Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য সম্পদের উপর প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইতোমধ্যেই দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৩৭ পিএম

এক সময়ের প্রবাদ “মাছে ভাতে বাঙালি”-এখনো অনেক বৃদ্ধ মানুষকে নষ্টালজিক করে তোলে। তাদের হাসি মুখের সেই সুখস্মৃতি মুগ্ধ হয়ে শোনে এ প্রজন্মের মানুষরাও। আগে দেশের যে কোনো নদ-নদী, খাল-বিল-জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা কমে গিয়েছে বহুগুণ। বর্তমানে কৃত্রিমভাবে মাছ উৎপাদন করে প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮-তে প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, “দেশের মোট জিডিপি’র ৩.৫৭% এবং কৃষিজ জিডিপি’র এক-চতুর্থাংশের বেশি (২৫.৩০%) মৎস্যখাতের অবদান রয়েছে।” তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মৎস্য সম্পদের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে বলে জেলে, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন। 

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আসলে কী? বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের জীবন-যাপনের জন্য ব্যাপকভাবে যে ধরনের উপকরণ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে (যেমন, এয়ারকন্ডিশন, রেফরিজারেটর ইত্যাদি) এগুলো থেকে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) নামে এক ধরনের গ্যাস নির্গত হয়। যা বায়ুমন্ডলের ওজন স্তরে গিয়ে আটকা পড়ে। এ গ্যাস ভাঙে না বা এটি কোনোভাবে বায়ুমন্ডলে মিশে যায় না। এটি বায়ুমন্ডলে এমনভাবে কাজ করে যার ফলে দিন দিন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আটলান্টিকের বরফ গলে যাচ্ছে। এর সাথে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতাও বেড়ে যাচ্ছে। সিএফসি এভাবে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এতে সমগ্র জীবজগৎ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।  

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরনে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে মৎস্য প্রজনন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের ক্ষেত্রে এ প্রভাব সরাসরি পড়ছে। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা এবং সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। এসব বিবেচনা করে তা মোকাবিলার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের আরো গবেষণা করা প্রয়োজন।”

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএফআরআই)-এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অভিজিৎ বসু বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব দেশীয় প্রজাতির মাছের উপর পড়ছে। সমুদ্রের জোয়ারের সময় লোনা পানি বৃদ্ধি পেয়ে তা যখন নদী, জলাশয় কিংবা পুকুরে ঢুকে পড়ে তখন সেখানকার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য সেটা যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দেয়। লবণাক্ত পানির জন্য দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। ঐ পানিতে মাছ প্রজনন করতে পারে না। মাছের ডিমগুলো নিষিক্ত না হয়ে তাদের মলের সাথে বেড়িয়ে যায়। এজন্য দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে।” 

তিনি আরো বলেন, “তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এখনও ইলিশের উপর সেভাবে পড়ছে না। কেননা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এবং ইলিশের সুরক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অর্থাৎ মৎস্য অধিদপ্তর ও বিএফআরআই-এর গবেষণা, সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সামগ্রিক প্রচেষ্টাই এ মাছকে টিকিয়ে রাখছে। আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যাতে ইলিশকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে না পারে সে জন্য আমাদের সব সময় সতর্ক এবং সচেতন থাকতে হবে।” 

মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, “জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান শতকরা প্রায় ১ ভাগ। বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বিগত দশ বছরে ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫.২৬%।” 

গবেষকরা বলছেন, প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব হলে প্রাকৃতিকভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণে ইলিশের ডিম এবং পরবর্তীতে জাটকা হিসেবে পাওয়া যেতে পারে যা ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সাম্প্রতিক জলবায়ুগত পরিবর্তন বা যে কোনো কারণেই হোক ইলিশের ডিম ধারণক্ষমতা অনেকটা কমে গিয়েছে বলে জানা যায়। 

ইলিশ মাছের জীবনচক্রে দেখা যায়, তারা সাধারণতঃ সমুদ্রে বাস করে। ডিম ছাড়ার সময় (সাধারণত অক্টোবরে) তারা মিঠা পানিতে চলে যায়। সেখানে ইলিশের জন্ম হলে কয়েক মাস (নভেম্বর-জুন) তারা মিঠা পানিতে বাস করে। যখন তারা সাবালক হয় কিংবা সাধারণত জুলাই-আগস্টের দিকে তারা আবার সমুদ্রে চলে যায়। এভাবে মোহনা থেকে নদ-নদীর উজান এলাকা এবং উপকূল থেকে গভীর সমুদ্রে ইলিশ মাছ পরিভ্রমণ করে। 

ইলিশের গতিপথ কিংবা তার বসবাসের জায়গাটি কতটা সুরক্ষিত জানতে চাইলে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ শাখার উপ-প্রধান পরিচালক মাসুদ আরা মমি বলেন, “আগে ইলিশ যে জায়গাগুলোতে বাস করতো সেই জায়গাগুলো দিন দিন দূষিত হচ্ছে। সে জায়গাগুলোতে নানারকম পরিবর্তন এসেছে। যেমন, সমুদ্রের গভীরতা কমেছে এবং এর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যে রাস্তা দিয়ে ইলিশ চলাচল করতো এখন তা অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আগে তাদের নার্সারি গ্রাউন্ড মেঘনার দিকে ছিলো এখন তা অনেকটাই সরে গিয়ে পদ্মার দিকে আসছে। এ রকম বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে ইলিশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে।” তবে তা যেনো ক্ষতিকর পর্যায়ে না যায় সে বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানান অভিজিৎ বসু। 

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই মৎস্য সম্পদের জন্য হুমকি নয়, যেখানে এ সম্পদ বাস করে সেই সব নদী-জলাশয়ের দূষণ বন্ধ না করলে এ সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাবে। এ জন্য দেশে যে সমস্ত নীতিমালা ও আইন আছে তা প্রয়োগ করতে হবে। নদী ভরাট ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ সমস্যা ছিলো। তারা তা ঠিক করে নিয়েছে। এমনকি ৫০-৬০ বছর আগে টেমস নদীর অবস্থা বুড়িগঙ্গার চেয়েও খারাপ ছিলো। আমাদেরও এভাবে কাজ করতে হবে। নইলে কোনো মাছই ঠিকভাবে উৎপাদন সম্ভব হবে না।” 


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না 

About

Popular Links