• মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২০ রাত

তালিকা ছাড়াই মোবাইল জব্দ, প্রতিরোধে ভুল স্বীকার শুল্ক গোয়েন্দাদের

  • প্রকাশিত ০৩:১৭ বিকেল মে ২০, ২০১৮
তালিকা ছাড়াই মোবাইল জব্দ, প্রতিরোধে ভুল স্বীকার শুল্ক গোয়েন্দাদের
জব্দ তালিকা ছাড়াই মোবাইল ফোন সেট নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুল্ক কর্মকর্তাদের গাড়ি অবরোধ করে ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির মোবাইল ফোন বিক্রির দোকান অভিযান চালিয়ে কোনও তালিকা ছাড়াই মোবাইল ফোন সেট জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। তবে কোনও রকম জব্দ তালিকা ছাড়াই এসব ফোন নিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন অভিযান পরিচালনাকারীরা। পরবর্তী সময়ে তারা তালিকা তৈরি করে কাগজ দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বসুন্ধরা সিটির ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এরআগেও তিনবার শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এভাবে মোবাইল নিয়ে গেছেন। যা নিয়ে উচ্চআদালতে মামলা চলছে।  

শনিবার (১৭ মে) সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের মোবাইল বিক্রির দোকানে হঠাৎ অভিযানে আসে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি দল। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে আনা মোবাইল বিক্রির গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালিত হয় বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী মো. জিয়া উদ্দিন অভিযানের নেতৃত্ব দেন। এ সময় র‌্যাব-৩-এর একটি দলও তাদের সঙ্গে ছিল।

শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা প্রথমে বসুন্ধরার নিচ তলার বি-ব্লকের বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালান। এরপর পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার কয়েকটি দোকানে অভিযান চালিয়ে স্যামসাং ও আইফোন মোবাইল ফোন সেট জব্দ করেন।

শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা মোবাইল ফোন সেট বিক্রির অভিযোগে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এসব মোবাইল সেট কেনার কোনও বৈধ কাগজ দেখাতে পারেননি।

শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যখন মোবাইল জব্দ করে বেলা ১ টার দিকে বসুন্ধরা সিটি থেকে বের হন, তখন ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা তাদের গাড়ি প্রতিরোধ করেন। মোবাইল ফোন সেট ফেরত চেয়ে তারা স্লোগান দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেন। এ ঘটনায় পান্থপথে সোয়া দুইঘণ্টা গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। ব্যবসায়ীরা মোবাইল ফোন সেট ফেরতের দাবিতে অনড় থাকেন। র‌্যাব-৩-এর কর্মকর্তারা দুই দফায় রাস্তার অবরোধ সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ সময়  শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী মো. জিয়া উদ্দিনসহ দুই কর্মকর্তা গাড়িতেই বসেছিলেন।

বিকাল ৩ টা ২৪ মিনিটে শুল্ক দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গাড়ি থেকে নেমে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের বেজমেন্টে থাকা মার্কেটের অফিস কক্ষে মোবাইল দোকান মালিক সমিতির নেতা ও মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

এরপর বিকাল সোয়া ৫ টার দিকে জব্দ মোবাইলের তালিকা করেন সেখানে বসে। এরপর ওই তালিকা মালিকদের বুঝিয়ে দিয়ে বের হন শুল্ক কর্মকর্তারা।

এরপর ব্যবসায়ীদের নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতের কাকরাইলস্থ সদর দফতরে চলে যান। এ সময় র‌্যাব ১ ও ৩-এর সাতটি পিকআপ বসুন্ধরার সামনে দেখা যায়।

বসুন্ধরা সিটির মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধের মুখে শুল্ক গোয়েন্দাদের গাড়ি

এর আগে বসুন্ধরা সিটির নিচতলার ‘অ্যাপল জোন’ নামের একটি মোবাইলের দোকানের কর্মচারী ফাহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবার কোনও কথাবার্তা ছাড়া আমাদের দোকান থেকে এসে তারা মোবাইল নিয়ে যান। এর আগেও এরকম মোবাইল নিয়ে গেছেন তারা। আমরা কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার পরেও ফেরত দেন না। তারা নিজেরাই মোবাইল ব্যবহার করে বা বিক্রি করেন।’ তিনি বলেন, ‘দোকানে ঢুকেই শাটার বন্ধ করে মোবাইল নিয়ে চলে যায়। কোন কাগজপত্র তারা দেখতে চায় না।’

জব্দ করা মোবাইল ফোন সেটের ব্যাপারে এই কর্মচারী আরও বলেন, ‘আমরা বিদেশফেরত বিভিন্ন যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন সেট কিনে এখানে বিক্রি করি। বিমানবন্দর  থেকে যখন এসব মোবাইল লাগেজে করে নিয়ে আসেন তারা, তখন শুল্ক গোয়েন্দারা কী করেন?’

ষষ্ঠ তলার মোবাইল ওয়ার্ল্ড নামের একটি দোকানের মালিক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘দোকানে ঢুকেই কাগজ দেখানোর কোনও সুযোগ না দিয়ে মোবাইল নিয়ে যান তারা। পরে আর ফেরত দেন না।’

‘ফোন এক্সচেঞ্জ’ দোকানের মো. মামুন জানান, সাড়ে ১২ টায় তাদের দোকান থেকে আইফোন ও স্যামসাং মোবাইল ফোন সেট নিয়ে যান গোয়েন্দারা।

মোবাইল ওয়ার্ল্ডের বিক্রয় প্রতিনিধি কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দোকানটি ষষ্ঠ তলার বি-ব্লকের ১০ নম্বর দোকান। আমাদের তাক থেকে শুল্ক গোয়েন্দারা মোবাইল নিয়ে গেছেন। তারা কোনও কথা বলারই সুযোগ দেননি।’

জব্দ করা মোবাইল ফোনের ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী মো. জিয়া উদ্দিন বলেছেন, ‘এগুলোর বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কাগজপত্র দেখাতে পারলে মোবাইল ফোন সেট ফেরত দেওয়া হবে।’

আল ইসলাম টেলিকমের আব্দুল ওয়াজেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদের আগে এভাবে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দেয় তারা।’ তিনি বলেন, ‘এর আগেও তিনবার শুল্ক গোয়েন্দা মোবাইল নিয়ে গেছে। সেগুলো তারা আর ফিরিয়ে দেয়নি।’

বসুন্ধরা সিটি থেকে তালিকা ছাড়াই মোবাইল ফোন সেট জব্দের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ ব্যবসায়ীদের

প্রসঙ্গত, ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে আনা মোবাইল ফোন সেট ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দোকানে রাখা ও বিক্রি করার আইনগত বৈধতা না থকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘আমরা তো তাদের কাছ থেকে কিনে নেই। তারা কী ব্যবহারের কথা বলে আনেন, না ব্যবসায়ের কথা বলে আনেন, সেটা তারা বলতে পারবেন। কীভাবে আনেন, সেটা আমরা জানি না। আমরা তাদের কাছ থেকে কিনে নেই, সেই কাগজ আমাদের কাছে আছে। তাদের শুল্ক গোয়েন্দা ধরুক।’

বসুন্ধরা সিটির মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এসব মোবাইল পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনে আনি। এসব মোবাইলের কাস্টম বা ট্যাক্সের কাগজ কখনও কেউ দেখাতে পারবেন না। প্রতি ঈদের আগে এভাবে অভিযান চালানো হয়। এবারও দেশ শতাধিক আইফোন সেট জব্দ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, এসব জব্দ করা ফোন তারা নিজেরাই ব্যবহার করেন। কিছু কিছু বাইরে বিক্রি করে দেন। কখনোই সেগুলো নিলামে তোলা হয় না।’

তবে এই ব্যবসায়ীর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতেরর   অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী মো. জিয়া উদ্দিন।  তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনও রেষারেষি নেই। তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আমরা চারটি দোকান থেকে মোট ৬৪টি মোবাইল ফোন সেট জব্দ করেছি। এগুলোর বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারলে তারা আমাদের সদর দফতর থেকে সব নিয়ে আসতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা মহাপরিচালক ড. মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চোরাচালানের মাধ্যমে যারা মোবাইল ফোন নিয়ে আসছেন অথবা যারা নকল মোবাইল ফোন বাজারজাত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের আওতায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ চক্র যতই শক্তিশালী হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। নকল ও চোরাচালানের মাধ্যমে আনা মোবাইল ফোনের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই এখন থেকে নিয়মিত এ ধরনের অভিযান চলবে।’

উল্লেখ্য, শনিবারের এই অভিযানে বিভিন্ন দোকান/শোরুম থেকে ২৭৫টি ফোন জব্দ করেছে বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এরমধ্যে আই ফোন ১৩৩টি, এইচটিসি ব্র্যান্ডের মোবাইল ১২৫টি, এলজি মোবাইল ফোন ১৫টি, অ্যাপল ব্র্যান্ডের ঘড়ি ১টি  এবং  আইপ্যাড-১টি।   যার মূল্য  আনুমানিক দুই কোটি বিশ লাখ টাকা।  এই আইফোন ও অন্যফোনগুলো চোরাচালানের মাধ্যমে আমদানিকৃত। এসব ফোন জব্দের সময়ে আমদানি  সংক্রান্ত   দলিলাদি  দোকান/শোরুম  কর্তৃপক্ষ   দেখাতে  পারেননি।

এছাড়াও মহাখালীস্থ টিজে গ্রুপ এর শোরুম থেকে নকল আইফোন তৈরির কাজে জড়িতে থাকায় ০৭ জনকে এবং উত্তরা নর্থ টাওয়ারে অবস্থিত তালুকদার মোবাইল লিংক থেকে একই ঘটনায় আরও ২ জনকে আটক করা হয়েছে।

আরও যেসব দোকানে অভিযান চালানো হয়, সেগুলো হলো—গেজেট জোন বিডি, টেক অ্যান্ড টক। বসুন্ধরা সিটির ২৩০ টি মোবাইল ফোন সেট বিক্রির দোকান রয়েছে। বসুন্ধরা ছাড়াও সকালে একযোগে উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, গুলশান ও মহাখালী এলাকায় অভিযান পরচিালনা করা হয়।