• শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৭ রাত

মাহজাবিন হক - একজন স্বপ্ন সারথি

  • প্রকাশিত ০৬:২৯ সন্ধ্যা সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯
মাহজাবিন হক
মাহজাবিন হক। ছবি : সৌজন্যে

ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমদকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নাসায় যোগ দিতে যাওয়া বাংলাদেশি তরুণী মাহজাবিন হক বলেন, 'আপনি পরিশ্রম করলে এবং নিজের প্রতি সৎ থাকলে স্বপ্ন সত্যি হবে'

ছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- নাসায় কাজ করার স্বপ্ন ছিল মাহজাবিন হকের। শৈশবে শুনেছিলেন নাসার মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১'র চন্দ্রাভিযানের গল্প। সেখান থেকেই নাসায় কাজ করার অনুপ্রেরণা পান তিনি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নাসায় দ্বিতীয় দফায় ইন্টার্নশিপ শেষ করেন বাংলাদেশের মাহজাবিন। এই সময়েই কাকতালীয়ভাবে অ্যাপোলো-১১'র চাঁদে অবতরণের ৫০ বছর পূর্তি হয়। 

মাহজাবিন স্নাতক সম্পন্ন করেন মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে। আসছে ৭ অক্টোবর তিনি স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেবেন টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে (জেএসসি)।

২০০৯ সালে  ডাইভার্সিটি ভিসায় (ডিভি) দুই সন্তানকে নিয়ে সিলেট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান মাহজাবিনের বাবা সৈয়দ এনামুল হক ও মা ফেরদৌসি চৌধুরী। মাহজাবিনের ছোটভাই সৈয়দ শিমুল হক বর্তমানে কাজ করছেন মার্কিন সেনাবাহিনীতে।

ছবি সৌজন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ছোটভাই ও মায়ের সঙ্গে বাস করেন মাহজাবিন। নাসায় যোগ দিতে ৫ অক্টোবর টেক্সাস যাচ্ছেন। তাই নিচ্ছেন শেষ সময়ের প্রস্তুতি। তবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও মাহজাবিন ইমেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ঢাকা ট্রিবিউনকে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি কবে নাসায় যোগ দিতে যাচ্ছেন? সেখানে আপনি কী ভূমিকা পালন করবেন? আর আমাদের এটাও সংক্ষেপে বলবেন নাসায় চাকরি পেতে কী করতে হয়?

মাহজাবিন: আগামী ৭ অক্টোবর নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে একজন স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেবো।

নাসায় কাজ করতে হলে আপনাকে সব্যসাচী হতে হবে। আপনার নেতৃত্ব দানের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং পাঠ্যক্রমের বাইরের বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হতে হবে। আমার ক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অনেক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) সভাপতি ছিলাম। বিএসএ'র বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচের কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটিং মেশিনারি'র নারী কাউন্সিলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলাম।

নাসা মানে শুধু নভোযাত্রীই না। আপাতদৃষ্টিতে যা অসম্ভব মনে হয় সব বাধা ভেঙে তা অর্জন করতে নাসায় বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ার, আইটি স্পেশালিস্ট, মানবসম্পদ স্পেশালিস্ট, হিসাবরক্ষক, লেখক এবং অনেক ধরনের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন।  

ঢাকা ট্রিবিউন: একজন ইন্টার্ন হিসেবে আপনি আগে নাসায় কাজ করেছেন। আপনি কীভাবে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেলেন এবং ইন্টার্নশিপ কতো মাসের জন্য ছিল? আর সেখানে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মাহজাবিন: আমি অনলাইনে নাসায় ইন্টার্নশিপের জন্য আবেদন করি এবং তার কিছুদিন পরই তাদের পক্ষ থেকে ফোনে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব ইন্টার্নদের মধ্যে আমি সেরা নির্বাচিত হই। আমি নাসায় দুইবার ইন্টার্নশিপ করেছি। 

ডাটা অ্যানালিস্ট হিসেবে প্রথম ইন্টার্নশিপ ছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত। সে সময় আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইরক্টরেটের আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ডাটা অ্যানালাইসিস করতাম। ওই চার মাসে আমি নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে "ইন্টার্ন অব দ্য উইক" নির্বাচিত হই। আমি ইন্টার্ন স্টুডেন্ট কাউন্সিলেও যোগ দেই এবং সেখানের ভিডিও কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। চেয়ারম্যান হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল নাসায় ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভিডিও নির্মাণ করা। এই প্রজেক্টে কাজ করে আমি নাসার পেছনে কাজ করা মানুষদের কাছ থেকে জানতে পারি। 

দ্বিতীয় ধাপে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত আমি নাসার মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে (এমসিসি) সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করি। সেখানে শুধু হাই প্রোফাইল কর্মীরাই কাজ করেন এবং তাদের কোনো সহযোগী থাকে না। আমি সরাসরি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের জন্য কাজ করতাম এবং আমার দায়িত্ব ছিল সফটওয়্যার ডিজাইন, সেগুলোর বাস্তবায়ন, টেস্টিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারকারীদের সহায়তা করা। 

এমসিসি নাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপত্তা পাওয়া ভবন। কারণ, সব রকেট উৎক্ষেপণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মিশন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কন্ট্রোল রুম সেখানে। দ্বিতীয় দফার ইন্টার্নশিপের সময়ও আমি "ইন্টার্ন অব দ্য উইক নির্বাচিত হই"।

নাসার অভিজ্ঞতা অবিশ্বাস্য রকমের অসাধারণ। বিশ্বের কিছু সেরা ধরনের প্রজেক্টে কাজ করছেন দেশের এমন বড় মাপের কিছু মানুষের মাঝে থেকে কাজ করেছি। আমি এমন কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি যাদের ব্যকগ্রাউন্ড ছিল অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থবিজ্ঞান থেকে যোগাযোগ পর্যন্ত। নাসায়, আপনি সবকিছুই পাবেন।    

ছবি সৌজন্যে ঢাকা ট্রিবিউন: নাসায় কাজ করা আর কোনো বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো বিজ্ঞানী/টেকনিশিয়ান/কর্মকর্তা আছেন? তাদের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা আছে? 

মাহজাবিন: আমি যখন ইন্টার্নশিপ করছিলাম তখন আমিই একমাত্র বাংলাদেশি ছিলাম। কিন্তু নাসায় পূর্ণ সময় কাজ করছেন এমন দুজন বাংলাদেশির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, তবে নাসার কিছু স্থানে আমি তাদের দেখেছি। জেএসসি একটি বিশাল জায়গা এবং এখানে অনেক ভবন আছে। সুতরাং, সেখানে কে কাজ করে তার সবার পক্ষে জানা বেশ শক্ত। 

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার শিক্ষাজীবন, ডিগ্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পর্কে আমাদের কিছু বলেন। 

মাহজাবিন: সম্প্রতি আমি ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক শেষ করেছি। আমি অনেক সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম এবং ফুল টাইম ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে পার্টটাইম কাজ করতাম। 

আমি আজ যে অবস্থানে এসেছি তার পেছনে আমার মায়ের অনেক বড় অবদান আছে। কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই আমার স্বপ্ন সত্যি করার পেছনে ছুটতে তিনি আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তার ভাষায়, "আমি চাই আমার মেয়ে আকাশ ছোঁবে, আমার মেয়ে কোনো ছেলের চেয়ে কম নয়।"  

ছবি সৌজন্যে ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি আপনার শৈশব কোথায় কাটিয়েছেন? কখন আপনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন? 

মাহজাবিন: আমি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করি এবং ২০০৯ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে আমেরিকায় আসি। আমি সিলেটের কাজীতুলায় বসবাস করতাম। আমার গ্রামের বাড়ি গোলাপগঞ্জের কদম রসুলে। যখন আমি সিলেটে ছিলাম, তখন সিলেট খাজাঞ্চীবাড়ি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করতাম।  

ঢাকা ট্রিবিউন: শিগগিরই বাংলাদেশ ভ্রমণের কোনো পরিকল্পনা আছে? 

মাহজাবিন: খুব তাড়াতাড়িই আমি বাংলাদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছি, ইনশা'আল্লাহ। 

ঢাকা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে আপনার লক্ষ্য কী? 

মাহজাবিন: শৈশব থেকেই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নাসায় কাজ করা এবং এখন আমি সেই লক্ষ্য অর্জন করেছি। আমার এখন স্বপ্ন, যা আমাকে সবচেয়ে সুখী রাখে তা করে যাওয়া।  

ঢাকা ট্রিবিউন: বাংলাদেশের মেয়েরা, যারা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মাহজাবিন: আমি তাদের বলবো, কোনো ভয় ছাড়াই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হবে। এখানে ব্যার্থ হওয়া স্বাভাবিক। আমিও অনেকবার ব্যার্থ হয়েছি, কিন্তু তা আমাকে স্বপ্নের পেছনে ছুটতে এবং আরও কঠোর পরিশ্রম করা থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপনি পরিশ্রম করলে এবং নিজের প্রতি সৎ থাকলে স্বপ্ন সত্যি হবে।