Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পৃথিবীর ওপর মানুষের সীমাহীন ও ক্রমবর্ধমান অত্যাচার

মানুষ গত ৭০ বছরে পৃথিবীর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে। তার আগের ১২,০০০ বছরের তুলনায় মানুষ এই সময়কালে দেড় গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করেছে

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৩৯ পিএম

মানুষের কাছে বাসযোগ্য গ্রহ এখন পর্যন্ত একটিই। তবুও আমরা নির্বিচারে নিজেদের গ্রহের মারাত্মক ক্ষতি করেই যাচ্ছি। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যের রাক্ষুসে চাহিদা ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

মহাবিশ্বে এখন পর্যন্ত একটি মাত্র গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে উন্নত জীবের বিকাশ ঘটেছে। সেই পৃথিবীর বুকে একটি প্রজাতি বাকিদের পেছনে ফেলে আরও অগ্রসর হয়েছে। তারা একাধিক জটিল সমাজে বসবাস করে এবং অসংখ্য যন্ত্রপাতি ও অনেক সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেসবের জন্য মানুষের বিশাল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন।

ভূতত্ত্ববিদ রাইনহল্ড লাইনফেল্ডারের মতে, “এক বড় আকারের গবেষণার আওতায় আমরা মানুষের এতকাল ব্যবহার করা জ্বালানির পরিমাণ মাপার চেষ্টা করেছিলাম। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মানুষ গত ৭০ বছরে পৃথিবীর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে। তার আগের ১২,০০০ বছরের তুলনায় মানুষ এই সময়কালে দেড় গুণ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করেছে। ফলে জ্বালানি ব্যবহারের গতিবৃদ্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।”

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে মানুষ পৃথিবীর ইকোসিস্টেম এতটাই বদলাচ্ছে যে, বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই সময়কালকে “অ্যান্থ্রোপোসিন” বা মানুষের যুগ বলা হচ্ছে।

বর্তমানে মানুষের বাৎসরিক জ্বালানির চাহিদা প্রায় ১৭০ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার! জনসংখ্যাও বেড়ে চলেছে। বর্তমানে ৮০০ কোটি হলেও ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১,০০০ কোটি হয়ে দাঁড়াবে।

জ্বালানির ক্ষুধা মেটাতে মানুষ গোটা গ্রহ শোষণ করে চলেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে জীবজগতের সব বাসভূমি ধ্বংস হবার উপক্রম দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে সাংঘাতিক বিষয় হলো, সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মানুষের খাদ্যের ক্ষেত্রে সেটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট।

ফ্রাংকফুর্টের সেনকেনব্যার্গ মিউজিয়ামের ফল্কার মোসব্রুগার বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন। 

তার মতে, “আমরা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতি বছর প্রকৃতি থেকে আমাদের চাহিদা নতুন করে প্রকৃতির পুনরুজ্জীবনের হারের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ আমাদের বেঁচে থাকার মূলধনই আমরা খেয়ে ফেলছি অথবা ব্যবহার করছি।”

বিষয়টি সত্যি অযৌক্তিক। আজকের মানুষের খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া বাস্তবে জ্বালানি ধ্বংসের সমান। খাদ্য উৎপাদনের সময় চূড়ান্ত খাদ্যপণ্যের তুলনায় অনেক বেশি ক্যালোরি ব্যবহার হয়। যেমন বড় আকারের মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেই ক্ষতির মাত্রা ৯০% পর্যন্ত হতে পারে।

পুরো পৃথিবীতে চাষের জমির প্রায় ৮০%-ই হয় চারণভূমি অথবা গবাদি পশুর খোরাক চাষের ক্ষেত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। 

এভাবে এক নাজুক প্রণালীর ওপর মারাত্মক হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সেনকেনব্যার্গ সোসাইটির ফল্কার মোসব্রুগার বিষয়টি সহজ করে বোঝাতে গিয়ে বলেন, ‘‘ধরুন আমাদের পৃথিবী একটি আপেল, যার ব্যাস ১২ থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার। হিসেব করে দেখলে বুঝবেন, সামান্য কয়েক ডেসিমিটার বা মিটার এই আপেলের চিকন খোসার মতো। সেই স্তর ব্যবহার করে আমরা ৮০০ কোটি মানুষের জন্য আজ শক্তি টেনে নিচ্ছি।”

মানুষের ক্ষুধা যেন আর মেটেই না। সস্তায় উৎপাদন, একই শস্যের চাষ, বিশাল আকারে ফলনই এই প্রবণতার চাবিকাঠি। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা আরো দ্রুত কমে চলেছে। গোটা বিশ্বজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার কমে চলেছে। যেমনটা স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলে ইউরোপের শাকসবজির অন্যতম প্রধান উৎসে দেখা যাচ্ছে। 

ভূতত্ত্ববিদ রাইনহল্ড লাইনফেল্ডার মনে করেন, ‘‘এক্ষেত্রে অবশ্যই বিশাল পরিমাণ পানির প্রয়োজন। সেইসঙ্গে চাই সার। দ্রুত গতি ও উচ্চ ফলনের স্বার্থে, অর্থাৎ সস্তায় উৎপাদের জন্য আমরা প্রচুর ফসফেট ও নাইট্রোজেন যোগ করি, তার অর্ধেকই পানিতে গিয়ে মেশে এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে চলে যায়।”

শুধু সেটাই নয়, আমরা যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করি এবং গোটা বিশ্বে পরিবহন করি, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই স্রেফ ফেলে দেওয়া হয়।

About

Popular Links