Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সন্তানের কথা কতটুকু ভাবছেন?

ডিভোর্সের প্রভাব যেমন দম্পতির ওপর পড়ে, তেমনি পড়ে সন্তানদের ওপরেও

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:২৩ এএম

সভ্যতার বিক্ষিপ্ত বিস্তৃতিতে আমরা রীতিমতো পাল্টে যাচ্ছি দিন দিন। সভ্যতার চাদর গায়ে নিজেকে সমাজে উপস্থাপন করে চললেও, আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পারছি? এই প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র। ভালোবাসার এই পবিত্র সম্পর্কেই এক সময় সম্পর্কের পূর্ণতা নিয়ে আসে সন্তান। সম্পর্ক আরও শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে যায় সন্তানের মায়ায়। 

কিন্তু আজ সভ্যতার অন্তরালে যেন সবারই আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব বেড়ে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন সন্তানের মায়ায় পিতামাতা অনেক কিছু সহ্য করতেন। সন্তানের মাঝে খুঁজে নিতেন নিজেদের অস্তিত্ব। তাই নিজেদের মধ্যে অনেক মনোমালিন্য মিটিয়ে নিতেন, ক্ষমা করে দিতেন পরস্পরের ত্রুটি, যাতে সন্তানের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না আসে। 

অথচ সময়ের ব্যবধানে এখন সন্তানের দিকে নজর দেওয়ার মতো সময়ও নেই অনেকের। এখন সন্তানের মাঝে অনেক পিতামাতা নিজেদের অস্তিত্বও অনুভব করতে পারেন না। তাই তো সদ্যজাত শিশু সন্তানকে পাওয়া যায় ডাস্টবিনে, ড্রেনে।

বাবা-মায়ের পরকীয়ার ফলে অবুঝ শিশু হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে সমাজে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় তারা আলাদা হয়ে যাওয়ায় সন্তানকে চাইল্ডহোমে রেখে আসা হচ্ছে। একবারও ভাবা হচ্ছে না ঘরের ছোট বাচ্চাটির কথা, তার ভবিষ্যতের কথা। এই কি সভ্যতার ফলাফল? 

ডিভোর্সের ফলে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ওপর যেমন প্রভাব পড়ে, তেমনি পড়ে সন্তানদের ওপরেও। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ফলে সন্তানের মনে এমনিতেই এক ধরনের অবসাদ তৈরি হয়। পাশাপাশি অতি উৎসাহী আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী তাদের সামনে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা বা নানারকম প্রশ্ন করে বিব্রত করে থাকে। 

এই শিশুদের শৈশব অন্যদের মতো নয়। তারা নিজেদের আবেগ অনুভূতি গুটিয়ে রাখতেই বরং পছন্দ করে। ফলে চারপাশের লোকজন তাদের ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। স্কুলের শিক্ষকরাও এ শিশুদের অন্যদের চেয়ে ভিন্ন নজরে দেখে থাকেন। কোনো একটা অপরাধে অনেকটা মুখের ওপর বলেই ফেলেন, “বাবা-মা ছাড়া সন্তান এমনই হয়।” 

অথচ এমন নয় যে, সেই ভুলগুলো স্বাভাবিক পরিবারের সন্তানগুলো করেনা। আসলে আমরা মুখেই বলি, “সব শিশু সমান।” বাস্তবতা তা নয়। 

বাবা-মায়ের অভাবে শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা-মায়ের নতুন বিয়েও তারা সহজভাবে নিতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে এ কারণে কারণে, নতুন পরিবারেও তাদের জায়গা হয় না। শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে নেওয়া না হলে, আর্থিক কারণে শিশুটি অন্যের কাছে ছোট হয়ে থাকে। অনেকটা আশ্রয় নিয়ে বড় হয় নানাবাড়িতে বা অন্য কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে। ফলে নিজের মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে না।

একট শিশু যখন ছোট থাকে তখন সেই তাকে সবাই আদর করতে চায়, আত্মীয়রাও নিজের সন্তানের মতো করেই তাকে পালন করতে চায়। ছোট বাচ্চার গায়ে এক ধরনের আদুরে গন্ধ থাকে, কোলে নিলেই আপন করে নিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু সে বড় হয়ে গেলে সেই আদুরে গন্ধটিও থাকে না, সেই আপন করে নেওয়ার ইচ্ছেও থাকে না। 

তখন এই শিশুগুলোও বুঝতে পারে সন্তানের মতো আদর আর নিজের সন্তানের পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ছুটি” গল্পের ফটিকের কথা মনে আছে? সেই ফটিকের অবস্থা হয় এই সন্তানগুলোর। 

এ ধরনের শিশুরা যেমন অবহেলিত তেমনি আবার কখনো কখনো অতিরিক্ত প্রশ্রয় পেয়েও বড় হয়। শিশুর অভিভাবক বা শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভাবেন, “ইশ, বাচ্চাটার বাবা-মা কাছে নেই।” ফলে শিশুর ব্যবহার বা কাজে ভুল থাকলে সংশোধন করেন না। অনেক সময় বাবা-মায়ের অভাব অনেক বেশি দামী উপহার দিয়ে পূরণ করতে চান। না চাইতেই সব আবদার মিটিয়ে ফেলা হয়। আর অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের ফল যে ভালো হয় না, সেটাও কিন্তু নতুন কিছু নয়। 

আবার অবহেলিত শিশুদের সংকট আরেক ধরনের। এই শিশুরা বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকার  ফলে তারা যথেষ্ঠ আদর পায় না। তারা ওই অভাব তখন অন্য কারো কাছ থেকে পেতে চাইবে। সেক্ষেত্রে খারাপ মানুষজন তাদেরকে খুব সহজেই আদর-স্নেহ-ভালোবাসার নামে বশীভূত করে ফেলতে পারে। এতে সে শিশু বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। যৌন নিগৃহের স্বীকার থেকে শুরু করে কোনো ধরনের উগ্রপন্থী দলে ভিড়ে যেতে পারে খুব সহজেই। 

পরিশেষে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা এক দিনে ঘটে না, এর আগে ঘটে থাকে অনেক অপ্রীতিকর বিষয়। এই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর সাক্ষী থাকে ঘরের সেই ছোট শিশুটি। দীর্ঘদিন ধরে চলা মানোমালিন্য, শারীরিক নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, কান্নাকাটির মতো অপ্রীতিকর অনেক ঘটনায় শিশুটিকে সামনাসামনি হতে হয়।

বাড়ির ছোট শিশু এসব দেখে বাড়ির সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। সরাসরি বাবা-মায়ের কলহ না দেখেও শিশুরা নিজেদের মতো করে বুঝে নেয়। আবার অনেক সময় বাবা-মায়ের ভেতরে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স শিশুর মনে সাক্ষী রেখে দেয়। যা দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক ধারণার ভেতর রাখে শিশুদের। বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। তারা একটা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যায়। বাবা-মায়ের ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে, সে বিষয়েও তাকে প্রভাবিত করা হয়। ফলে জন্মদাতাদের প্রতি একটি বিরূপ ধারণা নিয়ে সন্তান বড় হতে থাকে।


ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান, আইনজীবী


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links