Tuesday, May 28, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাহমান ভাই, আজই আপনাকে প্রথম দেখছি...

সত্যভাষী না হলে কবি হওয়া যায় না। আপনার কাব্য আজও বন্দি বাংলার প্রামাণ্য

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৭ পিএম

আমাদের বড় বোন সুরাইয়া কচি আপার সাথে বিয়ে হলো শ্যামলীর আরিফ ভাইয়ের। আরিফ ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এরপর ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে তার দীর্ঘ পথচলা। তাদের পুরো পরিবার শ্যামলীর আদি বাসিন্দা। তো আমরা খুব খুশি। মিরপুরের কাছে বোন, দুলাভাই পাওয়া গেল।

 ল্যান্ডফোনের যুগ তখন। এক সন্ধ্যায় কচি আপা ফোন করলেন। ধরলাম আমি। বললেন, “খালাম্মী, খালুকে দে। আর শোন শাওনী, আমাদের রোডের শেষ বাড়িটায় না কবি শামসুর রাহমান থাকেন। আসিস। সবাই মিলে কবি দেখতে যাব। আর দাওয়াতে আসিস।”

শামসুর রাহমানকে চিনি তখন সিলেবাসে থাকা “স্বাধীনতা তুমি”র কারণে। এর শেষ লাইনে খুব নাড়া খাই।

“বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,

যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।”

সবাই তো তখন বলছে, যেমন ইচ্ছে চলা যাবে না। যেমন ইচ্ছে বলা যাবে না। যেমন ইচ্ছে লেখা যাবে না। এসব শুনতে শুনতেই তো বড় হয়েছি। তখন এই মানুষ বলছেন ভিন্ন কথা। আবার তা প্রকাশ করছেন। সিলেবাসে থাকায় পড়তে বাধ্য যেমন ইচ্ছে চলতে না পারার আক্ষেপে পোড়া কিশোরকূল! যাবোই দেখতে এই কবিকে। বোনের বাড়ির পাশে মিরপুর ঘেঁষা শ্যামলীতে যার বাস।

 হলুদ বেবিট্যাক্সিতে এক শুক্রবার শ্যামলীর মিরপুর রোড ধরে বামে মোড় নেই। একটা গলিতে পৌঁছাই। খুব নিরিবিলি। কবিদের থাকার গলি মনেহয় এমন নিরবই হয়- মন বলে এমন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া। সব ভাই বোনদের হাহা..হিহি। এর মধ্যে বেরিয়ে পড়ি একাই। রোডের শেষ বাড়িটায় বেশ ক'জন গার্ড দাঁড়ানো। এটি ছিল অপশক্তি দ্বারা কবির আক্রান্ত হওয়ার পরের দিকে সময়। দুপুর তখন। গার্ডরা প্রশ্ন করলেন। বললাম, আমি তমুক স্কুলের, অমুক ক্লাসের ছাত্র। কবির সঙ্গে দেখা করতে চাই। ভেতরে খবর গেল। একটু পর একজন বের হয়ে জানান, কবি ঘুমাচ্ছেন। আমার শামসুর রাহমান দেখা হয় না।    

সুযোগ আসে ২০০৬ সালে। সমকাল পত্রিকার ফিচার বিভাগের কন্ট্রিবিউটর তখন আমি। শহীদ ভাইয়ের টঙয়ে ফিচার এডিটর গোলাম ফারুক ভাই বসে থাকেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ক স্টেশন নয়, টঙ দোকানে বসেই পাতার আইডিয়া, নির্দিষ্ট কনটেন্ট, হেডিং, রুচিসম্মত ছবি এগুলো নিয়ে কথা বলতেন তিনি। আমরা তরুণ লেখিয়ে বাহিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম তা।

জানুয়ারির শেষ দিক তখন। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্রন্ট পেইজে বইমেলা নিয়ে একটি কনটেন্ট তৈরির কথা ভাবেন ফারুক ভাই। কালের খেয়া সম্পাদক শহিদুল ইসলাম রিপন ভাই আমাকে ডাকেন। বলেন, “এক্ষুণি শ্যামলী যাও। টিয়া ভাবির সঙ্গে কথা বলেছি। রাহমান ভাইয়ের লেখা দিয়ে ফেব্রুয়ারি শুরু করব। চিনো রাহমান ভাইয়ের বাসা? বললাম, জি ভাই।”

আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই রাহমান ভাইয়ের বাসায়। কবির পুত্রবধূ টিয়া রাহমান রিসিভ করলেন। নিয়ে গেলে কবির ঘরে। দরজা খুলে গেল। বাংলা কবিতার ৭৫ বছর বয়সী কিংবদন্তি পুরুষ শুয়ে। টিয়া ভাবি বললেন, “সমকাল থেকে এসেছেন উনি বাবা। কবি উঠলেন। বালিশের পাশ থেকে চশমা নিয়ে পড়লেন। আমাদের চোখাচোখি হলো। মনে হলো অন্য কোনো মুহূর্তে চলে গেছি আমি। শাদা চুল, ঘরে পরার শাদা গেঞ্জি আর শাদা পায়জামার শামসুর রাহমান ছিলেন নম্রতার প্রতিশব্দ। বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনার সাথে কি আমার আগে দেখা হয়েছে? একাধিকবার এই প্রশ্ন। আমি বারবারই বলে গেলাম, ‌‌‌‌না রাহমান ভাই। আজই আপনাকে প্রথম দেখছি। চেপে গেলাম কিশোরবেলার এক দুপুরের কষ্ট।”

আমার অনুলিখনে শামসুর রাহমানের লেখাটি দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হলো সমকালের। এরপর বেশি দিন ছিলেন না কবি। ১৭ অগাস্ট বিষণ্ণময় হয় বাংলাদেশ। অনন্তলোকে পাড়ি জমান রাহমান ভাই। পুরনো শহরের মাহুতটুলীতে জন্ম নেয়া “বাচ্চু” ডাকনামের ঢাকার নাভিমূল চেনা শামসুর রাহমান সমাহিত হন বনানীতে। মানুষজাতের প্রিয়তম স্থানেই। সমকাল শিরোনাম করেছিল “মায়ের কোলেই কবি”।  

একই পৃথিবীতে বেঁচে ছিলাম শামসুর রাহমানের সঙ্গে। তাকে “রাহমান ভাই” ডাকার সৌভাগ্য হয়েছে।

আজ তার জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, রাহমান ভাই! অপার শুভেচ্ছা!

সত্যভাষী না হলে কবি হওয়া যায় না। আপনার কাব্য আজও বন্দি বাংলার প্রামাণ্য। কথ্য ভাষায় আপনার দেশ এখন “মরার দেশ”। একই সঙ্গে তা জুলুমের বন্দি শিবিরও। “আমাদের মৃত্যু আসে” তাই পড়ে যাই এই অন্ধকার সেলে।  

“আমাদের মৃত্যু আসে ঝোপে ঝাড়ে নদী নালা খালে

আমাদের মৃত্যু আসে কন্দরে কন্দরে

আমাদের মৃত্যু আসে পাট ক্ষেতে আলে

গ্রামে গঞ্জে শহরের বন্দরে

আমাদের মৃত্যু আসে মাঠে

পথে ঘাটে ঘরে

আমাদের মৃত্যু আসে হাটে

সুডৌল ট্রাফিক আইল্যান্ডে ধু-ধু চরে

আমাদের মৃত্যু আসে কাদায় মাটিতে

আমাদের মৃত্যু আসে ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে

পরিখায় বিবরে ঘাঁটিতে

আমাদের মৃত্যু আসে বরিশাল, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, ঢাকায়

আমাদের মৃত্যু আসে কুমিল্লা, সিলেট, চাটগাঁয়

আমাদের মৃত্যু আসে প্লেনে চেপে, জাহাজ বোঝাই করে আসে

আমাদের মৃত্যু আসে সুপরিকল্পিত নকশারূপে

আমাদের মৃত্যু আসে ইসলামাবাদ থেকে

আমাদের মৃত্যু আসে কারবাইনে বারুদের স্তূপে

আমাদের মৃত্যু বিউগলে যায় ডেকে”

- শামসুর রাহমান, আমাদের মৃত্যু আসে, বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২)


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। পড়েছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা এন্ড টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ২০০৫ সাল থেকে। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই ‘‘হুমায়ূনকে নিয়ে’’ প্রকাশিত হয়।



About

Popular Links