Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মহামারি ও অনাগত অগ্রহায়ণ কথন

তবুও আমাদের স্বস্তি তারা বেঁচে আছেন। কারণ এখনও আমরা বিচারবর্হিভূত হত্যার সংখ্যাবৃদ্ধির তথ্য পাই। তাই এ মরার দেশে জীবন উদযাপনের। জয়তু জীবন! চিয়ার্স পরীমণি

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ০৬:৫৯ পিএম

বাংলায় কার্তিক চলছে। এ কার্তিকে উত্তরবঙ্গে মঙ্গা ছিল একদা। ভাত জুটতো না, কাজ জুটতো না। এখন দিন পাল্টেছে। যদি নিশ্চিত বলা যায়, উদরপূর্তিই “উন্নয়ন” নয়। পথের কুকুরও না খেয়ে থাকে না। উন্নয়ন বোঝায় সামগ্রিকতায়। সুশাসনে, সামাজিক ন্যায়বিচারে। এ থেকে আমরা কত দূরে তারও নিকাশ নেওয়ার পালা এখন।  

এখন একটি আড়মোড়া ভাঙার ক্ষণে যেন আমরা। মহামারি স্তিমিত। তা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই চারপাশে। বাঁচতে হবে। বেঁচে থাকার ঋণ শোধ করতে হবে। বহু মৃত্যুর পরও তো আমরা জীবিত। এখন এই জীবনের জয়রথ সামনে ঠেলে নেওয়ার পালা।

চলমান বৈশ্বিক মহামারি এখনও প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সবাই বলছেন আসছে শীতে বাড়বে সংক্রমণ ও মৃত্যু। তাই মানতেই হবে কী অনবদ্য এই বেঁচে থাকার মুহূর্তটুকু! এক দম বাতাস পাচ্ছে ফুসফুস। টিকে আছি এই শেষ কথা। 

তামাম জমিনে জারি থাকা অর্থনৈতিক দশা মেনে নিয়ে বলতে হয়, “শ্বাস-প্রশ্বাসই এখনের শ্রেষ্ঠতম বিনিয়োগ।”

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যে জানতে পারি, পৃথিবী আজকের দিন পর্যন্ত হারিয়েছে ৫০ লাখ ৯ হাজারের বেশি মানবপ্রাণ। প্রতি সেকেন্ডে এ সংখ্যা বাড়ছে। খেলার আপডেটের মতো যেন প্রাণ যাওয়ার সংখ্যা। কেউ অক্ষত নেই। শক্তিশালী অর্থনীতি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, শান দেওয়া অগণন যুদ্ধাস্ত্র অসহায়। এ মৃত্যু দেশ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে। সার্বজনীন মৃত্যু প্রহর বিরাজমান।

কিন্তু লেনদেন থেমে নেই। আমরা দেখলাম, লকডডাউন পৃথিবীতে ধন বাড়ল ধনীদের। ডলার ও ভার্চুয়াল কারেন্সিতে উপচে পড়া ওয়াল স্ট্রিট, সিলিকন ভ্যালি। যখন কর্মচ্যুত কোটি মানুষ। আগুনে পুড়লো আমাজন। যুদ্ধ থামেনি পৃথিবীর মাঝের মানচিত্রে ও আরও অনেক প্রান্তে। নিশ্চিহ্ন থাকার কথা যে বর্ণবাদ, তাতে মৃত্যু। নাসার কল্যাণে দেখা বিপুল অর্থে মঙ্গলে রোভার ল্যান্ডিং। দেখেছি সেনা অভ্যুত্থান। একাধিক শক্তিশালী ক্যাটাগরির সমুদ্র থেকে উঠে আসা দুর্যোগ। ভূমিকম্পও বাদ থাকেনি। আমরা জানি না কোন দায়ে মানুষ মরছে!

স্বদেশে আমরা দেখলাম শারদ সন্ত্রাস। ঘিনঘিনে ঘাঁয়ের মতো সাম্প্রদায়িকতা বিলীন হয়নি। বরং শাসকের লাগানো আগুনে তা মাথা তুলে দাঁড়ালো আরেকবার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান চারপাশে। রামু, নাসিরনগর, নোয়াখালীর মতো কুমিল্লায়ও থাকবে হয়ত আসল কুশীলবরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

আমরা দর্শক। দেখে যাচ্ছি লাইভে। দেখছি রেকর্ডেড। কখনও পথে নেমে চাক্ষুষ। অপার সম্ভাবনার মনুষত্ব খুন হচ্ছে প্রতিক্ষণ চোখের সামনেই। এখন পর্যন্ত কোনো আবু লাহাবের ধ্বংস হলো না। বিরামহীন প্রাণ গেল শুধু নিম্নবর্গের। আমাদের কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই। এ যদি নিয়তি হয় তবে, জানিয়ে দেই- আমরা তাকে সব বলে দেবো।  

জন্মভূমির দিকে দৃষ্টি দেই। সংবাদমাধ্যম বরাতে জানতে পারি, দেশে কোভিড সংক্রমণের ৬৮তম সপ্তাহ গত ২৬ জুন শেষ হয়েছে। এই সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে গড়ে প্রতিদিন মারা গেছেন প্রায় ৮৪ জন। আইইডিসিআরের দেওয়া তথ্যে এখন জানতে পাই, মহামারিতে বিদায় নিয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার ৮৭৩ জন দেশবাসী। এ সংখ্যাও প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে বলা বাহুল্য।

দেশকর্তারা মত্ত ছিলেন আরেক উৎসবে।

লিস্টেড জনযোদ্ধাদের ভাতা কিছু বেড়েছে সত্য। কিন্তু তালিকার তালগোলও আবার উন্মোচিত।

মহামারিতে স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তদের নৃশংস সত্য গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে। ভ্যাকসিন নিয়ে চলেছে দরবেশী মনোপলি। সত্য বলায় কারও মৃত্যু হয়েছে সুরক্ষিত কারাগারে। জেলে জেলে টুঁটি চাপা আইনে নির্যাতিত হয়েছেন বহু। তবুও আমাদের স্বস্তি তারা বেঁচে আছেন। কারণ এখনও আমরা বিচারবর্হিভূত হত্যার সংখ্যাবৃদ্ধির তথ্য পাই। তাই এ মরার দেশে জীবন উদযাপনের। জয়তু জীবন! চিয়ার্স পরীমণি!! 

কিংবদন্তি বচ্চনজিকে সম্পদের হিসেব দিতে হয়। শাহরুখ খানদের মান্নাতে সিবিআই হানা দেয়। সালমান, সঞ্জয় জেল খাটে। কিন্তু পিকে হালদারদের ভূমে কার জবাবদিহিতা আছে? বিদেশে বিলাসবহুল বেগম পাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক লোপাট - এই সীমাহীন, মাত্রা ছাড়া ভোগবাদে ছুঁচো প্রসঙ্গ বরং অনেক সমস্যায় জর্জরিত দেশবাসীর সামনে এলিট, আইনরক্ষী, ক্লাব রাত্রি, জনবিচ্ছিন্ন “নারীবাদ” চর্চা, “সংস্কৃতিকর্মী” ও “বিনোদন সাংবাদিকতা” সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। নিরক্ষর হলেও জনগণ এ কাপড় খোলাদের সম্পর্কে জানেন। তবে এ মহামারিকালে এটি যেকোনো বাণিজ্যিক বিবেচনায়ও শীর্ষে থাকার কিছু না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় প্রতিটি অভ্যুত্থানকালে দালাল সংবাদমাধ্যম প্রথম গণআক্রোশের শিকার হয়।    

যারা সবার শেষে ঘুমান, জাগতে হয় সবার আগে, যারা ঘোরায়, পোড়ে, চালায় তাদের দিকে নজর ছিল না কারও। জিডিপি গ্রোথের গর্ব যে প্রবাসী ও দেশি মহান প্রাণশক্তির তারা খেলার গুটিই থেকে গেলেন।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, রাজধানীর জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। এখন তা হয়তো চার কোটি ছাড়িয়েছে। ভাড়াটিয়া পরিষদের হিসাব বলছে, এর মধ্যে ৮০% লোক ভাড়ায় বসবাস করে। সে হিসেবে ঢাকা শহরে ভাড়ায় থাকে এক কোটি ৩৬ লাখ মানুষ। 

মহামারিতে বারবার ঘরে থাকতে বলা হলেও সে ঘর ভাড়ার দায়িত্ব কেউ নেয়নি। ঘরহীন মিসকিনদের কথা তো বাদই। খারাপ লাগছে ৫২ বাজার ৫৩ গলির ঐতিহ্যের নগর বিপুল মানুষের কাছে জীবিকা ধ্বংসকারী রূপে শনাক্ত হবে। তাঁরা শহর ছেড়েছেন। দুনিয়ার নিকৃষ্ট শহরের তালিকার উচ্চে থাকা ঢাকায়ও টেকা গেল না। আমরা কেউ তাদের বলে দেইনি, “কোথায় শান্তি পাবে কোথায় গিয়ে?...” শান্তির জন্য প্রথম দরকার পেটে কিছু দেওয়া। এই জীবিকা হারানো গ্রামে যাত্রাকারীদের কাছে তাই অনুতপ্ত হয়েই থাকতে হবে শহরবাসীকে।

গত বছরের ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এক জরিপ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, প্রথম দফার সাধারণ ছুটির ৬৬ দিনে দেশের তিন কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন লোক চাকরি বা উপার্জন হারিয়েছেন। করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আগে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৪০ লাখ। ছুটির ৬৬ দিনেই “নবদরিদ্র” মানুষের সংখ্যা বাড়ে বহুগুণ। জরিপ বলে, নিদানকালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় কোটি ৮০ লাখে। এ বছরের হিসেব জানা নাই।

মহামারির তীব্র ছোবলে এভাবেই আক্রান্ত হয়েছে স্বদেশ। পাটুরিয়ামুখী মানুষেরা হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। দিল্লির কৃষকদের মতো আমরা তাদের রক্তাক্ত পায়ের কোনো ছবি এখন পর্যন্ত দেখিনি। ঘরে ফেরা “স্বপ্ন যাবে বাড়ি”র মতো শ্যামলীমা-শোভিত ড্রোনশটপূর্ণ ছিল না। 

“ঢাকা শহর আইস্যা আমার আশা ফুরাইছে”- এ উপলব্ধি সত্য হলো এসব মানুষের। পোশাক শ্রমিকদের প্রতি কর্তাদের আচরণ ক্রীতদাস প্রথাকে মনে করায়। চাকরির সুতায় টান দিয়ে কখনও তাদের শহরে আনা হয়েছে। কখনও ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হয়েছে মারাত্মক গণসংক্রমণের প্রহরে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পুড়ে মরেছে ছাপড়া ঘরে লাগা রহস্যময় আগুনে। ঠেঁসে তাদের পাঠানো হয়েছে জাহাজে ভাসানচর। বলা হয়েছে, ও চরে না কী এলাহি আয়োজন থাকার। বিশ্ব ও দেশ কর্তাদের কাছে শুধু জানতে ইচ্ছে হয়েছে, সেখানে কবরস্থান আছে কি-না? কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিজ ভিটা হারানো মানুষ তো মৃতের সমতুল্য।

লকডডাউনে দেশ থেকে হিমালয় দেখা গেছে স্পষ্টভাবে। বায়ু দুষণ কমায়। এখন দেখুন তো? আর ধরা দেবে চোখে সেই ধ্যানমগ্ন পর্বত? সার্বিকভাবে কোনো দূষণই মহামারিতে কমেনি। অনবদ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে আগুন লেগেছে কয়েক দফায়। তদন্ত কমিটি হয়েছে। এর কারণ ও কোনো প্রতিকার হয়নি। কিন্তু ক্ষত নিজের বুকে পুষে রেখেছে দক্ষিণ বাংলামুখী সাইক্লোনের ফার্স্ট রেসিট্যান্সের এ চিরহরিৎ। মধুপুর বন আর সেখানে বাস করা নৃগোষ্ঠী বিপন্ন হয়েছে। অতিমারির পরেও আমরা সবুজের দর্শনবঞ্চিত।

বিদ্যাপীঠ শোচনীয়। এখন তা খুলেছে। কিন্তু অমূল্য শিক্ষা আঙিনার বিকল্প ভার্চুয়াল কোনো কিছুতে হয় না। শিশু, কিশোর, যুবক শিক্ষার্থী হারিয়েছেন শিক্ষণীয় দেড়টি বছর। দেশ সামনে পাবে অটোপাশ, জিপিএ ফাইভ গর্বিত ভিত না থাকা প্রজন্ম। কার বিরুদ্ধে লড়াই যে পাসের গর্বে ভি সাইন প্রদর্শনী? ফেলটুস মনটা এর জবাব চায়।

সবাই বলছেন, কোভিড পূর্ব ও পরের পৃথিবী এক হবে না। এ এক অর্থে সত্য। তবে ক্ষুধা, সম্পদের কেন্দ্রিকরণ, শাসন, শোষণ, জুলুম, নজরদারি, যুদ্ধ- এর কিছুই পরের পৃথিবী থেকে বিলীন হবে না। বাস্তবতার সামনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা বাকোয়াজি ছাড়া কিছুই না।

অতিমারিতে আমাদের একমাত্র সম্পদ বেঁচে থাকা। আগে উল্লিখিত কথা। সে শক্তিতে আমরা কি পারব দূরে থেকেও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তিকে একত্রিত করতে? আসছে অগ্রহায়ণে কি নতুন ফসল আমরা ঘরে তুলতে পারব? হবে কি ফসলের সুষম বণ্টন? ন্যায্য শ্রমের মর্যাদা পাবেন সবাই? 

স্বাধীনতার ৫০-এ এমন প্রশ্নও ভাবতে হয়। ভাবনা আমাদের অসীম। ভাবনা আর সক্রিয়তায় আমরা নতুন পৃথিবী, নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের সে সুযোগটুকু দেয়। সক্ষমতা আর সামর্থের সুযোগ চাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু নয়।


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links