Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পৌষের কুয়াশা ও এর চেয়ে গাঢ় চোখের অশ্রু

ঢাকা যেন এক মারাত্মক বিকিরণের জনপদ। এখানে কারও মন বসে না। সবার পণ তাই পালাতে হবে এখান থেকে

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:০০ পিএম

বাংলায় পৌষ চলছে এখন। শীত আঁচড় বসিয়েছে স্বভাব মতোই। কনক্রিট জঙ্গলের রাজধানী তা টের পেয়েছে দেরিতে। ঢাকার বাইরে হিমের প্রভাব বেশি। কুয়াশা গ্রামীণ বাংলার সকালকে আচ্ছন্ন করেছে আরও আগে। মাঝে বিজয় দিবসের ছুটিসহ তিন দিন ছুটিতে ছিল দেশ। মানুষ দলে দলে শহর ছেড়েছে। 

মৃত্যু কমলেও কোভিড মহামারি শেষ তা বলা যাবে না। বারবার সতর্কতা উচ্চারিত হচ্ছে ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে। তবু এবার পর্যটন স্পটগুলোতে বিপুল জনসমাগমের খবর সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি তাও দৃশ্যমান। আরও কত প্রাণনাশ করে ক্ষান্ত হবে মহামারি ভবিষ্যতে? - এ প্রশ্নের জবাব কারও কাছে নেই। কিন্তু রাজধানী থেকে বেরিয়ে পড়াদের দোষ দেই কী করে?

সুযোগ পেলেই ঢাকার মানুষ শহর ছাড়েন। ছাড়েন না বলে একে বলা যায় পালান। বলতে পারি, ভেগে যায় শহর থেকে। ঢাকাবাসী সারাক্ষণ খোঁজেন ছুটি।  ঈদ-পূজায় হন গ্রামমুখী। ডিসেম্বরে বাচ্চার পরীক্ষা শেষের দিন গোনে মা। পোশাক শ্রমিক অপেক্ষায় থাকেন শেষ ডেলিভারি ডেটের। বোনাস হোক আর না হোক উঠে বসেন শহর ছাড়ার যানে। যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ কি-না সে বিবেচনা তখন মাথায় থাকে না। ঢাকা যেন এক মারাত্মক বিকিরণের জনপদ। এখানে কারও মন বসে না। সবার পণ তাই পালাতে হবে এখান থেকে। বিকেন্দ্রিকরণের অভাব, দখল, দূষণ, জ্যাম আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফল ভোগ করে ৪০০ বছরেরও আগে রাজধানী হওয়া গৌরবের শহর। 

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি নেতিবাচক সূচকে প্রথম সারিতে থেকে গ্লানিময়তায় হয়তো নীরবে কাঁদে এ শহর। দুই উৎসবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থাকে বলতে গেলে কেবল ঈদ জামাত। মোড়ে মোড়ে কনসার্ট অন্য কোনো শিল্পচর্চা হয় না। মানুষে মানুষে প্রাণে প্রাণ মেলানো হয় না। 

সার্বজনীন এ কথা বারবার ঘোষিত হলেও ঈদ উৎসবের ঢাকা যেন একলা এতিমই থেকে যায়। ফাঁকা শহরের রাস্তায় দাপটে বেড়ায় গাড়ি আর বাইকওয়ালারা। উচ্চবিত্তরা বিদেশ অথবা শহরের বাইরের রিসোর্টে। বছরের পর বছর ‘‘ঢাকায় থাকি’’ যাপন এমনই।

বহু নাগরিক সুবিধাহীন অব্যবস্থাপনা আছে রাজধানীতে। এর মধ্যে মানুষ সবচেয়ে বেশি তিক্ত হন শহরের ট্রাফিক জ্যামে। ‘‘স্বপ্নের’’ মেট্রোরেল কবে চালু হবে তার দিন গুনছেন অনেকে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পকে ক্ষমতাসীনরা ‘‘উন্নয়নের মাইলফলক’’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। শহরের যাতায়াত ব্যবস্থার সংকট নিরসনে এ যেন এক সর্বরোগের টোটকা। এ প্রচার আর বাস্তবতার চিহ্ন বিপরীতমুখী। 

সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানতে পারছি, সব মিলিয়ে একটি মেট্রোরেলে বসে এবং দাঁড়িয়ে মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী চড়তে পারবেন। এতে আগের চেয়ে পরিস্থিতি বদলাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু ঢাকার বিপুল জনসংখ্যা ও অফিসগামী যাত্রী স্রোতের সামনে এ সংখ্যা যথেষ্ট নয়। ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথ, পাতাল রেল, ভালো মানসম্পন্ন গণপরিবহর সার্ভিস সব কিছু নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা আমাদের প্রয়োজন। তার চেয়ে বড় কথা হলো, বিদ্যমান ঢাকাকে কেন্দ্র করেই সব পরিকল্পনা হচ্ছে। যে শহরের আছে ভূমিকম্প ঝুঁকি। 

অভাবে যে শহর ও রাষ্ট্র ধুঁকছে, তার সব পরিকল্পনাই হচ্ছে কেন্দ্রীভূত ঢাকা শহরের এই ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে। মাঝে মাঝে শুধু আলোচনায় আসছে নতুন শহর পূর্বাচলের কথা। তাই কোন ভবিষ্যতে এ শহর বাসযোগ্য ও চলাচল সহজ হবে , এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

সারাক্ষণ ‘‘উন্নয়ন’’ আর মেগা প্রকল্পে লাইফ সাপোর্টে থাকা শহরকে জীবনে সক্রিয় জীবনে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।

পৌষের শীতের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম। বাংলার জনপদ মহামারিকালে শীতের পিঠায় কতটা তৃপ্ত হচ্ছে? কেমন আছে বিজয়ের ৫০ এর বাংলাদেশ? এও তো আমরা জানতে চাইতে পারি নাগরিক হিসেবে। সংবাদমাধ্যম মাফিক জানতে পাই, গত ১৪ ডিসেম্বর এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত দুই দিনব্যাপী একটি সম্মেলন রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। 

‘‘মহামারি থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ: অভিজ্ঞতা অর্জন ও নীতি প্রণয়ন’’ শীর্ষক বিষয় নিয়ে এতে কথা বলেন দেশের সংশ্লিষ্ট গুণীজনরা। একটি অর্থনৈতিক জরিপ প্রকাশ করা হয় সম্মেলনে। 

এতে দৃশ্যমান হয়, করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০%-এর মতো। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫%-এর বেশি।

এ জরিপ সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, ‘‘করোনাকালে ৪০%-এর বেশি কর্মজীবী মানুষের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। জরিপে ৮৬% উত্তরদাতা জানান, দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটাতে তারা পর্যাপ্ত আয় করতে পারছেন না। ৭৮% উত্তরদাতা কোভিডের কারণে খরচ কমিয়েছেন। আর ৫২% পরিবারকে নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন এনে খরচ কমাতে হয়েছে। জরিপে আরও বলা হয়, মাত্র ২০% পরিবার সরকারি সহায়তা পেয়েছে।

মুজিব জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের তুমুল লগ্নে এ জরিপ করা হয় এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে। ২ হাজার ৬০০ মানুষ জরিপে তথ্য দেন। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, কোভিডের কারণে গরিবরা আরো গরিব হয়েছেন। ধনীদের আয় আরও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ‘‘কোভিডের শিক্ষা হলো, বৈষম্য ও ঝুঁকি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে।’’

তাই বলা যায়, পৌষের কুয়াশা সামনেই গরম পড়লে আর থাকবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তির ঝকঝকে রোদের আকাশের জন্য আমাদের লড়তে হবে আরও বহুদিন। আমাদের বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ এখানেই। একাত্তরের জনযুদ্ধে শহীদদের স্বপ্নের বাংলা কি এমন ছিল? এ ব্যর্থতায় কুয়াশার চেয়ে গাঢ় আমাদের অশ্রু।  


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।



প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

About

Popular Links