Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জামদানি তাঁতিদের কথা আমরা শুনছি কি?

তাঁতিদের অভিযোগ, ভারতীয় ‘নকল’ জামদানির পাশাপাশি টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর তাঁতের শাড়িতে জামদানির নকশা এঁকে তাকেই ‘আসল’ জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দামে কম এসব বাহারি শাড়িতে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০৬:১৫ পিএম

বাংলার জামদানি একান্তই এ জনপদের। অমূল্য সম্পদ মসলিনের একটি ধারা জামদানি। ক্লাসিক মর্যাদা নিয়ে যা এখনও বিশ্ববাজারে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য চাই ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা।

তাঁতিদের ভাষ্য, ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিনের পর বিশ্ব ঐতিহ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে ঢাকাই জামদানি। কালের বিবর্তনে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সেই জামদানির আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। কিন্তু হঠাৎ ‘‘নকল জামদানি’’র প্রকোপে সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে, পথে বসতে চলেছেন বাংলার জামদানি তাঁতিরা।

তাঁতিদের অভিযোগ, ভারতীয় ‘‘নকল’’ জামদানির পাশাপাশি টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর তাঁতের শাড়িতে জামদানির নকশা এঁকে তাকেই ‘‘আসল’’ জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দামে কম এসব বাহারি শাড়িতে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তাঁতিরাও পাচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য।

সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে ঢাকার অদূরের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীর ও সোনারগাঁও উপজেলার তাঁতিদের এমন বক্তব্য।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পপল্লীর জামদানি তাঁতি মো. আনোয়ার আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘সতেরো বছর আগে আমি যখন তাঁতের কাজ শুরু করি, তখন দেশব্যাপী জামদানির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। বাংলার নারীরা আসল জামদানি খুঁজতে আমাদের খুঁজে বেড়াতেন। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন বায়না করতে। সুদিন এখন নেই কিন্তু জামদানির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি।’’

তাঁতি সাজ্জাত হোসেন সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘‘জামদানির মূল্য নির্ভর করে নকশার ওপরে। যে শাড়ির যত ভারি কাজ, তার দাম তত বেশি। আসল জামদানির বিক্রয়মূল্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ লক্ষাধিক টাকাও হতে পারে। নাইলন, সিনথেটিকের নকল জামদানির তো ৮০০ থেকে ২০০০ টাকাতেই মেলে।’’

সামনেই আসছে ঈদুল ফিতর। ঈদ উপলক্ষে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে জামদানির বায়না আসছে। তাঁতিদের তাই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটছে।

২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে জামদানি বুনে আসা মো. সোহেল বলেন, ‘‘ঈদ উপলক্ষে আমাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামদানি যাবে, ঢাকার ফ্যাশন হাউসগুলোতেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’’

তাঁতিদের নিপুণ হাতের বুননে তৈরি হয় একেকটি শাড়ি সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন

জামদানির বহু ধরনের মধ্যে এখন জনপ্রিয়- মালা, পাখি, পাটি, মালঞ্চ, মন্দির, ময়ূর, বাঘের পাড়া, বেতন ঝোপ, দাদুর শাড়ি, তেরছি, হাজারবুটি, কল্কা, ঘুড্ডিফুল। এ রকম শত মোটিফ দিয়ে সাজানো জমিন আর পাড়ের মন ভোলানো নকশার সমন্বয়ে নানা জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত এখন তাঁতি পাড়া। বাদ নেই সুতি, হাফসিল্ক, রেশমে ‘‘পুঁইডুগা পাড়’’, ‘‘মৌর প্যাচ পাড়’’, ‘‘করলা পাড়’’, ‘‘বক্স পাড়’’সহ নানা মোটিফ। জামদানির আভিজাত্যই যে তার নকশায়!

শুধু কি জামদানি শাড়ি! শাড়ির পাশাপাশি জামদানি নকশায় বেড কাভার, সোফার কুশন, টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, ছেলেদের পাঞ্জাবি, ফতুয়া, মেয়েদের থ্রি পিসও তৈরি হচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, জামদানির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে জামদানি নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। এতে তাঁতিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্বজুড়ে ঢাকাই জামদানির প্রচার-প্রসারের কথাও থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণার পর জামদানি শিল্পে সরকার বাড়তি নজর দিয়েছে। বিসিক তাদের নিয়ে কাজ করছে। তাঁতিরা নানা অভিযোগ করছেন। বিসিক এসব সমস্যার ব্যাপারে কতটুকু ওয়াকিবহাল, তা নিয়ে তাঁতিরা সন্দিহান।

বিদেশি পণ্যের প্রভাবে জামদানির ঐতিহ্য মলিন হলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষে জামদানি শাড়ির উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত হচ্ছে এখন।

জামদানি বুননে যেমন শ্রম বেশি, দামও তাই অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। যে মূল্যে ক্রেতারা ভিনদেশি কাপড় কিনছেন, সেই মূল্য কিন্তু নেহায়েত কম নয়।

এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভিনদেশি কাপড়ের প্রভাবে জামদানি শিল্প আপাতত ধাক্কা খেলেও ঠিকই আবার ঘুরে দাঁড়াবে। জামদানি ফিরে পাবে তার পুরনো ঐতিহ্য। তবে এর জন্য দরকার প্রকৃত কর্মনিষ্ঠ তাঁতিদের চাহিদা পূরণ ও তাদের কথা শোনা। ঐহিহ্যের বিনির্মাণ এ ছাড়া সম্ভব নয়।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links