Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘ঢাকা-ওয়াশিংটন বন্ধুত্বের’ একাল-সেকাল

বিদেশি সরকার উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পর্কে শেখ হাসিনার বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৩৭ পিএম

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন স্পষ্টতই খুশি যে তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে থাকাকালীন মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাকে তিনবার ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের সম্মানের জন্য তিনি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করেন। 

কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকটি ছিল সন্তোষজনক, আমাদের সেরকমই জানানো হয়েছে।

ওই বৈঠকে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা বুঝতে খুব বেশি জল্পনা-কল্পনার দরকার নেই। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অবশ্যই আলোচ্যসূচির শীর্ষে ছিল।

এর পাশাপাশি, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের বিষয়টি অর্থাৎ এই সংস্থাটির কিছু কর্মরত এবং প্রাক্তন কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অবশ্যই উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা স্পষ্টভাবে চাইবে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক। তবে এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন হত্যাকারীর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের মন্ত্রী ভালোভাবে উত্থাপন করেছেন। আমরা ভাবতে চাই যে, তিনি ব্লিঙ্কেনকে আইনের শাসনের ধারণার মূলনীতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, অর্থাৎ অপরাধ যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন শাস্তি যেকোনো জায়গায় হতে পারে।

মার্কিনিরা যখন বাংলাদেশে আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, আমরা তাদের কাছ থেকে জানতে আগ্রহী হই যে কীভাবে একজন ঘাতক তাদের দেশে আশ্রয় পায়।

আমরা যখন আইনের কথা বলি, এটিকে মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলি, তখন আমরা এটাও জানি যে যারা অপরাধ করেছে তাদের প্রত্যেককেই এর জন্য মূল্য দিতে হবে। কোনো আইন বা কনভেনশনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী তাদের দেশে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে সে বিষয়ে মার্কিনিরা অবশ্য আমাদের কখনো জানায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সাধারণত নানা ধরনের আশঙ্কা জড়িয়ে থাকে। এর কারণ হলো- ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান। স্নায়ুযুদ্ধের সময় চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে ইয়াহিয়া খান যেভাবে সহযোগিতা করেছিল, তার পুরস্কার হিসেবে ওয়াশিংটন তাকে বিচলিত করতে চায়নি।

নৈতিক নীতিগুলো এক অনৈতিক নীতির দ্বারা বাতিল করা হয়েছিল – একদিকে একটি জাতি ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্মম হামলার শিকার হয় অথচ অন্যদিকে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি সেই শাসকের পক্ষাবলম্বন করেছিল। ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্কের প্রথম দিকের এই পর্যায়টি দীর্ঘায়িত হয়েছে। 

সেদিন যখন আশ্চর্যজনকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অপছন্দের যেকোনো বিদেশি সরকারকে উৎখাত করতে পারে, তখন তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমেরিকার নানারকম ভূমিকার কথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন।

একাত্তরে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক অটুট রাখতে এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বাঙালির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনস্বরূপ গড়ে উঠা গেরিলা যুদ্ধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ওয়াশিংটন নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মুজিবনগর সরকারকে পাশ কাটিয়ে খন্দকার মোশতাকের নিউইয়র্ক সফরের সময় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পরে মোশতাকের সেই সফর বাতিল করেন।

বৃহত্তর বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং সম্মান অর্জনের জন্য আগ্রহী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যথাযথ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭২ সালের শুরু দিকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন প্রমাণ করে নতুন এই জাতির উত্থান অবশ্যম্ভাবী ছিল। 

তা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনের অসুখী মনোভাব ছিল খুবই স্পষ্ট। ইউ অ্যালেক্সিস জনসন কর্তৃক বাংলাদেশকে "আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস" হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা কয়েক দশক ধরে অব্যাহত ছিল। অবশ্য এই বক্তব্যের জন্য ভুলভাবে কিসিঞ্জারকে দায়ী করা হয়।

সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ স্পষ্টতই মার্কিনিদের জন্য অসন্তুষ্টির একটি কারণ ছিল। এর পেছনের কারণগুলো বোঝা খুব একটা কঠিন ছিল না। দিল্লী ও মস্কোর সঙ্গে ঢাকার দৃঢ় সম্পর্ক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্নায়ুযুদ্ধের সেই মৌসুমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারত জয়ের স্বাদ পায়, আর বাংলাদেশ ছিল সেই বিজয় মুকুট।

আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বাংলাদেশের একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সত্যিকারের আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

আমেরিকানরা তাজউদ্দীনের প্রতি কখনই খুশি ছিল না, কেননা তিনি বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে কিছু করার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে তিনি বাদ পরায় যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই অনেক খুশি হয়েছিল। তাজউদ্দীনের বিদায় নেওয়ার মাত্র চার দিন পর হেনরি কিসিঞ্জারের ঝটিকা ঢাকা সফর সেরকমই বার্তা দেয়।

সেই অক্টোবরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তার ভাষণ শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেয়ে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কিউবার সঙ্গে পাট ব্যবসার কারণে ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন বাংলাদেশের জন্য পাঠানো খাদ্যসাহায্য বোঝাই একটি জাহাজ মাঝপথ থেকেই ফিরিয়ে নেয়। ওয়াশিংটন তখন পিএল৪৮০-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এই সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট সংকটের পরই বঙ্গবন্ধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মার্কিন এই পদক্ষেপ বাঙালিদের দুর্দশাকে কেবল আরও বাড়িয়ে তুলেছিল; ফলে তারা দুর্ভিক্ষ এবং গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। 

১৯৭৪ সালের এই চিত্রটি সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালির উপলব্ধিতে আবারও ফিরে এসেছে, কেননা বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশ-রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে কঠিন করে তুলেছে। রাশিয়ান জাহাজ চলাচলের ওপর পশ্চিমা (মূলত মার্কিন) নিষেধাজ্ঞা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মস্কো থেকে আসা কাঁচামাল সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বেশ কিছুদিন ধরে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন জোটে ঢাকার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আমেরিকা। তবে নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে টেনে নেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশকে সফলভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে। ঢাকা এখন ভারত, চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে কাজ করছে, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতির অংশ।

বিদেশি সরকার উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পর্কে শেখ হাসিনার বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর উদ্দেশে দেওয়া কিসিঞ্জারের সতর্কবাণী আমেরিকার ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিল - মর্মে দেওয়া ক্ষুব্ধ ইমরান খানের যুক্তিও ফেলে দেওয়া যায় না।

আর বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীরা ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই কূটনীতিকদের কেউই বঙ্গবন্ধু বা তার সরকারকে চলমান ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি।

প্রয়াত সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেনস নিশ্চিত ছিলেন যে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাকে নির্মূল করার চক্রান্তে আমেরিকার হাত ছিল। এই বক্তব্যের পেছনের যুক্তিগুলো তিনি তার বই দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার-এ লিপিবদ্ধ করেছেন।

আর বর্তমান পরিস্থিতি হলো – একদিকে ওয়াশিংটন মানবাধিকার ও নির্বাচনী ইস্যুতে ঢাকাকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের মাধ্যমে বিদেশি সরকারগুলোকে অকার্যকর প্রমাণ করার আমেরিকার পুরানো সেই পদ্ধতি সবাইকে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

এটি সত্য যে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের এই ক্ষোভ প্রকাশে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে না। তবে তারা বাংলাদেশে কোনো বিশেষ দলকে সমর্থন করে না এবং দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায় – এই মর্মে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য সত্যিই চিন্তার খোরাক যোগায়। হয়ত এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করতে চায় যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে তারা বিরত থাকবে। 

তবে সত্যিকার অর্থে এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি জাতীয়তাবাদী সরকারকে হালকাভাবে নেবে, কেননা বিদেশি রাষ্ট্রের দৃঢ়চেতা রাজনীতিবিদরা সব আমলেই ওয়াশিংটনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইংরেজি মূল কলামটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন


সৈয়দ বদরুল আহসান একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও জীবনীকার।


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



About

Popular Links