Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আতশবাজি পোড়াচ্ছি, পাখিদের কথা কি ভেবেছি?

একটি আতশবাজিতে ৭৫% পটাশিয়াম নাইট্রেট, ১৫% চারকোল এবং ১০% পর্যন্ত সালফার থাকতে পারে। এগুলোর প্রত্যেকটিই পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৩২ পিএম

এই প্রশ্নটা সহজ, একদিনই তো নতুন বছরের উদযাপন, এমন কী ক্ষতিই বা হচ্ছে? একদিন বা এক মুহূর্ত নয়, আমরা কি আদৌ ভেবে দেখেছি- আমাদের এই সাময়িক চোখ ধাঁধানো-কান ফাটানো উদযাপন পরিবেশে কতটা বা কীভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলছে?

একটু সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যাক- মাঝরাত, গভীর ঘুমে আপনি। আচমকা খুব কাছে প্রচণ্ড শব্দে যদি বোমা ফাটে অথবা বড়সড় ভূমিকম্প হয়, আতঙ্কের মাত্রাটা কেমন হতে পারে? মানবসৃষ্ট প্রচণ্ড শব্দে ঠিক এই ঘটনাটাই পাখিদের সঙ্গে ঘটে।

প্রতি বছর নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে অন্তত ঘণ্টাব্যাপী চলে আতশবাজির খেলা। হাজার হাজার ফানুসে ছেয়ে যায় ঢাকার আকাশ। এত বিকট শব্দ,তীব্র আলোর ঝলকানি এবং এর সঙ্গে যে পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক কণা বাতাসে ছড়ায় তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আমাদের এই সাময়িক উদযাপন কিছু প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। বিষয়টি নিয়ে আমাদেরই চিন্তা করা উচিত, সচেতন হওয়া উচিত।

রসায়নবিদ ও পাইরো টেকনিস্ট গুনটার ক্লেইন-সমারের মতে, একটি আতশবাজিতে ৭৫% পটাশিয়াম নাইট্রেট, ১৫% চারকোল এবং ১০% পর্যন্ত সালফার থাকতে পারে। এগুলোর প্রত্যেকটিই পরিবেশের জন্য বেশ ক্ষতিকর। ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই কণাগুলো ধাতুর লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে শুধু যে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে তা নয়, এর ফলে “গ্রিনহাউস” গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত কার্বন মনোঅক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেনযুক্ত গ্যাস তৈরি হয়। যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। এই গ্যাস এবং ধাতুযুক্ত কণাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে খুব দ্রুত ফুসফুস এবং রক্তে মিশে যেতে পারে। ফলস্বরূপ তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে।

২০২১ সালের শুরুতে ইতালির রোমের রাস্তায় মৃত পাখিদের সারি। ছবি: সংগৃহীত


জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই একদিনে বাতাসে যে পরিমাণ স্মোগ (ধোঁয়া এবং কুয়াশার সংমিশ্রণ) তৈরি হয়, তা কোনো যানবাহন থেকে এক বছরে নিঃসরিত গ্যাসের সমান। ইতালিতে ২০২১-কে বরণ করে নেওয়ার সময় আতশবাজির ঝলকানি ও বিকট শব্দে মারা পড়েছিল শত শত পাখি। যাকে ‘‘গণহত্যার'' সঙ্গে তুলনা করেছিল প্রাণী অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংগঠন আইওপিএ। বাংলাদেশে এমন কোনো পরিসংখ্যানের কথা জানা যায় না। প্রতিদিন এদেশে গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় (ঢাকা ট্রিবিউন, অক্টোবর ২১, ২০২১), সেখানে পাখির মৃত্যু নিতান্তই তুচ্ছ বিষয়!

গতবছর থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ফাটানো-পোড়ানো এবং ফানুস ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়। উন্মুক্ত স্থানে তো বটেই, বাসাবাড়ির ছাদেও এমন কোনো আয়োজনে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তা সত্ত্বেও, ধারণা করা হয় অন্তত ৫০ কোটি টাকার আতশবাজি ও ফানুস বিক্রি হয়েছে গত বছর থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে (সারাবাংলা.নেট, ৪ জানুয়ারি,২০২০)। পুরো শহরের হিসেব বাদ দিলেও কেবল পুরান ঢাকায় অন্তত ৩০ হাজার বাড়ি রয়েছে। প্রায় প্রত্যেক বাড়ির ছাদেই এ দিনটিতে বাজি ফোটানো হয়। ছাদপ্রতি গড়ে যদি সর্বনিম্ন ১০টি বাজিও ফোটানো হলেও তিন লাখ বাজি পুড়বে শুধু এই এলাকাতেই।

একই ঘটনা ঘটে সাকরাইন উৎসবেও। নতুন বছরের চেয়েও বেশি আতশবাজি বিক্রি হয় সাকরাইনে। নিষিদ্ধ ব্যবসাও গড়ে উঠেছে এই আতশবাজি বিক্রিকে কেন্দ্র করে।

এখন হয়ত প্রশ্ন আসবে, বছরের শেষটা কি তাহলে ঝলমলে আলোয় বিদায় জানানো হবে না? উত্তর হতে পারে, ইকো-ফ্রেন্ডলি কিছু আতশবাজি আছে যা তুলনামূলকভাবে কম সালফার এবং কার্বনযুক্ত গ্যাস নিঃসরণ করে, সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া, প্রত্যেক বাড়িতে কিশোর বয়সী থেকে শুরু করে ছোট বাচ্চারাও এই আতশবাজি ফোটানোর কাজে যুক্ত থাকে,যা খুব বিপজ্জনক। বরং কিছু নির্দিষ্ট পাবলিক প্লেসে নির্দিষ্ট পরিমাণ আলোকসজ্জা/আতশবাজি ফোটানো যেতে পারে অভিজ্ঞদের সহায়তায়।

একটু চিন্তা করি তো, বছরের প্রথম সূর্যোদয়টা যদি নিকষ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর পাশে যদি পড়ে থাকতে দেখি শত শত মৃত পাখি এবং ক্ষুদ্রকায় জীব। তবে একটি সুন্দর পরিবেশ, দূষণমুক্ত বছর কীভাবে আশা করতে পারি আমরা?

এই শহরটাকে, পৃথিবীটাকে কীভাবে আরও একটু সুন্দর-সবুজ করা যেতে পারে সেটাই হতে পারে আমাদের নতুন বছরের অভিপ্রায়। এই পাখি, এই গাছ যার নিরবচ্ছিন্ন অংশ। থার্টি ফার্স্ট নাইটকে চোখ ধাঁধানো আলোয় উদযাপন করতে গিয়ে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্যটাকে ম্রিয়মাণ না করি আমরা।

ক্ষণিকের আলোয় আলোকিত না হয়ে সত্যিকারার্থেই পৃথিবীকে দীর্ঘসময়ের জন্য আলোকিত করতে চাইলে এতসব ক্ষতিকর দ্রব্যের ছোঁড়াছুড়ি না করে, একটা করে সবুজ গাছ লাগাতে পারি। কিছু পাখির বাসস্থান গড়তে পারি। স্মোগ না, বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগান দিতে পারি পৃথিবীবাসীকে।


ফারজানা আফরোজ

সহকারী অধ্যাপক, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links