• রবিবার, মে ০৯, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪ সকাল

মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ০৫:৩০ সন্ধ্যা এপ্রিল ২৭, ২০২১
মানসিক স্বাস্থ্য
পিক্সাবে

ডা. রহমান বিষয়টিকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য কিছু লক্ষণের কথা বলেন, যা কারো মাঝে দেখা দিলে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন

আরিফ হোসেন (৪৩) কিছুদিন থেকে কারো সাথে কথা বলেন না। ঠিকভাবে গোসল করেন না এবং খাবারও খান না। বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকেন। কখনো নিজে নিজে কথা বলেন। মাঝে মধ্যে কারো দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তার এ পরিবর্তন দেখে তার স্ত্রী ভাবেন, কিছুদিন আগে তিনি তার ব্যবসায়িক অংশীদারের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন। এসব নিয়ে বেশি দুঃশ্চিন্তা করছেন বলে হয়তো তার মন খারাপ থাকছে। তাই তিনি তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ভাবেননি। ভেবেছেন, কিছুদিন পর সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। 

চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরণের লক্ষণ মোটেই ভালো নয়। কারো হঠাৎ বদলে যাওয়া বা যে কোনো ধরণের অস্বাভাবিক আচরণ ও চিন্তা-ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা” থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “প্রত্যেক ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। এই সংখ্যা ১৫-২৯ বছর বয়সী কিশোর-তরুণদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে দেখা যায়।” তারা বলছে, “এটা প্রতিরোধযোগ্য। আমরা ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং জাতীয়ভাবে এক জোট হয়ে এটা প্রতিরোধ করতে পারি।”

চিকিৎসকরা আরও বলছেন, বাংলাদেশে এ রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে কিশোর-তরুণদের সংখ্যা অনেক। আত্মহত্যার প্রবণতাও এখানে উদ্বেগজনক। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বেসরকারিভাবেও কাজ করছে অনেকে। “জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯”-এ দেখা যায় “দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে শতকরা ১৭ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব মানুষের শতকরা ৯২ ভাগ কোনো চিকিৎসা নেন না। ৭-১৭ বছর বয়সীদের শতকরা ১৪ ভাগ কিশোর-কিশোরির মানসিক সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ কিশোর-কিশোরি কোনো চিকিৎসা নেয় না।” জরিপে আরো বলা হয়, এর আগে ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের জরিপে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা অনেক কম ছিলো। 

এই জরিপ স্পষ্টই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভীষণ খারাপ বলে জানালেন- সাবেক আর্মড ফোর্সড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. সাজেদুর রহমান। মনোরোগ বা মানসিক সমস্যাগুলোর সাথে আমরা খুব বেশি পরিচিত নই বলে অনেকেই বুঝতে পারিনা কাছের লোকটি মানসিকভাবে অসুস্থ্য। সাধারণত কী ধরনের সমস্যা হলে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাবেন জানতে চাইলে ডা. রহমান বলেন, “আমাদের দেশের মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে এখনও গুরুত্ব দিচ্ছে না। লোকে এটাকে লুকিয়ে রাখতে চায়। ছোটখাট মানসিক সমস্যা বা ভারসাম্যহীনতা মানে উন্মাদ বা পাগল নয়। আমাদের সমাজে এমন অনেক উচ্চ শিক্ষিত, কর্মক্ষম এবং প্রতিষ্ঠিত মানুষ আছেন, যারা তাদের ছোটখাট মানসিক সমস্যায় কাউন্সিলিং করে বা সামান্য ওষুধ খেয়ে দিব্যি কাজকর্ম করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণভাবে একজন মানুষ যখন তার স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেন, আশেপাশের মানুষ যদি তার মাঝে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখেন তাহলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।” 

ডা. রহমান বিষয়টিকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য কিছু লক্ষণের কথা বলেন, যা কারো মাঝে দেখা দিলে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

লক্ষণগুলো হলো-

১. হঠাৎ কেউ যদি নিজেকে গুটিয়ে নেয়, সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, নিজের স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। 

২. কেউ যদি অস্বাভাবিক আচরণ করে, মন খারাপ করে থাকে, কান্নাকাটি করে, যাকে সান্তনা দিয়েও কোনো কাজ হয় না। 

৩. কেউ একা একা কথা বলে, অন্য কারো সাথে কথা বলে না, মনে করে তাকে কেউ অনুসরণ করছে, তার খাবারে কেউ কিছু মিশিয়ে দিচ্ছে, তাকে র‌্যাব, পুলিশ বা অন্য কেউ খুঁজছে, অন্যরা তাকে নিয়ে কথা বলছে, তার মন খারাপ থাকছে, সে আত্মহত্যা করতে চাইছে ইত্যাদি। 

৪. কেউ যদি মনে করে তার পাশ দিয়ে কিছু চলে গেলো, সে তার চামড়ার নিচে কিছু দেখতে পাচ্ছে ইত্যাদি। 

৫. অনেক সময় সন্তান হওয়ার দুই এক মাসের মধ্যে কোনো কোনো মায়ের মাঝে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেয়া দেয়। যেমন- সে তার সন্তান থেকে দূরে থাকে, সন্তানকে আদর করতে চায় না, কিংবা সন্তানকে মেরে ফেলতে চায় এবং মনে করে সে না থাকলে তার সন্তানের ক্ষতি হবে বলে সে তার সন্তানকে মেরে ফেলতে চায়। অল্প সময়ের মধ্যে এটা খারাপ অবস্থার দিকে যেতে পারে। এজন্য খুব দ্রুত এ রকম মাকে মনোরোগবিদের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

৬. অনেক সময় দেখা যায়, কেউ রাতে দুই তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে ভালো থাকেন এবং নিজেকে যথেষ্ট কর্মক্ষম মনে করেন, নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেন, ভাব দেখান বিরাট কিছু করে ফেলবেন, হঠাৎ চঞ্চল হয়ে ওঠেন, বেশি খরচ করেন, বেশি ঘোরাঘুরি পছন্দ করেন ইত্যাদি হলে। 

৭. পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের পর অনেকের মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যা মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো মনে হয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তার অন্য কোনো রোগ হয়েছে কিনা সেটা দেখেন। যেমন- ব্রেন টিউমার, কিডনি, লিভার এসবের কোনো সমস্যা হলে লক্ষণগুলো মানসিক সমস্যার মতো হতে পারে। সেটা চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন। 

৮. হঠাৎ কারো যদি মনে হয় তার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না, কিংবা বলেন বেঁচে থেকে কী হবে ইত্যাদি। 

৯ অনেক সময় ছোট বাচ্চারা কিছুদিন কথা বলার পর কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কারো সাথে যোগাযোগ করতে চায় না, কারো আদর নিতে চায় না। একা একা খেলে কারো সাথে মিশতে চায় না ইত্যাদি। 

১০. অনেক টিনএজ ছেলেমেয়ে হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়, কারো সাথে মেশে না। সারাক্ষণ হয়তো বই নিয়ে থাকে কিন্তু পরীক্ষার ফলাফলও ভালো হয় না, ওই বয়সে তার যা যা করার কথা তা করে না এসব ক্ষেত্রে দ্রুত মনোরোগবিদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। 

১১. অনেকে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। তবে এক্ষেত্রে দেখতে হবে রাগের বশে সে সেটা করার চেষ্টা করছে কিনা। অনেকে সত্যি সত্যি এ রকম করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিকভাবে মনোরোগবিদের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। 

ঢাকা বা জেলা শহরগুলোর বাইরে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানুষ কী করবে বা কোথায় যাবে কিংবা এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে ডা. রহমান বলেন, “সরকার সকল পর্যায়ে এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কাছেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আছে সেখানে গেলেও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদেরকে কোথায় যেতে হবে তা বলে দেবেন কিংবা তারা একটা পথ দেখিয়ে দেবেন। এ ধরণের যে কোনো সমস্যায় কেউ যদি কোনো চিকিৎসকের সাথে কথা বলেন তাহলেও ঐ চিকিৎসক তাকে মনোরোগবিদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন।” 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র ঢাকা অফিসের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ মূহুর্তে সরকারকে আমরা এ বিষয়ে ন্যাশনাল পলিসি এবং অ্যাকশন প্লানের কাজে টেকনিক্যাল সহায়তা দিচ্ছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্চার কাজ যারা করেন তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমরা তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিচ্ছি।”

মানসিক রোগ অন্যান্য শারিরীক রোগের মতো একটি রোগ। এটাকে অবহেলা বা লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসা করা উচিত। এ এমন রোগ যা চিকিৎসা না করালে এর প্রভাব পুরো পরিবার ভোগ করে এবং আশেপাশের মানুষের মাঝে একটা ভীতি কাজ করে। তাই বিষয়টিকে জটিল বা খারাপ কিছু না ভেবে সহজভাবে এর চিকিৎসা করে ভালো থাকা যায়। এ বিষয়গুলো মানুষকে জানাতে হবে। তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মত প্রকাশ করেন।   

 

53
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail