Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিডি-আরটিজিএস: অপার সম্ভাবনার সমীকরণ

দেশীয় কিংবা ভবিয্যতের বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনের ধারায় বিডি-আরটিজিএস সমকালীন পদ্ধতিগত বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে আরও ভাবনার সময় প্রায় সমাগত; যেখানে হয়তো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে মাথায় রেখে শ্লোগান হবে, ‘ব্যবসা আগে, জবাবদিহিতার সাথে’

আপডেট : ০১ জুন ২০২১, ০৮:১৮ পিএম

বিডি-আরটিজিএস বাংলাদেশের অর্থ সঞ্চালনের এক অনন্য মাধ্যম, যা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত মাধ্যম হিসেবে স্বল্প সময়ে মূল প্রাপকগণের স্বস্তি দানে সচেষ্ট, লেনদেনের উদায়চলের প্রবর্তক। বস্তুত পক্ষে, বিডি-আরটিজিএস হচ্ছে সঠিক সময়ে অর্থ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট আকলন-বিকলনগুলো অন্যগুলোর অপেক্ষায় না থেকে একক ও স্বতন্ত্র  হিসেবে নিষ্পত্তি করতে সক্ষম। 

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবরে বিডি-আরটিজিএস এর যাত্রা উদ্বোধনের করে “পেমেন্ট সিস্টেম” এর নবযুগের সূচনা করে। প্রাথমিকভাবে, স্বাগতিক ছাড়াও পাঁচটি বৈদেশিক মুদ্রায় এই অনন্য মাধ্যমে অর্থের আদান-প্রদানের বিধি গ্রহণ করা হয়েছে, যা ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই নিয়ামাচারের নির্দেশিকারে বিডি-আরটিজিএস আত্মপ্রকাশ করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তর্জালে।

পাঁচ বছর পূর্বে, বর্তমান প্রয়োজনকে বিবেচনায় এনে; লেনদেনের সহজীকরণ ও তাৎক্ষণিকতায় বিডি-আরটিজিএস এখন আর শহর-কেন্দ্রিক শাখায় আবব্ধ না থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে এর ব্যবহার প্রযুক্তির কল্যাণে দৃশতঃ। এখানে উল্লেখ থাকে যে, স্বাগতিক “টাকা” ছাড়াও আরও পাঁচ পাঁচটি বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যেমন ইউএসডি, জিবিপি, ইউরো, জাপানি ইয়েন, কানাডিয়ান ডলার। বৈদেশিক মুদ্রাগুলো এই মাধ্যমে সংযুক্ত রাখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ঋণপত্রের নিরবিচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করা বিশেষ করে, লেনদেনগুলোকে প্রাপ্তির ক্রমানুসারে ভবিষ্যতের লেনদেনের জন্য নির্দেশনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতার নির্দেশ বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এতে করে, বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের আঞ্চলিক তথা ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ছুটিছাটাকে হিসেবে না এনে; লেনদেনকে নিশ্চিত করা যাবে, যাতে লেনদেনের বিলম্ব মাসুল গুনতে না হয়, স্বাগতিক সত্ত্বাকে।

ভবিয্যতের দূরদর্শিতার দৃষ্টি ভঙ্গিতে; এনবিআর, শেয়ার বাজার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেনদেনগুলোকে এই বলয়ে একীভূত করার বিবেচনা রাখার মাধ্যমে একটি নুতন যুগের রূপরেখার আভাস পাওয়া যায়, যা আমাদের “নগদবিহীন”লেনদেন সমাজের প্রবেশের ক্ষেত্রে এক মাইল ফলক নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। “নগদবিহীন” লেনদেন সহজেই অর্থের প্রবাহ (উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত) চিহ্নিত করা অপেক্ষাকৃত নগদ লেনদেনের থেকে সহজতর হবে আর্থিক প্রযুক্তির সহায়তায় বিশ্লেষণের মাধ্যমে, যা বস্তুতপক্ষে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

বিডি-আরটিজিএস-এর ভিত্তি সীমা (এক লক্ষ  টাকা) ও সময় সূচিতে (ব্যাংক লেনদেন সময়) ভিন্নতার সাথে সময় বেষ্টিত হওয়াতে; এর নিজস্বতায় ও স্বকীয়তায় অনন্য। প্রকৃত পক্ষে, আরটিজিএস যে কোনো লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে ও এককভাবে নিষ্পত্তির উদ্দেশে এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং এর পরিষেবায় আন্তঃলেনদেনের নিষ্পত্তির এক অনন্য মাধ্যম। যার ফলশ্রুতিতে, আমরা অপেক্ষাকৃত কম খরচে ও কম সময়ে বেশি পরিমাণ উচ্চমানের লেনদেন করে থাকি ও ভবিষ্যতেও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা/প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ লক্ষ ৩৯ হাজার কোটি টাকা (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক) মত লেনদেন হয়ে থাকে।

গ্রাহক বা প্রাপকগণ ব্যাংকিং এর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সেবা গ্রহণের সাথে সাথে বিডি-আরটিজিএস এর উপযোগিতায় বেশ স্বাচ্ছন্দ প্রকাশ করছে যা নিম্নে প্রদর্শিত রেখা চিত্রের উল্লম্ফন প্রতীয়মান।


উপরোক্ত লেখচিত্রের মাধ্যমে পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের লেনদেনের পরিমাণ ও টাকার পরিমাণ প্রাক্কলন করে বলে দেয়া যায় যে, উভয় ধারাই উল্লম্ফিত হারে ক্রমবর্ধণশীল।

করোনাকালীন সময়ে, বিভিন্ন ব্যক্তিকেন্দ্রীক ব্যাংকগুলো তার গ্রাহককূলের জন্য ও “ইন্টারনেট” ব্যাংকিং প্লাটফর্মেও আরটিজিএস-এর সংযুক্তি করে গ্রাহক সেবার মান বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত করেছে এবং এই ধরনের বিশেষ সেবা ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় আরও ব্যাপ্তি বিস্তারে সক্ষম হবে তা হলফ করে বা উপরের লেখচিত্রের প্রাক্কলিত ধারা দেখলেই বলে দেয়া যায়।

বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলো তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গ্রাহক সেবা নির্র্দিষ্ট শাখায় অবরুদ্ধ না থেকে, প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে বিস্তৃত হয়েছে আরও গ্রাহক বান্ধব হওয়ার স্বার্থে। আরটিজিএস লেনদেনের প্রাপ্যতা নির্দিষ্ট শাখা ও ব্যাংকভিত্তিক না হওয়াতে দ্রুত নিস্পত্তিও ঝুঁকির কারণ হয়ে যেতে পারে যথাযথ জবাবদিহিতার অভাবে; এ ক্ষেত্রে ব্যাংকার ও গ্রাহকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ করতে হবে, প্রযুক্তির সহায়তায়। অন্যথায় হয়তো এই সেবা গ্রহণের প্রবৃদ্ধি হ্রাস হয়ে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

প্রথমত: ব্যাংকগুলোকে তার প্রধান কার্যালয়ের সাথে তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রযুক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে ও তদসঙ্গে বিকল্প সম্পর্ক স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয়, অন্যথায় সেবার ফলাফল স্বল্প সময়ের বিলম্বের জন্যও বিঘ্নিত হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত: বিভিন্ন ব্যাংকের বিবিধ প্লাটফর্মের সফটওয়ারের “লেনদেনের মডিউলের পারিপাশ্বিক যোগাযোগের নিরীক্ষাও গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে, ঝুঁকি হ্রাসকল্পে।”

তৃতীয়ত: প্রতিথযশা প্রযুক্তির নিরীক্ষার সনদ ও পর্যালোচনা কাক্ষিত সেবার নিশ্চয়তা প্রদান আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব।

সর্বোপরি অধুনা ই-কমার্সেও; এমন কি পণ্য প্রাপ্যতা বা জবাবদিহিতার স্বার্থে ওটিপি (OTP) বা একবারের স্বল্প সময়ের পাসওয়ার্ড পণ্যের বিতরণের নিশ্চয়তা ও প্রদান উভয়ই নিশ্চিত করে। অনুরূপভাবে, যেহেতু অপেক্ষাকৃত উচ্চমান (এক লক্ষ  টাকা ও তদুর্ধ্ব ) এবং ভবিষ্যতের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনগুলোকে ওটিপির আওতায় আনা গেলে লেনদেনের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে;  যা প্রায় এই ধরনের সেবায় বর্তমানের একক লেনদেন ভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রয়োগিক প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা বিশেষ করে বি-টু-সি (B2C) কিংবা সি-টু-সি (C2C) ই-কমার্সের মডেলে। প্রচারমূলক গণ ক্ষুদেবার্তার খরচের তুলনায় জবাবদিহির ক্ষুদে বার্তার বলয় আরও সুসংহত ও কার্যকরী  হবে। উপরন্তু, ঝুঁকির সমীকরণের সম্ভাবনার নিরূপণে এক টাকার প্রভাব সাথে এক লক্ষ টাকার ঝুঁকির প্রভাব তুলনা করলে একই ফলাফল দেবে না, তা তো ধ্রুব সত্য।

যে কোনো ব্যাংকে গ্রাহকের হিসেব খোলার প্রাক্কালে, নিবন্ধিত মুঠোফোনটি মুখ্য যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে; বর্তমান ব্যাংক হিসেব ব্যাবস্থাপনায়, সাথে স্ব স্ব গ্রাহকের “ই-মেইল” হিসেবটি গৌণ যোগাযোগ ও রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা গ্রাহকের প্রদত্ত তথ্য নির্দিষ্ট ব্যাংকের তথ্য ভাণ্ডারে “স্থায়ী তথ্য” হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। এমতাবস্থায়, ওটিপি ব্যবস্থাপনায় গ্রাহক যদি ক্ষুদে বার্তায় বিডি-আরটিজিএস এর কোনো লেনদেনের প্রায়ম্ভিক অনুমোদনের নির্দেশনা বা পরিমাণ প্রাপ্ত হন, তাহলে উনি নির্দিষ্ট সংখ্যার ওটিপি বা ই-মেইল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে/ব্যাংকারের জ্ঞাতার্থে 

প্রেরণের/আনয়নের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব, দ্বি-স্তরের অনুমোদনে (2FA); গ্রাহক ও ব্যাংকারের উভয়ের ক্ষেত্রে। এহেন প্রযুক্তিতে, মধ্যবর্তী কোনো ব্যক্তি/ সত্ত্বা/প্রযুক্তির অযাচিত অনুপ্রবেশের সম্ভাবনার হার প্রায় “শূণ্য”। প্রযুক্তিটা; প্রায় করোনাকালীন দ্বি-স্তরের মাস্কের ব্যবহারের সমতুল্য, অযাচিত আক্রান্তের প্রভাব হ্রাস করার নিমিত্তে।

তবে প্রকৃত সুফললব্ধ হতে হলে, গ্রাহকের “স্থির তথ্য” ব্যাংকের সকল স্থরের কর্মকর্তাগণের পরিবর্তন/পরিমার্জনের সক্ষমতা রোধ করে, বিশেষ ক্ষমতা প্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অনুমোদন/ দ্বি-স্তরের অনুমোদন (2FA) গ্রহণ করতঃ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আরও তথ্য সম্বলিত দলিলাদির উপস্থিতি তঞ্চকতার প্রভাব মুক্ত রাখা যাবে।

করোনার টিকার প্রক্রিয়ায় সুরক্ষা নামক অন্তর্জালের নিবন্ধন প্রক্রিয়া, বাংলাদেশের অন্যতম সুশৃঙ্খল ও কার্যকরী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হিসেবে ইতোমধ্যেই সর্বত্রই প্রশংসিত হচ্ছে যার ভিত্তিই হচ্ছে: তথ্য প্রযুক্তি, মুঠোফোন, ই-কেয়াইসি, ওটিপি, ডেইটা মাইনিং। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল সুর “সব কিছুই একীভূত করে একত্রীকরণের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ তথা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে বেগময়তায় সাথে দায়ভারের সম্মিলনে আধুনিক জীবন-যাপন পদ্ধতি।” দেশীয় কিংবা ভবিয্যতের বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনের ধারায় বিডি-আরটিজিএস সমকালীন পদ্ধতিগত বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে আরও ভাবনার সময় প্রায় সমাগত; যেখানে হয়তো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে মাথায় রেখে শ্লোগান হবে, “ব্যবসা আগে, জবাবদিহিতার সাথে”।


ম. রাশেদুল হাসান খান, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, গ্লোবাল ইসলাম ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না

About

Popular Links