Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তালা-চাবি ও খুনের গল্প

রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরের ভেতরের ফ্লোর। মেয়েটা, পাশের ফ্লাটের লোক, কেয়ারটেকার ছুটে ভেতরে ঢোকে। কার রক্ত?

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০৭:১৫ পিএম

তালা-চাবি মিস্ত্রি আমি। মিরপুর ১ নম্বরের ফুটপাতে বসি। থাকি ৩ হাজার টাকা ভাড়ার পাইকপাড়ার টিনশেডে। বউ আছে। কন্যার বয়স ৩।

আমার ফোন নম্বর দেওয়া লিফলেট আছে অনেক জায়গায়। কল আসলে বাইরে গিয়েও কাজ করে আসি।

এই লিফলেটিং করে হয়েছে এক সমস্যা। নানা কিসিমের ফোন আসে। একজন সেদিন ফোন করে বলে, “ ভাই, আমার দোকানের শাটারে সমস্যা। শ্যাওড়াপাড়া। একটু আসতে পারবেন?” বিরক্ত লাগে। বলি, “ভাই, আমি শাটার মিস্ত্রি না। তালার কাম থাকলে কন।”

আবার সেদিন একজন ফোন করে বলল, বাথরুমের কলের সমস্যা। বলি, “ভাই, আমি পানির পাইপের কাজ জানি না।”

মানুষ এই ভুল কেন করে জানি না। ৮০০ টাকা খরচ করে ২ হাজার লিফলেট ছাপিয়েছি। সেখানে স্পষ্ট লেখা-“তালা মিস্ত্রি মোহাম্মদ সাদেক হোসেন।  ফোন : ০১০১০.... “

নিচে লেখা, “বাসায় গিয়ে তালা খোলা হয়।”

এরপরও মানুষ ভুল করে। মেজাজ কি এমনি খিঁচে?  

সেদিন একটা ফোন আসলো দুপুরে। একটা মেয়ের। খুব ব্যস্ত। পল্লবীর একটা ঠিকানা বলল। রওনা দিলাম। আবার মেয়েটার ফোন, “ভাই, একটু তাড়াতাড়ি আসেন।” সেখানে যাওয়া পর্যন্ত ৪ বার ফোন দিলো মেয়েটা। একটু পর পর, “ভাই কত দূরে?” বিরক্ত লাগে। বলি, “আসতেছি আপা . . . আসতেছি।” মনে মনে ভাবি, বাথরুমের লকই হবে। এখনের অ্যাপার্টমেন্টে বাথরুম লক হয় বেশি।

সেই বাড়িতে পৌঁছি। অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি। চারতলায় ফ্ল্যাট। মেয়ে সিড়িতে বসা। এক হাতে ফোন। আরেক হাত কপালে। টেনশনে আছে মনে হয়। অনেকভাবে গেটের লক ভাঙার চেষ্টা করেছেন অনেকে। অ্যাপার্টমেন্টের কোয়ারটেকার ড্রেস পরে আছে। পাশের ফ্ল্যাটের লোকও আছে মনে হলো। তারাও দাঁড়িয়ে। আমার লাগলো দশ মিনিট। খুলে দেখি, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরের ভেতরের ফ্লোর। মেয়েটা, পাশের ফ্লাটের লোক, কেয়ারটেকার ছুটে ভেতরে ঢোকে। কার রক্ত?  

রুমে রুমে যাই সবাই। বিছানা, ফার্নিচার সব ঠিকঠাক। ঘরে কেউ নেই।

মেয়েটা কেঁদে ওঠে। প্রতিবেশী একজন বলেন,

: আপা, ভাইয়ের ফোন কি এখনও বন্ধ?

: হ্যাঁ। সকালে বলল, অফিস যাচ্ছি। আমি তো দু’দিন মা’র বাসায়। অফিস থেকে এখন বলছে যায়নি আজ। খোদা কী হবে এখন?

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ে।

এমন ঘটনা জীবনে দেখি নাই আমি। এখন কী করব? টাকাও তো চাইতে পারিনা এই অবস্থায়। চলে যাব?

এর মধ্যে কেয়ারটেকার বলে,

: স্যাররে তো সকালে বাইর হইতে দেখছি। আপা, থানায় ফোন দিছি। ওনারা আসুক। চিন্তা কইরেন না। আল্লাহ ভরসা।  

আমাকে বলে,

: আপনেও যাইয়েন না। সবাই এইখানে থাকেন।

কীসের মধ্যে এসে পড়লাম! থানা পুলিশও আসছে। জেলের ভাত খাওয়া লাগে কি-না কে জানে? মনে হয় এক ঘণ্টা হবে। তখন পুলিশ আসলো। এর একটু পর টিভির লোকজন। ঘর ভরে গেল পুলিশ আর ক্যামেরাওয়ালা লোকে। এরা কি একসঙ্গেই চলে?

কেয়ারটেকার বসে ছিল আমাদের সঙ্গে। পুলিশ এসে তাকে আর মেয়েটাকে সরিয়ে নিল। লম্বা একজন ড্রেস ছাড়া লোক কথা বলছিল তাদের সাথে। শুধু শুনলাম, সিসি টিভি, ফোন এগুলো . . .।  তাদের কোথায় জানি নিয়ে যায়।

এর মধ্যে এক টিভির লোক চিল্লায়ে বলেন, সবাই চুপ। লাইভে যাচ্ছি।

 “চাঞ্চল্যকর খুন” বলে সে ঘরের রক্ত দেখাচ্ছে। আরও ক্যামেরাওয়ালা আসলো। একজনের পর একজন। এদের হাতের মাইকে একেক টিভির নাম। পুলিশের চেয়ে বেশি এরাই। সবাই সেই একই রক্ত দেখায় আর “রহস্যজনক খুন”, “চাঞ্চল্যকর খুন” বলে যায়।    

পুলিশের একজন আমার কাছে আসেন। নাম আর ফোন নম্বর লিখে নেয়। ভাবলাম আমার তো লিফলেট আছে। একটা লিফলেট দিয়ে দিই পুলিশকে। কিন্তু সাহসে কুলায় না।

মাগরিবের আজান পড়ে গেছে ততক্ষণে। একজন পুলিশ বলল,

: যান। আপনি চলে যান।

বাসে ফেরার পথে সেই আপার কথা মনেহয়। ঘরের রক্ত কি ওনার জামাইয়ের? কারা করল এই কাজ? মানুষটারে মনেহয় খুব যন্ত্রণা দিয়ে মারছে?

আজকে আর কোনো কাজ করব না। রোজগার ছাড়া কুফা দিন গেল। পাইকপাড়ায় বাস থেকে নেমে বাসার দিকে যাই।

ঘরের কাছে ফিরে দেখি আমার বাসায় ভিড়। সবাই টিভি দেখছে। আমাকে দেখে সবাই ঘিরে ধরল। বউ এলো দৌড়ে সামনে। বলে,

: তোমার ফোন কই? তোমারে সেই দুপুর থেকে টিভিতে দেখাইতেছে।

পকেটে হাত দিয়ে ফোন বের করে দেখি বন্ধ। পুরান ফোন আমার। মনেহয় চার্জ শেষ। পাশের ঘরের সবার এক কথা, তোমারে টিভিতে দেখাইতেছে। আসলেই দেখি টিভিতে আমি। ঐ পল্লবীর ফ্ল্যাটে।

আস্তে আস্তে মানুষ বের হয়ে যায় রুম থেকে। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। আমি শুয়ে পড়ি ওর পাশে। পাশের ঘরের রইছ রুমে ঢোকে। দাঁত বের করে বলে,

: সাদেক মিয়া, এতদিন শুধু তোমার লিফলেট আছিলো। এহন তোমারে টিভিতেও দেহ্যায়।

About

Popular Links