Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অসামান্য অর্জনক্ষণে মেসি নিয়ে ব্যক্তিগত নৈবেদ্য

তোমার কাছে পৌঁছে যাক এই দূরবর্তীর হৃদয় ঝরা ভালোবাসা। শুধু এই বিশেষ ক্ষণে নয়। আমি অক্ষরজীবী আমত্যু তোমার স্বর্গীয় বাঁ পায়ের বন্দনা রচি দুর্বল শব্দমালায়

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০৫:২৫ পিএম

বিশ্ব জেনে গেছে লিওনেল মেসির সপ্তমবারের মতো ব্যালন ডি'অর অর্জনের অসামান্য কৃতিত্বের কথা। এমন দিনে তাই তার উদ্দেশে এক অভাজন ভক্ত হিসেবে চিঠি লেখাই কর্তব্য মনে হয়েছে।

প্রিয় লিও,

তোমার কাছে পৌঁছে যাক এই দূরবর্তীর হৃদয় ঝরা ভালোবাসা। শুধু এই বিশেষ ক্ষণে নয়। আমি অক্ষরজীবী আমত্যু তোমার স্বর্গীয় বাঁ পায়ের বন্দনা রচি দুর্বল শব্দমালায়।

নৈবেদ্যের কারণটুকু আগে জানাই। আমি আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল সমর্থক নই। শৈশবে বিশ্বকাপে সাম্বার ছকে খেলা ব্রাজিলের সমর্থক ছিলাম। তখন বাসায় না ছিল ইন্টারনেট অথবা ডিস কানেকশন। ইউরোপীয় ফুটবল দেখার সুযোগ আসে অনেক পরে। এরপর টিকিটাকা নকশার বার্সেলোনা ফ্যান হয়ে যাই। মাঠজুড়ে পিকে, ফ্যাব্রেগাস, জাভি, ইনিয়েস্তা, আর তুমি। কী যৌথতাই না ছিল তোমারদের! তা হবে না-ই বা কেন? তোমাদের প্রায় সব্বাই তো ''লা মাসিয়া"র শিক্ষাভূমির একনিষ্ঠ ছাত্র।

এই লা মাসিয়া পর্যন্ত আসা তোমার জন্য সহজ ছিল না। লিও জাদু, তোমাকে ভালোবেসেছি তোমার লড়াইয়ের জন্য।

তুমি রাজধানীর রাজনন্দনের কেউ নও। বুয়েনস এইরেস থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে পারানা নদীতটের রোজারিওতে তোমার আবির্ভাব গত শতকের ১৯৮৭-তে। তা-ও যদি হতে বাপের টাকাওয়ালা পরিবারের কেউ! বাবা হোর্হে মেসি আর মা সেলিয়া কুকিতিনি এক কথায় শ্রমজীবী। নাদুসনুদুস তুমি ছিলে না কোনোকালেই। লিকলিকে তোমার প্রাণভোমরা ছিল শুধুমাত্র বাতাসভরা ফুটবল।

ম্যারাডোনার দেশ তোমার। আর সবার মতো তোমার পরিবারও ফুটবলঘেঁষা। আপন ভাইয়েরা খেলত, কাজিনরা খেলত। বাবাও সময় পেলে শেখাতেন বলের জাদু। বেশি আস্কারা পেয়েছিলে নানি সেলিয়ার কাছ থেকে। তোমাকে মাঠে নিয়ে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তোমার ১১ বছর হতে না হতেই নানির বিদায়। এখনও তোমার হাহাকার এই নানির জন্য। প্রতিটি গোলের পর দু'হাত তুলে তুমি আকাশে নানিকে দেখো আর দেখাও, এই যে আমি।

মাত্র ছয় বছর বয়সে রোজারিওর ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে মাঠ দাপানো। ৫০০ গোল করেছিলে এই ক্লাবের হয়ে। ১০ বছর বয়সেই তোমার ফুটবল যাত্রা শেষ হতে পারত। দূরারোগ্য হরমোনজনিত ব্যাধি ধরা পড়ে, যার চিকিৎসায় লাগবে মাসে এক হাজার ডলার। কোত্থেকে আসবে টাকা? কোনো আর্জেন্টাইন ক্লাব দায়িত্ব নেয়নি। তোমার পারিবারিক যোগসূত্র ছিল স্পেনের কাতালুনিয়ার সঙ্গে। তোমরা সেখানে চলে যাও। সেখানে তোমার ফুটবল শৈলীতে মুগ্ধ বার্সার জুনিয়র টিমের কর্তারা। একটি পেপার ন্যাপকিনে সাইনিং সষ্পন্ন হয়। এরপর থেকে ন্যু ক্যাম্প তোমার ঘর বাড়ি আর ঝোড়ো ফুটবলের সাক্ষী। এখনো চেপে রাখা কাতালুনিয়ার মুক্তি সংগ্রাম দাবিয়ে রাখা যাবে না। তুমিসহ বার্সা তো এ নিয়ে একাত্ম।

তুমি আজ ত্রাণকর্তা পিএসজি'র, তুমি ভরসা আর্জেন্টিনার। অনেক কিছু সইতে হয় তোমাকে। বিশ্বকাপ ছোঁয়া হয়নি আজও। এ দায় যেন তোমার একার। এক ম্যাচে জালে বল জড়াতে না পারলে ট্রল হয়। লোকেরা ভুলে যায় তোমার জেতা ব্যালন ডি'অর সংখ্যা। চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি। ১০টি লা লিগা ট্রফি। আর সেই সঙ্গে ৭৫০টি সিনিয়র ক্যারিয়ার গোল। আর সব গোল-অ্যাসিস্টের হিসেবে তো সুপার কম্পিউটারও রাখতে অক্ষম।

পা দিয়ে ভাগ্য বদল করেছ তুমি। ডলারে উপচে পড়া আজকের তুমি। অ্যাডিডাস টাকা ঢেলেই যাচ্ছে। এনডোর্সমেন্টের তীর্থ তুমি। বছরে এক বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি আয়ের নজির আছে তোমার। বাড়ি, গাড়ি, ইয়ট, বিমান...তাক লাগানো সব ব্যাপার-স্যাপার। স্বপ্নের বলের পেছনে ছুটেছিলে। তাই সম্পদ এখন পদতলে।

মাঠে মাঝে মাঝে মেজাজ হারাও। আছে ট্যাক্স ফাঁকির প্রমাণ। কিন্তু আলো-অন্ধকার মিলেই তো মানুষ। অনেকে তোমাকে ভিন গ্রহের ফুটবলার বলে। আসলে বাস্তবের তুমি দোষ-গুণে মিলিয়ে একজন মানুষই। জন্মদিনে তোমার গালমন্দ করতে চাই না।

এত শৈশবে তারকাখ্যাতির পরও তোমার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গ সংশ্লিষ্ট বখাটেপনার তেমন নজির পাওয়া যায় না। কোনো সুপার মডেল জীবন সাথী হয়নি তোমার। জন্মভূমি রোজারিওই মেয়ে আন্তোনেলা রোকুজ্জোর প্রেমেই বুঁদ হয়ে আছো এখনও। পাঁচ বছর বয়সে তাকে তুমি প্রথম দেখেছিলে, এমনই তো শুনেছি।

আচ্ছা, তোমরা কি তখন একটা স্যান্ডউইচ দুজন ভাগাভাগি করে খেতে? থিয়াগো, মাতেও, সিরো বড় হচ্ছে। শিখিয়ে দিও ওদের জীবনে লড়াইয়ের কায়দা।

আবারও শুভেচ্ছা লিও! শুভ দিনে "করো আনন্দ আয়োজন করে..."। আপাতত বিদায়।


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


 প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links