Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশ কি সাগরের পানিতে ডুবে যাবে?

বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, হুমকির মুখে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২২, ১০:৫৩ এএম

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে মানুষের জীবিকা এবং অবকাঠামো। যার ফলে অসহায় মানুষ বাধ্য হচ্ছে তাদের ঘর-বাড়ি, শহর এমনকি দেশ ছাড়তে। আবহাওয়ার চরম বিপর্যয়ে শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই প্রায় ২৩৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব ভয়াবহ সংকটের শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বন্যার্ত মানুষের ক্রমবর্ধমান সংকটের কারণে বাংলাদেশ এখন “জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গ্রাউন্ড জিরো” হিসেবে পরিচিত। এবার এর মূল কারণের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় জেনে নেওয়া যাক।

সাম্প্রতিক সময়ে  সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

বিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় বৃদ্ধি ছিল প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। ১৯৯৩ সাল প্রতিবছর থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩ মিলিমিটার হারে বেড়েছে। গত এক দশক ধরে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও পূর্ব ভারত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি।

ঢাকার সার্ক আবহাওয়া কেন্দ্রের রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের উপকূলের মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক মাত্রার মধ্যে অবস্থান করছে- সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট (প্রতি বছর ৪ মিলিমিটার), হাতিয়ার চর চাঙ্গা (প্রতি বছর ৬ মিলিমিটার) ও কক্সবাজার (প্রতি বছর ৭.৮ মিলিমিটার)।

এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে বসবাসরত এবং বার্ষিক বন্যার সম্মুখীন হওয়া মানুষের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ।

বাংলাদেশ নিয়ে শঙ্কা

২০২১ সালের শেষের দিকে মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪৮তম অধিবেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ১৭ ভাগ প্লাবিত হয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুহারা হবে।

ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের রিপোর্ট মতে, ২০১৯ সালে চীন, বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনের দুর্যোগের ফলে বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ গোটা বিশ্বের ৭০%।

২০২১ সালে গ্লাসগোর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সেন্টার ফর ইনভার্নমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) তথ্যানুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ৯০ সেন্টিমিটারে পৌঁছবে।

 সমুদ্রের পানি কেন বাড়ছে

ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) রিপোর্ট অনুসারে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উল্লম্ব থেকে আনুভূমিক দিকে পরিবর্তিত হয়। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উল্লম্ব আন্দোলন থেকে এই আনুভূমিক ব্যাপ্তিতে রূপ নেয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এই উল্লম্ব আন্দোলনের পেছনে বিভিন্ন টেকটোনিক ক্রিয়াকলাপ এবং ভারী পলি জমে সৃষ্ট ব-দ্বীপের অবক্ষয় দায়ী। জলোচ্ছ্বাস ও আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনার কারণে সমুদ্র পৃষ্ঠের ভূসংস্থানের পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে কম সময়ের পরিসরে ঘটতে পারে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন সমুদ্রের আয়তনের পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে। এই আয়তন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে বরফ গলে যাওয়া, মহাসাগরের উষ্ণায়ন ও এর তাপীয় সম্প্রসারণ। সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং আয়তন বৃদ্ধি পায়। একে বলা হয় সামুদ্রিক তাপীয় সম্প্রসারণ। তাপ সম্প্রসারণের হার নির্ধারণ করে জলবায়ুতে উত্তাপের পরিবর্তন, জলবায়ুর সংবেদনশীলতা এবং সমুদ্রের তাপ গ্রহণের হার।

সমুদ্র উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রধান কারণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস হল বিদ্যুৎ, তাপ ও পরিবহনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো।

মানবিক সংকট থেকে উত্তরণের উপায়

দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের কৌশল ও মাটির নিচে ঘর তোলা। ভাসমান সবজি বাগানের মতো উদ্ভাবনী আদিবাসী চাষাবাদও বিভিন্ন এলাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

পুরো উপকূল জুড়ে শক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ একটি মোক্ষম উপায়। তবে এ খাতে আরও বেশি তহবিল দরকার। সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে শ্বাসমূলীয় বাদাবন সৃষ্টি করতে হবে। এই বন সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও সমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবিলায় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

এছাড়াও আরও বেশি প্রয়োজন বৃষ্টির পানি সঞ্চয়ের বড় বড় জলাধার।

বেড়িবাধে ঝিনুক-ঘেরা প্রাচীরগুলো সমুদ্রের বড় ঢেউ থেকে উপকূলবর্তী আবাসস্থলগুলো বাঁচানোর একটি দারুণ উপায়। কুতুবদিয়া দ্বীপে ইতোমধ্যে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ঝিনুকের প্রাচীর উপকূলীয় ক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে এবং তীরের দিকে ধেয়ে আসা ঢেউগুলোকে শান্ত করে দেয়।

অতএব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে বাতাসে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসাধারণের পক্ষ থেকেও জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তি খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

About

Popular Links