Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিল্পের ভূমিকা হচ্ছে পাঠকের হৃদয়ে একটি ঝলমলে পাতা এঁকে দেওয়া। যাতে সে জীবনের উষর মরুভূমিতেও মরুদ্যান পেয়ে তৃপ্ত হয়

মূলত ব্যাপক ‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’

‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’ বইয়ের লেখিকা মনে করেন, শিল্পের ভূমিকা হচ্ছে তেমনিভাবে পাঠকের হৃদয়ে একটি ঝলমলে পাতা এঁকে দেওয়া। যাতে সে জীবনের উষর মরুভূমিতেও মরুদ্যান পেয়ে তৃপ্ত হয়  

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ১১:১৪ পিএম

বই সারা বছরই বেরোচ্ছে। বইমেলায় প্রকাশের সংখ্যা সর্বোচ্চ। কিন্তু এর মধ্যে সত্যিকার সৃষ্টিশীল শিল্পীত হচ্ছে কয়টি বই? -   এ প্রশ্ন তোলাই  যায়। বিশেষত নন-ফিকশন বই যেন ঘুরছে ছক কাটা বৃত্তে। প্রকাশ হচ্ছে প্রচুর মোটিভেশনাল, শিক্ষামূলকের নামে বহু, প্রবন্ধ-নিবন্ধ গড়পরতা আর হেভিওয়েট বিখ্যাতদের আত্মজীবনী ঢাকঢোল পিটিয়ে। 

সমসময়ের বাংলা ভাষায় নন-ফিকশন বইয়ের দশা এর ভিন্ন কিছু নয়। এই এত কিছুর ভিড়ে তাহলে সাধারণের জীবন কোথায় মিলবে? অপ্রকাশ্য বোবা অন্ধ হয়ে থাকবে নিত্য দিনের বোধবুদ্ধি যাচাইয়ের দিনলিপি?  

এমন প্রশ্নে ঘুরপাক খাওয়া পাঠকের জন্য অনবদ্য এক বই ‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’। এর লেখিকা নাহিদ আহসান। তিনি জনপ্রিয় বলতে যা বাজারে চলে তেমন নন। আবার লেখনীতে নবীশও তাকে বলা চলে না। এর আগে তার ৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে। 

বইয়ের ফ্ল্যাপে জানতে পারি লেখিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক। ১৪৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ে তিনি দিন, তারিখ, বছর সর্বস্ব আত্মজীবনী না লিখে এক তুমুল তুখোড়তায় নিজের গল্প বলে গেছেন। যার পাতায় পাতায় যাপিত জীবন, কৌতূহল, রম্য, ন্যায্যতার দাবী, প্রশ্ন আর স্রেফ সহজ কথায় জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। নন-ফিকশন বইয়ের বন্ধ্যা সদৃশ্য বিরাজমানতায় এ যেন এক খরস্রোতা উর্বর পলিবাহী সৃষ্টি।

নাহিদ আহসান বিশ্বাসী শিল্পের অকল্পনীয় শক্তিতে। ও হেনরি’র গল্প উল্লেখ করেছেন তিনি। যেখানে একজন অসুস্থ মানুষ বিশ্বাস করতেন যে, বাগানের একটি নির্দিষ্ট গাছে যদি পাতা জন্মায় তবে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাকে প্রেরণা দিতে তখন এক শিল্পী সেই গাছে একটি পাতা এঁকে দেয়। অসুস্থ মানুষটি তাকেই সত্য ভেবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’ বইয়ের লেখিকা মনে করেন, শিল্পের ভূমিকা হচ্ছে তেমনিভাবে পাঠকের হৃদয়ে একটি ঝলমলে পাতা এঁকে দেওয়া। যাতে সে জীবনের উষর মরুভূমিতেও মরুদ্যান পেয়ে তৃপ্ত হয়। তবে পাঠক তৃপ্ত হলেও প্রকৃত সৃষ্টিমানরা কখনও তৃপ্ত নন। কোনো আত্মতুষ্টি থাকেনা তাদের। 

এ বই স্রষ্টার নিজের জীবনের গল্প বলতে বলতে মনে হয়েছে “বেরিয়েছিলাম হাজার বাগান দেখার বাসনা নিয়ে কিন্তু একটি গোলাপের দিকে তাকিয়েই জীবন ফুরিয়ে গেল।”

লেখিকা ছাত্র জীবন থেকে দেশের বইকেন্দ্রিক মহোত্তম প্রতিষ্ঠান বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। এতে তার পাঠ ভুবন হয়েছে বিস্তৃত আর সংগঠক হিসেবে দীক্ষা পেয়েছেন সমকালের মায়েস্ত্রো কবি, শিল্পী, কথা সাহিত্যিকদের কাছ থেকে। এমন টুকরো টুকরো জীবনের বাঁকের গল্পের ছোট ছোট অধ্যায়ের সমাহারে বিন্যস্ত আলোচ্য বই ‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’।

এ বইয়ে উল্লেখ আছে বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান মানুষের প্রতিলিপিকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে তার স্মৃতি। ‘‘হাড্ডি খিজির’’ স্রষ্টাকে তার দেখা নিখুঁত হয়েছে বর্ণনায়। অবধারিতভাবেই বার বার এসেছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথা। যে মানুষের প্রজ্ঞায় এখনও বাঙালি বই বিযুক্ত হয়নি। কবি শামসুর রাহমানকে দেখার স্মৃতি আছে বইয়ে। কবি আল মাহমুদ বাদ পড়েননি লেখিকার স্মৃতি থেকে। আছে কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে মজার কথা। বইয়ে আছে কবি রফিক আজাদ ও কবি দিলারা হাফিজ দম্পতিকে নিয়ে মিষ্টি স্মৃতির স্বাদু বয়ান।

‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’ বইয়ে নাহিদ আহসান তার ছোটবেলায় দেখা ঢাকার অনেক অংশ চিত্রিত করেছেন। আছে বিশ্বকাপের সময় বাঙালির আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে বিভাগ হওয়ার চিরায়ত বিষয়। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ আছে অনেক কীর্তিমানের সাথে। তার শিক্ষিকা শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীকে নিয়ে একটি অধ্যায় আছে বইয়ে। সিনেপাড়ায় আলোড়ন তোলা শক্তিমান অভিনেতা ও খলনায়ক এটিএম শামসুজ্জামানকে পর্দা থেকে বাস্তব জীবনে দেখার অভিজ্ঞতাও বাদ যায়নি। শহরের ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের যথার্থতার কথা স্মৃতি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন। এ বইয়ের অনেক বড় একটি অংশ লেখিকার প্রবাস দেখার চোখে ঋদ্ধ। সেসব অংশে ভিনদেশী বৈচিত্র্যময় জাতিস্বত্ত্বার মানুষের কার্যকলাপ কৌতূহলী পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। আবার লেখিকার ব্যক্তিজীবনও অনেক খোলামেলা তার লেখনীতে। তার পছন্দের খাবার তালিকা থেকে বাংলাদেশের মাছ প্রীতি উঠে এসেছে। লেখিকা নাহিদ আহসান একজন মা। ভিনদেশে সন্তানদের বড় করার অভিজ্ঞতার এক প্যারেন্টিং গাইড বলা চলে ‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’ বইকে।

বড় শিল্পীরা বলে থাকেন আঁকার দাগ বোঝা যায় না তেমন ড্রয়িংই শ্রেষ্ঠ ড্রয়িং। লেখিকা নাহিদ আহসান তার এই বইয়ে রাজনৈতিক ভাবনাও সেভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘‘একবার হলো কী, সুন্দরবন গিয়ে . . .’’ অধ্যায়ের শেষে তিনি লিখেছেন,  

. . .“ সুন্দরবন ভ্রমণের একটাই খারাপ দিক। বনটাকে নিজের মনে হবে। পশুর নদীতে ট্রলারডুবি হলে মনে হবে আর জায়গা পায় না -   এখানেই সব তেল-কয়লা ফেলতে হবে। বন যখন থাকবে না -  মাঝরাতে দু:স্বপ্ন দেখে জেগে উঠবেন  -  আহারে বনটাকেও ওরা মেরে ফেলল। কত টাকা দরকার ওদের? ” . . .                   

আবার জনস্বার্থের প্রতিনিধিহীনতা বা প্রতিরোধের ক্ষীণ শক্তি দেখেই হয়তো  ‘‘গদি ছাড়ার দিনগুলো’’ অধ্যায়ের শেষে তিনি লিখেছেন,

.  .  . “ এরশাদ পতনের দিনে মনে হলো, ‘আজ ঈদ, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আনন্দ।’ এখন মনে হয় আমাদের জীবন যাবে ঈদের খোঁজে।”

চমৎকার এমন একটি বই প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ পাবে রুটস প্রকাশনা। এবছর অর্থ্যাৎ ২০২২ এর এপ্রিলে বের হয়েছে ‘‘অল্পস্বল্প জীবনের গল্প’’ বইটি। তা পড়া শেষে মনে হবে দাম ৩০০ টাকা পাঠকের জলে যাবে না মরটেন ল্যাসকোজেন এর আঁকা প্রচ্ছদের বইটি কিনে। সবার জীবনেই গল্প আছে। এ বই পড়ে মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে তা কতটুকু মেলে লেখিকা নাহিদ আহসানের সাথে। আর আমরা তো জানি, জীবন জীবন মেলানো দায়নিষ্ঠ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।  


About

Popular Links