে কিছু সময় পর এদেশ থেকে চলে গেছে, এটিও চলে যাবে। মাস্ক পরে বাইরে যান, গ্রামে চলেন, হায়াত-মওত তো আল্লাহর হাতে।”

আসলেই আমাদের গ্রামে-গঞ্জে, এমন কি শহরেও বেশিরভাগ লোকের এই রকমই ধারণা। তাদের বিশ্বাস এতোটাই গভীর যে, তারা অনেকেই সামাজিক দূরত্ব মানে না। এমনকি মাস্কও পরে না। আল্লাহতালার অশেষ রহমতে আমাদের মত ঘন বসতিপূর্ণ দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। 

আমাদের দেশে এখন ধীরে ধীরে করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। চিকিৎসকগণ বিভিন্ন পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তাই করোনা চিকিৎসায় তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

কোভিড-১৯ আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে যখন একের পর এক মানুষজনের মৃত্যু ঘটাতে লাগল, তখন থেকে বাড়তে থাকলো আমার দুঃশ্চিন্তার মাত্রা। এ যাবত যা নিশ্চিত জেনেও না জানার ভান করে এতটা গুরুত্ব দেইনি, সেই মৃত্যুর মতো সদাসত্য ঘটনাটি একেবারে নিজ দোরগোড়ায় এসে টোকা দেবে তা কল্পনাও করিনি। বুকে বিরাট এক ধাক্কা অনুভব করলাম। চিন্তিত হয়ে ভাবলাম, ঘরে স্বামী কঠিন ঔষধ সেবন করছেন, আমি ডায়াবেটিক, পিতা অতিবৃদ্ধ। অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লাম। প্রতিদিন চেনা অচেনা মানুষ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। বিশেষকরে যারা পূর্ব থেকেই নানাবিধ জটিল অসুস্থতায় ভুগছেন তারা একবার হাসপাতাল এ ভর্তি হয়ে আর বাড়ি ফিরে আসতে পারছেন না। আমার বাড়ির কাছাকাছি বাবা-ভাই-বোন তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন, অথচ দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে বড় অসহায় মনে হতে লাগল। একটি কথাই শুধু বারে বারে মনে হচ্ছিল, এই দানব ভাইরাসটি যদি আপনজনকে আক্রমণ করে বসে তবে তাদেরকে বোধহয় শেষ দেখাটিও দেখার সুযোগ রইল না। কারণ শুনছি মৃত্যুর পরেও শবদেহ হতে এই কোভিড-১৯ অন্য দেহে সংক্রমিত হতে পারে সহজেই।

কতদিন আমরা এভাবে এই অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করবো, কীভাবেই বা এই লকডাউন অবস্থায় দিনগুলো কাটাবো, কেউ কোনো কিছু নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। কেউ কেউ বলছেন দুই মাস, কেউ বলছেন চার-ছয় মাস লেগে যাবে এই ভাইরাসটি এ দেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে চলে যেতে। অবশ্য এসবই আমরা বিভিন্ন গবেষকগণের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন উক্তির মাধ্যমে জানতে পারছিলাম। তবে কোনো কিছুই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছিল না। ঘরে কিছু কিনে রেখেছিলাম বহুদিন আলস্য করে পরা হয়নি। ভাবলাম এই বন্দি পরিস্থিতিতে একটু পড়াশুনা করে এই সময়টির সদব্যবহার করি। বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে, এমনকি আধ্যত্মিক বিষয়ও পড়তে ও শুনতে থাকলাম। এই ইন্টারনেট এর যুগে আজকাল তো আবার ঘরে বসেই সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার সুবিধা হয়েছে-তাতে করে চোখের ওপর উপদ্রব ও কিছুটা কমে যায়। 

যাই হোক, এই নিশ্চুপ স্থবির পরিস্থিতিতে আমার ঘরের পরিবেশে আমিও আমাকে যেন গভীরভাবে চিন্তার জগতে নিয়ে যাচ্ছিলাম।আমার চিন্তাচেতনার রাজ্যকে আরও প্রসারিত করে নতুনভাবে জীবনকে চেনার সুযোগ করে দিলো এই ভাইরাস কোভিড-১৯।

অত্যন্ত গভীরভাবে নিজ জীবনকে একটু পেছন দিক থেকে ভাবতে শুরু করলাম। যে জীবন পার করে এলাম তা কি পুরোপুরি সঠিক ছিল? নাকি তা ছিল পদে পদে ভুল। ভাবছি একটি সুন্দর সুষ্ঠু পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম। কিছুটা জ্ঞান অর্জন করলাম। ভাল মন্দ মিলিয়ে সংসার ধর্মও পালন করলাম। সন্তানদের ভাল মানুষ করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালালাম। এই পরিণত বয়সে এসে ক্ষুদ্র একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও চালিয়ে যাচ্ছি। কিছু সংখ্যক হতদরিদ্র মানুষকে সস্তি দেবার প্রয়াসে। মনে হচ্ছিল সবইতো সঠিক ছিল। তাহলে আমার চলার পথে কোথায় ঘাটতি হল? যে সুখ শান্তি আমার জীবনে ছিল তাকি সাময়িক, এতে কি কোনো পরিপূর্ণতা ছিল না?

এই সব এলোমেলো কথা আমার মাথায় যখন ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন আমি আমার ৯৬ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ পিতার সঙ্গে আমার এই উপলব্ধি ভাগাভাগি করার জন্য যোগাযোগ করলাম। এই পরিস্থিতিতে তার উপলব্ধি জানতে চাইলে তিনি বললেন, “দেখ বাবা আমার প্রায় শতবছর বয়স হতে চললো। এ জীবনে আমি এমন সংকট কখনো দেখিনি ও শুনিওনি।তবে জীবনকে আমরা যতটা মসৃণ মনে করি আসলে তা না। এইভাবে ভালমন্দ সময়কে সাথে করেই এই জগৎ সংসারকে চালিয়ে নিতে হয়। এখানে শুধু প্রয়োজন সবকিছুর মধ্যে নিজেকে একটু মানিয়ে চলার দক্ষতা। আমরা এখন সেই মন্দ সময়টিই প্রত্যক্ষ করছি। কোনো না কোনো দিন আমরা এই দুঃসময় হতে পরিত্রাণ পাবোই।তবে আমি দেখে যেতে পারবো কি না জানি না।” বাবার এই বক্তব্যে আমিও মনে মনে উচ্চারণ করলাম আমিও তো যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছি। আমি কি সেই পূর্বের স্বাভাবিক জীবন আবার দেখতে পাবো? 

এদিকে, চারিদিকে লোকজন হতাশ হয়ে বলতে শুরু করলো-আমাদের উপর আল্লাহর গজব পড়েছে, কেয়ামত অতি নিকটে, আমরা তার আলামত দেখতে পাচ্ছি। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমরা সকল বিষয়ে অতি বাড়াবাড়ি করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। 

এসকল কথাবার্তা বা কুসংস্কারগুলো পুরোপুরি মানতে না পারলেও আমরা যে জীবনের সকলক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে চলেছি-তা সমাজের দিকে একটু দৃষ্টি ঘুরালেই টের পাচ্ছি। আমাদের মধ্যে যে নীতি-নৈতিকতা, সততা, আবেগ, সহানুভূতি, অন্যের প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা-এক কথায় আমরা আমাদের জীবনে ন্যূনতম মূল্যবোধ হতে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি তা এই সমাজের অবক্ষয় দেখে আনায়াসেই বুঝতে পারি।

সৃষ্টিকর্তার গজব আমাদের ওপর কেন পড়বে? তিনি কি আমাদের কখনো অমঙ্গল, অকল্যাণ চান? তাহলে তিনি কেন আমাদের অহেতুক এই শাস্তি দেবেন। আমি অন্তত এর কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। বরং, আমার চিন্তা চেতনায় যা বুঝতে পারি তাহলো এসবই আমাদের ভুলের খেসারত। 

শুনেছি, ডাইনোসরের মতো বৃহৎ জন্তুটি এই গ্রহে বহুকাল বিচরণ করে এক অজানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে কি কোভিড-১৯ ভয়ংকর ক্ষমতাধর ক্ষুদ্র এই ভাইরাসটি মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ জীবটিকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার উদ্দেশ্যে উদয় হয়েছে? দুঃখের বিষয়, সারা বিশ্বে সমগ্র মানবকূলে এত বড় বিপর্যয়ের মধ্যেও চলছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা দূরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা-এই কোভিড-১৯’কে জড়িয়ে। পাশাপাশি দেশে দেশে, মানুষে মানুষে চলমান হানাহানি, বোমাতঙ্ক এবং সকল প্রকার অনৈতিক কার্যকলাপও চলছে সমানভাবে।

ইতিহাসের সবচাইতে কঠিন এই বাস্তবতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অথ চকোভিড-১৯ আমাদেরকে সামান ̈তমসংযমী, সংবেদনশীল ও সহনাভূতিশীল হবার শিক্ষাটি দিতে পারছে না। মানবতার যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম-একে অন্যকে সেবা প্রদান, তাও আমরা নিজেদের স্বার্থে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে যাচ্ছি। 

এখন শুধু আমরা একটি কথাই ভাবছি। কখন এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে, কখন আবার আমরা ফিরে যেতে পারবো আমাদের পূর্বের সেই তথাকথিত স্বাভাবিক জীবনে। আবার মেতে উঠবো সেই আনন্দ ফূর্তির জীবনে! অথচ আমাদের এই উচ্চাভিলাষী চরিত্রটিই যে আমাদের সুস্থ মানব জীবনের পতনের কারণ, সেই ̧রুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের উপলব্ধিতে যেনো কিছুতেই আসছে না। 

ভাবছি সৃষ্টিকর্তা আমাদের কল্যাণে আমাদের মঙ্গলের জন্য আমাদের উপভোগের জন্য তার এই প্রকৃতিতে কতোকিছুই না সৃষ্টি করে দিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন তার সম্পদের ভাণ্ডার হতে অসংখ্য মূল্যবান প্রাকৃতিক উপাদান। তা কি শুধুমাত্র এই প্রাণীকূলের মানবসন্তানদের জন্য? এই সম্পদের ভাণ্ডার কি শুধু মনুষ্য সমাজেরই ভোগ করার অধিকার? সৃষ্টিকর্তা এই গ্রহটিতে আরও অসংখ্য প্রজাতীর জীবজন্তু পশুপাখি সৃষ্টি করেছেন। তাদের কি স্বাধীনভাবে ভোগ করার কোনোই অধিকার নেই?

আমাদের লোভাতুর চরিত্র প্রকৃতির মহামূল্যবান সম্পদ মাটি, পানি, বাতাস, গাছপালার প্রতি যত্নশীল না হয়ে বরং ধ্বংস করে দিচ্ছি এদের বংশবিস্তার। দুষিত করে চলেছি এই পৃথিবীর বাসযোগ্য পরিবেশ। নিধন করছি গাছপালা। এমনকি আমরা আমাদের নিজ শরীরটিকেও নানা অনিয়মের মাধ্যমে অত্যাচার নির্যাতন হতে রেহাই দিচ্ছি না।

আমরাতো প্রাণী হিসাবে প্রকৃতির একটি অংশ মাত্র। এসব কিছুর ওপর শুধুমাত্র আমাদের একার অধিকার থাকতে পারে না। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিটি প্রাণির ওপর অত্যাচার অবিচারও নিপীড়ণের মাধ্যমে মহাপাপে লিপ্ত হয়েছি। প্রকৃতির প্রতি আমরা আরও ভালবাসা দেখিয়ে, যত্নবান ও মনোযোগী হয়ে যে পূণ্য সঞ্চয় করতে পারি, সেই বিষয়টিও আমরা সামান্যতম অনুভব করছি না। 

সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক তার সৃষ্টির প্রত্যের জন্য নির্ধারিত জীবন ধারার উপায়গুলো যদি আমরা সঠিভাবে মেনে চলতাম, তাহলেই বোধ করি আমাদের জীবনকে আমরা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করে যেতে পারতাম। যেখানে আমার একটিই যথেষ্ট ছিল, সেখানে আরও দুটি-তিনটির প্রতি কেন জানি আমাদের নজর বেশি। অথচ যার কিছুই নেই, যার ন্যূনতম প্রয়োজনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তার দিকে দৃষ্টিপাত করার আমাদের সময় কোথায়? মন ও আত্মার পবিত্রতার বিষয়টি আমলে না নিয়ে আমরা কেবলই বস্তুবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছি। আমরা ভুলে যাই যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নই জীবনে পরিপূর্ণতা এনে দিতে পারে না, একটি উন্নত জীবনের জন্য আমাদের প্রয়োজন সুস্থ চিন্তাধারার বিকাশ।

এই ক্ষণিকের সুখ, আনন্দ উপভোগের আশায় আমরা নিজ জীবনকে দুঃখের দিকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ফলশ্রুতিতে অধিক সুখ-শান্তি কিনতে গিয়ে আমরা চরম অশান্তিকেই কিনে নিয়ে আসছি। যতদিন না আমরা এই বিষয়গুলোকে আমাদের চিন্তাচেনতায় ধারণ করতে পারবো, ততদিন এই মানবসমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হতেই থাকবে। 

কোভিড-১৯’এর এই পরিস্থিতিতেই আমার একাকি লকডাউন পরিবেশে যে আন্তরিক আত্মউপলব্ধি হয়েছে তার সারমর্ম টানতে গিয়ে এটুকুই বলা যায় সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে অসংখ্য বিচিত্র প্রাণিকূল রয়েছে, শত বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ নিজ স্বকীয়তা বজায় রেখে একই ঐকতানে নিজস্ব অধিকার ভোগ করবে, সেটিই হবে সঠিক প্রাকৃতিক নিয়ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হলেই আমরা আমাদের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনবো। এই সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থাই এনে দিতে পারে আমাদেরকে একটি সুস্থ পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং সর্বোপরি আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও ঐক্যের পরিবেশ। 

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের যার যার ধর্ম, আদর্শ বিশ্বাসগুলো, বুদ্ধি, বিবেক, সততা ও পরিমিতবোধের দ্বারা পরিচালিত করার মাধ্যমেই আমরা পেতে পারি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের পরিপিূর্ণতা। আর এভাবে বেঁচে থাকার সার্থকতাতেই মিলবে আমাদের সার্বিক মুক্তি।



রেহানা সিদ্দিকী সমাজসেবা মূলক সংস্থা "ফর ইউ ফরএভার"এর (এফওয়াইএফই) চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 



About

Popular Links