Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জহির রায়হান শহীদের ৫০ বছর

তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, উপন্যাস লেখক, গল্পকার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৪১ পিএম

লোকেশনে নেই, লেখার টেবিলে নেই, এফডিসিতে নেই। আমাদের সিনেমার শেষ আলো জহির রায়হান তবে কোথায়? তিনি আছেন অনন্তলোকে। যে জগত সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। তিনি কি দেখছেন? তার কি সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে বাংলা ছবির এই অন্তিম দশা? একের পর এক হল পতন। সিনেপ্লেক্স হাতে গোনা। সিনেমা নির্ভর এক নায়কে। সিনেমা নিয়ে নয়, নীতিভ্রষ্ট বখাটেপনার জন্য আলোচিত শিল্পী সমাজ। দেশের মানুষ ছবি দেখছে কম। মননশীল চলচ্চিত্র শিল্প নির্ভর বিদেশি ফ্যাস্টিভ্যালে। দেশে জারি থাকা দু:শাসন। মানুষের কষ্ট হয়। জহিরের হয়তো কষ্ট হয়। তবু মেনে নিতে হয় বাস্তবতা। এককভাবে এই একটি মানুষ অন্যদের থেকে আলাদা থাকেন কীভাবে? এর উত্তর তার সর্বসাচী সৃষ্টিশীল জীবন।

তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, উপন্যাস লেখক, গল্পকার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জহির রায়হান তার পরিবারের সাথে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে অর্থ্যাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হন। তবে তার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীতে। পারিবারিক নাম ছিল মো. জহিরুল্লাহ।  

জহির রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি উপস্থিত ছিলেন ২১ শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য সিনেমা বানাতে যা প্রয়োজন তার দক্ষতা তিনি নিজে নিজে অর্জন করেন। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে তার যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু। এরপর তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা এসব পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন প্রবাহ পত্রিকার। ইংরেজি সাপ্তাহিক "এক্সপ্রেস" এর সম্পাদকও ছিলেন জহির রায়হান।

চলচ্চিত্র মাধ্যমে তার পদার্পণ ১৯৫৭ সালে। "জাগো হুয়া সাভেরা" ছবিতে সহকারি হিসেবে কাজ করেন। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি "যে নদী মরুপথে" সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এ সবই ছিল তার এককভাবে নির্মাতা হিসেবে হাজিরের প্রস্তুতি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম জহির রায়হানকে "এ দেশ তোমার আমার" এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। এ ছবির নামসঙ্গীত তার রচিত। ১৯৬১ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন "কখনো আসেনি" চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দূর দৃষ্টির জহির রায়হান ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র "সঙ্গম" নির্মাণ করেন। পরের বছর তার সৃষ্টি বাংলার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র "বাহানা"। ১৯৬৪ সালে তার নির্মিত "কাঁচের দেয়াল" চলচ্চিত্রের জন্য তিনি নিগার পুরস্কার লাভ করেন। তার নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো আছে "বেহুলা", "সঙ্গম", "আনোয়ারা"।

 সাহিত্যিক জহিরকে অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ "সূর্যগ্রহণ" প্রকাশিত হয়। উপন্যাস লেখক হিসেবে "শেষ বিকেলের মেয়ে" দিয়ে ১৯৬০ সালে আত্মপ্রকাশ করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস "হাজার বছর ধরে" ও "আরেক ফাল্গুন"। "হাজার বছর ধরে" উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তার লিখিত উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে আরো আছে "পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ" প্রবন্ধ। এটি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী 'পরিচয়' সাহিত্যপত্রের বাংলাদেশ সংখ্যায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে এ প্রকাশিত হয়। জহিরের লেখা "অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র" প্রবন্ধটি সোভিয়েত বিপ্লবের ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে অক্টোবর ঢাকার সমাজতান্ত্রিক মহাবিপ্লব উদযাপন কমিটির স্মরণিকা 'তরঙ্গ'-এ ১৯৬৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়। তার কবিতা "ওদের জানিয়ে দাও" এখনো বহুল পঠিত।

জহির রায়হানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র "জীবন থেকে নেয়া" ছবির কাছে বাঙালিকে এখন পর্যন্ত ফিরতে হয়। যাতে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে ৬৯ এর গণঅভ্যুথান ও ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য তিনি তুলে ধরেন একটি সংসারের চাবির গোছাকে প্রতীকী করে।  

তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় চলে যান। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পক্ষে স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র "জীবন থেকে নেয়া" বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয়। ছবিটির প্রশংসা করেন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটকের বাংলা চলচ্চিত্রের মায়েস্ত্রোরা। সে সময়ে জহির রায়হান চরম আর্থিক দৈন্যে থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত সব অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা সহায়তা তহবিলে দান করেন।

 জহির রায়হান নির্মিত "স্টপ জেনোসাইড" প্রামাণ্যচিত্রে ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পূর্ণতা পায়না। বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যে নির্মিত এ ছবি শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বে নিপীড়িত গণহত্যার শিকার মানুষের প্রতিধ্বনী প্রকাশ করে। অসামান্য এ ছবিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মাইলফলক বললেও বেশি বলা হয়না।

দেশ স্বাধীনের পর জহির রায়হান ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন। প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন তার বড় ভাই। তিনি তখনো নিখোঁজ ছিলেন। ঢাকার মিরপুরে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ আরো অনেককে বিহারিরা আটকে রেখেছে বলে খবর পেয়ে বিচলিত হন।

১৯৭২ সালের আজকের দিন ৩০ জানুয়ারি সকালে তিনি সেনাবাহিনী ও পুলিশের বহরের সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে যান। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সেখানে গুলি বিনিময় শুরু হয়। এক পর্যায়ে বিহারিদের গুলিতে জহির রায়হান শহীদ হন। কিন্তু তার মরদেহ পাওয়া যায় না। দীর্ঘ দিন তাই ৩০ জানুয়ারিকে বলা হয়ে আসছিল "জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবস"। ১৯৯৯ সালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদক জুলফিকার আলী মাণিকের "ভোরের কাগজ" এ প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া যায় জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারিই শহীদ হয়েছেন। আজ এর ৫০ তম বছর।

এক বেদনা বিধুঁর দিন এই ৩০ জানুয়ারি। যাকে হারিয়ে বাংলা ছবি এখন নি:স্ব। কিন্তু জহির রায়হানের সৃষ্টিকর্ম হারিয়ে যায়নি। তার সাহিত্য, তার চলচ্চিত্র প্রেরণা জাগিয়ে বলে যাবে- আসছে ফাগুনে আমাদের দ্বিগুন হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা।  


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



About

Popular Links