• রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৮ সকাল

চলে গেলেন মীনা কার্টুনের স্রষ্টা রাম মোহন

  • প্রকাশিত ১১:৩৬ সকাল অক্টোবর ১২, ২০১৯
মীনা
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্টুন মীনা। ছবি: সংগৃহীত

ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে অবস্থিত হান্না-বারবারা স্টুডিওতে মীনার প্রথম দিককার বেশ কিছু পর্ব নির্মিত হয়। পরে ভারতের রাম মোহন স্টুডিওতে মীনার বাকি পর্বগুলো নির্মাণ করা হয়। সিরিজগুলো পরিচালনা করেছিলেন রাম মোহন নিজেই

চলে গেলেন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র মীনার রূপদানকারী রাম মোহন। ভারতীয় অ্যানিমেশনের জনক বলে খ্যাত এ কার্টুনিস্ট ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

শুক্রবার (১১ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে ভারতের অ্যানিমেশন বিষয়ক ওয়েবসাইট অ্যানিমেশন এক্সপ্রেস।

জানা যায়, খ্যাতনামা এ কার্টুনিস্টের ভারতীয় চলচ্চিত্রের জগতে কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। ১৯৬৮ সালে তিনি চলচ্চিত্র বিভাগ থেকে সরে দাঁড়ান, কাজ শুরু করেন প্রসাদ প্রোডাকশনের অ্যানিমেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে। ১৯৭২ সালে নিজের প্রতিষ্ঠান রাম মোহন বায়োগ্রাফিক্স চালু করেন।

ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে অবস্থিত হান্না-বারবারা স্টুডিওতে মীনার প্রথম দিককার বেশ কিছু পর্ব নির্মিত হয়। পরে ভারতের রাম মোহন স্টুডিওতে মীনার বাকি পর্বগুলো নির্মাণ করা হয়। সিরিজগুলো পরিচালনা করেছিলেন রাম মোহন নিজেই।

মীনা কার্টুনের ইতিবৃত্ত

“আমি বাবা মায়ের শত আদরের মেয়ে, আমি বড় হই সকলের ভালোবাসা নিয়ে।

আমার দু’চোখে অনেক স্বপ্ন থাকে, আমি পড়ালেখা শিখতে চাই...।”  

বিংশ শতকের শেষ দশক কিংবা একবিংশ শতকের প্রথম দশকে জন্ম নেওয়া যেকোনো মানুষের হৃদয়ে এখনও গানটির অনুরণন রয়ে গেছে। গানটি মনে পড়লে ক্ষণিকের জন্য নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। বিনোদনের পাশাপাশি লাখো দর্শকের কাছে অতীব জনপ্রিয় এই মীনা কার্টুনটি সমাজ-সংস্কার ও জ্ঞানের আলোয় মানুষকে সচেতন করে তুলতে বিশেষ অবদান রেখেছে।

যেভাবে শুরু

নব্বইয়ের দশকের কথা। মেয়েদের অধিকার সুংসহত করার ব্রত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত তৎকালীন সাতটি দেশ (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপ) যৌথভাবে দশকটি ‘কন্যাশিশু দশক’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। 

১৯৯০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত ১০ বছর সময়ের মধ্যে সার্বিক সূচকে মেয়েদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য সার্কভুক্ত দেশগুলো দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করে। সেলক্ষ্যে যোগাযোগ করা হয় ‘ইউনিসেফ’ এর সাথে। আরো সঠিকভাবে বললে ‘ইউনিসেফ, বাংলাদেশ’ এর সাথে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কোনো এক বিখ্যাত চরিত্রের দ্বারস্থ হতে হবে, হতে পারে সেটা বাস্তবের কোনো কিংবদন্তী কিংবা কৃত্রিমভাবে সৃজিত কোনো চরিত্র, মানে কোনো এনিমেটেড কার্টুন বা কমিক্স চরিত্র।

বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার তখন বিটিভিতে ‘মনের কথা’ নামে একটি পাপেট শো করতেন (এখনও করেন)। সেখানে ‘পারুল’ নামে এক বিখ্যাত মেয়ে চরিত্র বাংলাদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এই পাপেট পারুলের থিম থেকেই একটি কাল্পনিক মেয়ে চরিত্র নির্মাণের কনসেপ্ট গ্রহণ করা হয়। একাজে বাংলাদেশ থেকে মুস্তাফা মনোয়ার যুক্ত ছিলেন।

যা-ই হোক, আট-নয় বছর বয়সী মেয়ের কনসেপ্ট মোটামুটি দাঁড়ালো। দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরার জন্য শহুরে নয়, গ্রামীণ আবহ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এর সাথে থাকবে মেয়েটির বাবা, মা, ছোট ভাই ও পোষা কোনো প্রাণী।

নাম ঠিক করা

যেহেতু নির্মিতব্য কার্টুনটি দক্ষিণ এশীয় সবগুলো দেশেই প্রচারিত হবে, তাই কেন্দ্রীয় চরিত্রটির এমন একটি জুতসই নাম হওয়া দরকার, যেন নাম শুনে প্রত্যেকটি দেশ মেয়েটিকে নিজেদেরই দেশের প্রতিনিধি বলেই মনে করতে পারে।

কিন্তু এমন নাম খুঁজে পাওয়া খুব সহজ ছিলো না। কারণ, সাত সাতটি দেশেই নামটির গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। অনেক ভেবে-চিন্তে অবশেষে মেয়েটির নাম রাখা হলো ‘মীনা’। কারণ, ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলংকায় এই ধরনের নাম (যেমন- মীনাক্ষী, মীনা কুমারি) খুব প্রচলিত। আবার, শোনা যায়, মীনা নামটির সাথে ‘আমিনা’ নামের কিছুটা সাযুজ্য থাকায় মুসলিম দেশগুলোও, বিশেষত পাকিস্তান, এই নামে আপত্তি করেনি। অবশেষে সব দেশের অনুমোদন সাপেক্ষে চূড়ান্ত হয় ‘মীনা’ নামটি। উল্লেখ্য, সিন্ধি ভাষায় 'মীনা' শব্দটির অর্থ 'আলো'।

১৯৯৮ সালে মীনা কার্টুন নিয়ে ভিয়েতনামে প্রচারণা শুরু হয়। ভিয়েতনামি মূল ভাষা ও আরো ৮টি স্থানীয় ভাষায় ভাষান্তর করা হয় মীনা কার্টুন। মজার কথা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু মীনার নাম বদলে রাখা হয় 'Mai', যাতে করে নামটা স্থানীয় প্রচলিত নামের মতোই শোনায়!

 ‘মীনা’ চরিত্রের সার্বজনীনতা

এক ‘মীনা’ যেহেতু পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করবে, তাই মীনার গড়ন ও বসন-ভূষণ এমন হতে হবে যেন প্রত্যেক দেশের সাথেই সেটা খাপ খেয়ে যায়। সেটা করা অতটা সোজা ছিলো না। এজন্য ‘মীনা ইনিশিয়েটিভ’ এর তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক র‌্যাচেল কার্নেগি উপমহাদেশের কোনো চিত্রশিল্পীকে খুঁজছিলেন, যিনি নিজ অঞ্চলের মানুষদের জীবনাচরণের ভিন্নতাকে মাথায় রেখে একটি সর্বজনগ্রাহ্য মীনার চরিত্র সৃষ্টি করবেন।

এলক্ষ্যেই ভারতের রাম মোহনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। মীনার গেট-আপে একটি গ্রহণযোগ্যতা আনার জন্য রাম মোহন মীনার হরেক রকম স্কেচ আঁকতে থাকেন। কোনোটাতে মীনাকে সালওয়ার কামিজ, কোনোটাতে লেহেংগার (স্কার্ট) সাথে ব্লাউজ, শার্ট কিংবা ওড়না ইত্যাদি ছবি এঁকে তিনি মানুষের কাছে যেতেন এবং তাদের মতামত নিতেন। অবশেষে, মীনার লং-স্কার্টের পোশাকটিই চূড়ান্ত করা হয়। এতে অবশ্য পাকিস্তানের স্থানীয় পোশাকের ছাপ স্পষ্ট, তবে এতে অন্যরা আপত্তি করেনি। এভাবেই অনেক ভেবে-চিন্তে মীনা কার্টুন চরিত্রটিকে গড়ে তোলেন রাম মোহন।

আর্থিক সহায়তা

মীনা কার্টুন নির্মাণে আর্থিক সহায়তা করে ডেনমার্ক। এখনকার পর্বগুলোতে জাপান, নরওয়ে, ব্রিটেন, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড প্রভৃতি দেশেরও সহযোগিতাও রয়েছে।

মীনা ও বাংলাদেশ

মীনা কার্টুন চরিত্রটি সৃজনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আছে। নিল ম্যাককি মূল ধারণাটি গড়ে তোলেন। আর বাংলাদেশ থেকে শিশির ভট্টাচার্য, রফিকুন নবী ও মুস্তাফা মনোয়ার পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন। শিশির ভট্টাচার্য ও মুস্তাফা মনোয়ার একাজে ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে অবস্থিত হান্না-বারবারা স্টুডিওতেও যান এবং মীনার স্বরূপ চিত্রায়নে কাজ করেন।

১৯৯২ সালে মীনার প্রথম পর্বটিও বাংলায় ভাষান্তর করে প্রথম বিটিভিতে প্রদর্শন করা হয়।