Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বর্জ্য নয়, বরং জীবাশ্ম জ্বালানি দূষণ মানুষের মৃত্যু ঘটায়

তেজস্ক্রিয় বর্জ্যকে পারমাণবিক জ্বালানিতে নবায়ণ করা যায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তিতে প্রতিস্থাপন করা যায়

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৪৭ পিএম

আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়, “কীভাবে আপনি পারমাণবিক শক্তির পক্ষে কথা বলেন? পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদে চালানো গেলেও, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যকে চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা অসম্ভব।”

সত্যিটা হলো, পারমাণবিক শক্তির তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের কারণে কারও মৃত্যু হয় না। পক্ষান্তরে জীবাশ্ম জ্বালানি (দূষণ) নিয়ে আমাদের অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, কারণে এর কারণে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়।

১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিবছর ৩.৩ মিলিয়ন টন কয়লা পোড়ানো হয়। যা থেকে বছরে প্রায় ৪,৯০,০০০ টন বিষাক্ত ছাই এবং ৬.৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর্বতসম ছাই বাইরে গাদা করে রাখায় তা নিকটবর্তী নদীতে চলে যায়। এই ছাইয়ের পরিমাণ এত যে, এটি নিরাপদে সংরক্ষণের কোনো বাস্তবসম্মত উপায় নেই।

আপনি যেমনটা ভাবছেন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তার চেয়ে ছোট সমস্যা

একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিবছর ১০০০ মেগাওয়াট বৈদ্যুতিক শক্তি (প্রচলিত হালকা পানির চুল্লিতে) উৎপাদনে বছরে প্রায় ৩০ ইউনিট জ্বালানি (তেজস্ক্রিয় বর্জ্য) উত্পাদন করে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপন্ন বর্জ্য তুলনামূলক অনেক কম এবং ছড়িয়ে পড়া রোধে এটি সাবধানে সংরক্ষণ করা হয়।

উৎপন্ন জ্বালানিকে “শুষ্ক কাস্কে” (কংক্রিট বেষ্টিত নিষ্ক্রিয় গ্যাসে ভরা ইস্পাত সিলিন্ডার যাতে আগুন ধরে না) স্থানান্তরিত করার আগে  কমপক্ষে এক বছরের জন্য “অগ্নি নিবারণ পুকুরে” পানির নিচে সংরক্ষণ করা হয়। অন্য কোনো বর্জ্য এতটা সাবধানে সংরক্ষণ করা হয় না।

রাশিয়া এবং ফ্রান্সে পারমাণবিক জ্বালানির পুনর্ব্যবহার হয়; যা বর্জ্যের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে।

দামে সস্তা হওয়ায় কয়লা বহুল ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি। পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৮ বিলিয়ন টন কয়লা পোড়ানো হয়, যা থেকে বছরে ১.২ বিলিয়ন টন ছাই উৎপন্ন হয়।

পারমাণবিক বর্জ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু কয়লা ছাইয়ের বিষাক্ত ধাতু (যেমন সীসা, পারদ, আর্সেনিক এবং ক্যাডমিয়াম) অনন্তকালের জন্য বিষাক্ত।

কয়লায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় উপাদান রয়েছে, তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত ছাইয়ের পাহাড়ও তেজস্ক্রিয়।

কয়লার ছাই বাইরে সংরক্ষণ করা হয়, ফলে এটি নদীতে এবং বড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র আসলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয় দূষণ সৃষ্টি করে।

বায়ু দূষণ এবং গ্রিনহাউস প্রভাব

অবশ্যই, আমাদের ছাইয়ের চেয়ে কয়লা উৎপাদিত বায়ুদূষণ নিয়ে বেশি চিন্তা করা উচিত। বায়ুদূষণের ফলে প্রতি বছর ৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। সেই দূষণের বেশিরভাগই জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে কয়লা পোড়ানো থেকে হয়।

সুতরাং,বাস্তবতা হচ্ছে পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপন্ন বর্জ্য কয়লা থেকে উৎপন্ন বর্জ্যের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। এখানেই শেষ নয়।. 

প্রাকৃতিক গ্যাস প্রায়ই একটি “পরিষ্কার” জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত হয়। যাই হোক, যদি আপনি জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করেন, তাহলে কয়লা থেকে গ্যাস তেমন আলাদা কিছু নয়। উভয়ই কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে; তবে গ্যাসের সুবিধা হলো এটি বিষাক্ত ছাই উৎপন্ন করে না।

গ্যাসের অসুবিধা হলো এর পাইপলাইন লিকেজ থেকে মিথেন ছড়ায়, যা গ্রিনহাউসে কার্বন ডাই অক্সাইড এর তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলে।

খাদ্য ঘাটতি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব বিবেচনায় জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তি পারমাণবিক শক্তির বর্জ্যের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য নিচু অঞ্চলের অধিকাংশ স্থায়ীভাবে প্লাবিত হবে।

জলবায়ু তপ্ত হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ অনেক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। মানুষ প্লাবিত উপকূলীয় এলাকা থেকে শহরে স্থানান্তরিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে।

অভিবাসীরা তাদের জমি হারিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়বে। তাদের খাওয়ানোর জন্য, আমাদের খাদ্য আমদানি এবং রেশন ব্যবস্থা করতে হবে। যদি বিশ্বে এভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো চলতে থাকে, তাহলে খাদ্য ঘাটতি এবং খাদ্য রেশন অনিবার্য হয়ে উঠবে।

কীভাবে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি?

মনে রাখতে হবে, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস হল পারমাণবিক এবং জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তি। সৌর এবং বায়ু শক্তি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় এসব দেশ শহর এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী ক্রমাগত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না।

সৌর এবং বায়ুচালিত কলগুলো সাধারণত ৩০% সময় শক্তি উৎপাদন করতে পারে, কারণ প্রতিদিন বাতাস প্রবাহিত হয় না, এবং রাতে সূর্যের আলো থাকে না। যাদের নিজস্ব নবায়যোগ্য “বিকল্প” (যা সাধারণত গ্যাস দ্বারা চালিত) বিদ্যুকেন্দ্র আছে তারা ৭০% সময় শক্তি উৎপাদন করতে পারে ।

সৌভাগ্যবশত, আমরা এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তিকে পরমাণু শক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করে বিপর্যয় এড়াতে পারি। পরবর্তী প্রজন্ম পারমাণবিক শক্তি (গলিত লবণ চুল্লি এবং সোডিয়াম কুল্‌ড ফাস্ট রিঅ্যাক্টর) ব্যবহার করে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপন্ন করবে যা কয়েক শতাব্দীর জন্য বিপজ্জনক হলেও, সহস্রাব্দের জন্য বিপজ্জনক নয়।

তেজস্ক্রিয় বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বেশকিছু চুল্লির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই চুল্লিগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তৈরি করা উচিত। ব্যয় করা জ্বালানিকে নতুন জ্বালানিতে নবায়ন করা, বর্জ্য হিসেবে সংরক্ষণ করার চেয়ে আধুনিক। 

ভবিষ্যতের জ্বালানি

পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোতে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অন্যান্য) পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সুযোগ এবং পরমাণু জ্বালানির পুনর্ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

ব্যয় করা পারমাণবিক জ্বালানিতে রয়েছে প্লুটোনিয়াম, যা নিষ্কাশন করা যায় এবং পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য ব্যবহার করা যায়। পারমাণবিক জ্বালানি পুনর্ব্যবহার কেবল সেই দেশগুলোতেই হওয়া উচিত যেখানে ইতোমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

পারমাণবিক জ্বালানির পুনর্ব্যবহারের নিশ্চিত করার মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি বিশ্বের ভবিষ্যত শক্তি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করবে।

জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত প্রতিটি নতুন ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ৪০ বছরে যে কয়লা পোড়ানো হবে তাতে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হবে। তাই প্রতিটি দেশে জীবাশ্ম জ্বালানি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিস্থাপন করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় এসেছে।

আমরা এখন যে জিনিসকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য মনে করছি তা আসলে ভবিষ্যতের জ্বালানি।


কাজী জাহিন হাসান, ব্যবসায়ী


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links