• বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১০ বিকেল

লাঠিয়াল রুপন্তী’র গল্প

  • প্রকাশিত ০৪:০৯ বিকেল জুলাই ৪, ২০১৯
কুষ্টিয়া
প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে চলেছেন রুপন্তী। ছবি: ইউএনবি

সুন্দর মুখশ্রীর সাথে বড় লাল টিপ, খোলা চুল আর কালো পোশাকের সমাহার নিয়ে তিনি যেন নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে  আবির্ভূত হন। যখন তিনি লাঠি হাতে তীরের বেগে তেড়ে যান প্রতিপক্ষ লাঠিয়ালের দিকে তখন তার চোখে যেন আগুন ঝরে। তাকে ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে যান প্রতিপক্ষ।

খোলা কালো চুল,কালো পোশাক। এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে ঢাল। কখনো লাঠির বদলে তলোয়ার। ডাগর চোখে তেজি ভাব। ছুটে চলেছেন প্রতিপক্ষের দিকে। লড়াই করছেন। এই লড়াকু হলেন কুষ্টিয়ার মেয়ে মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী।

আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য লাঠিখেলাতেও পিছিয়ে নেই নারীরা। রুপন্তীর লাঠি খেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ২০১৬ সালে। ওই বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের লাঠিয়ালদের একমাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী’ দুইদিনের উৎসবের আয়োজন করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে।

কুষ্টিয়া ছাড়াও নড়াইল, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ২৫টি দলের প্রায় ৫০০ লাঠিয়াল অংশ নেন ওই উৎসবে। এসব দলে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও ছিলেন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের মাঠে লাঠিখেলায় অন্যদের মতো সারবীন রুপন্তীও লাঠি খেলা দেখান। সে সময় তার লাঠিখেলায় মুগ্ধ হন উপস্থিত সকলেই।

এ খেলায় সুন্দর মুখশ্রীর সাথে বড় লাল টিপ, খোলা চুল আর কালো পোশাকের সমাহার নিয়ে তিনি যেন নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে  আবির্ভূত হন। যখন তিনি লাঠি হাতে তীরের বেগে তেড়ে যান প্রতিপক্ষ লাঠিয়ালের দিকে তখন তার চোখে যেন আগুন ঝরে। তাকে ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে যান প্রতিপক্ষ।

বলা যায় লাঠিখেলা রুপন্তীর রক্তে মিশে আছে। কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন লাঠিখেলার সংগঠক ও এলাকার শ্রেষ্ঠ লাঠিয়াল। লাঠি খেলাকে বাঁচিয়ে রাখতে ও সারা দেশের লাঠিয়ালদের সংগঠিত করতে ১৯৩৩ সালে একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এ সংগঠনের নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পরিবার আজও লাঠিয়াল পরিবার হিসেবেই পরিচিত।

শহরের পূর্ব মজমপুরের যে রাস্তার সামনে এই লাঠিয়াল সংগঠকের বাড়ি। সেই সড়কের নাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হলেন মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রুপন্তীর দাদা। বাবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর সংগঠনের হাল ধরেন তার বাবা রতন চৌধুরী। লাঠিখেলা তাই রুপন্তীর পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বয়স যখন সাত বছর তখন বাবার খেলা দেখে হাতে তুলে নেন লাঠি। লাঠি ঘোরানো রপ্ত করতে থাকেন। শিখে নেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল।

রুপন্তীর ওস্তাদ ছিলেন ওসমান সরদার। রুপন্তী বলেন, “তার কাছে লাঠি খেলা শেখা বলা যায় যে দাদার কাছে শেখার মতোই। উনি আমার দাদার কাছে লাঠি খেলা শিখেছেন। যেহেতু দাদা বেঁচে ছিলেন না, আমার ওস্তাদ চেয়েছিলেন দাদার কাছ থেকে শেখা কৌশল যেন আমাকে কিছুটা হলেও উনি দিয়ে যেতে পারেন।”

লাঠি খেলার ঐতিহ্যকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে চান রুপন্তী। ছবি: ইউএনবি 

বর্তমানে রুপন্তীর পরিবারের সবাই লাঠিখেলার সঙ্গে যুক্ত আছেন। রুপন্তীর ফুফু হাসনা বানু দেশের প্রথম নারী লাঠিয়াল। ফুফাতো বোন শাহিনা সুলতানা ও শারমীন সুলতানাও লাঠিয়াল। তার সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া ছোট বোন মঞ্জুরীন আফরিনও লাঠির কসরত শিখছেন।

নারী হয়ে লাঠিখেলায় কেন জানতে চাইলে সরল সোজা জবাব, “বাবার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। বাবা চেয়েছিলেন তার মেয়েরাই ছেলেদের কাজ করবে। নিজেই নিজের আত্মরক্ষা করবে। তাই নিজেকে কখনোই অন্যের থেকে আলাদা ভাবেননি। সেই থেকে আর পিছু হটা হয়নি।” লাঠি, সড়কি, তলোয়ার ও রামদা চালাতে পারেন তিনি।

বাবার সঙ্গে নড়াইলের সুলতান মেলায় তিনবার লাঠিখেলায় অংশ নিয়েছিলেন রুপন্তী। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিতে পহেলা বৈশাখে লাঠিখেলা দেখিয়েছিলেন। রুপন্তীর মা অবশ্য লাঠিয়াল নন, তবে তিনি সবসময় মেয়েদের লাঠি খেলায় উৎসাহ দিতেন। ছোটবেলাতেই মেয়েকে তার বাবার সঙ্গে পাঠিয়ে দিতেন।

এসএসসি পরীক্ষার আগে রুপন্তীর বাবা রতন চৌধুরী মারা যান। এসএসসি পাশের পর চাচাতো ভাই সাব্বির হাসান চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয় রুপন্তীর। তবে পড়ালেখার পাশাপাশি এখনো লাঠিখেলা অব্যাহত রেখেছেন রুপন্তী। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায়ে প্রশাসন শাখার ছাত্রী। মিরপুরে স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকেন। তার স্বামী সাব্বির হাসান চৌধুরীও লাঠি খেলেন। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

লাঠি শুধু খেলায় না আত্মরক্ষাও বটে। কোন বিপদে হাতের কাছে একটা লাঠি জাতীয় কিছু থাকলে সেটা দিয়ে নারীরা নিজেদের রক্ষা অনায়াসে করতে পারেন। এটা শিখতে তেমন সময় বা টাকা খরচ লাগে না। এটা রপ্ত করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে এটা ছড়িয়ে দেওয়া খুবই প্রয়োজন মনে করেন রুপন্তী।

রুপন্তী বলেন, “দাদা লাঠি খেলা নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। তার জন্যই বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে উঠেছে। তিনি অনেক বইও লিখেছেন। চেষ্টা করেছেন মার্শাল আর্টের সাথে লাঠি খেলা কম্বাইন্ড করে যেটা তৈরি করা যায় সেটা আনতে। এরপরে লাঠি খেলাটা চলে আসছে তবে মার্শাল আর্ট কিছুটা বাদ পড়ে গেছে। আবার নতুন করে মার্শাল আর্ট আর লাঠিটা কম্বাইন্ড করার জন্য আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

তিনি বলেন, দাদার স্বপ্ন ছিল লাঠি খেলাটা একদিন বিশ্বে পরিচিতি অর্জন করবে দেশীয় ঐতিহ্য হিসেবে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করে যেতে চান রুপন্তী।

প্রথম নারী লাঠিয়াল হাসনা বানুর ছেলে ও বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন মনে করেন, আধুনিক খেলাধুলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলাকে বাঁচিয়ে রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রুপন্তীর মতো দেশের অন্য নারীদেরও আত্মরক্ষার্থে এই লাঠি খেলার প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার।