Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে সৈয়দ সব্যসাচী

১৯৩৫ সালের আজকের দিনে কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৪ এএম

মনে হয়, গোলক ধাঁধা ছাড়া তিনি আর কী? যে মানুষটি নূরুলদীন লেখেন। আর তাতে বলেন, “ . . . যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায় . . .।” আর সেই সৈয়দ হকই আবার দেশকর্তার জন্মদিনে কবিতা লেখেন “আহা, আজ কি আনন্দ অপার!”

এই বোধহয় তার “উভয় হস্তে সমভাবে পারদর্শী” সব্যসাচীত্ব! রাজকবি হোন, যার পিছু পিছু থাকুন, যুবলীগ, ছাত্রলীগে থাকুন, নিরবে থাকুন, সরবে থাকুন; পুরোটা মিলেই সৈয়দ শামসুল হক। সৃষ্টিগুণে বাংলা সাহিত্যে যার আসন স্বতন্ত্র। ৮০ বছরের জীবনে তিনি ফসল ফলিয়েছেন শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমে। বাংলা সিনেমার গান লিখেছেন। আবার বিশ্ব সাহিত্য অনুবাদেও যিনি অনিন্দ্য। শেষ জীবনে ছবি এঁকেছেন। ভাস্কর্যকলায় পড়েছে তার হাত। নিজেই নিজের সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে গেছেন। অক্ষরপাঠ মাত্র বোধগম্য হয় এই তো সৈয়দ। এই তো সৈয়দ হক।

২০০৫ সালে প্রথম সাংবাদিকতা সূত্রে হক ভাইকে ফোন করি। আগে থেকে জানতাম ওনি খুব টেক প্রিয় মানুষ। ফোনে শুনলাম অ্যানসারিং মেশিনের বয়ান। তখন বার্তা দিয়ে রাখি, ‘‘আপনার ‘মৃগয়ায় কালক্ষেপ’ উপন্যাস নিয়ে কথা বলতে চাই। বাসায় আসতে চাই।” সম্ভবত সেটি ডিসেম্বর মাসের বিজয় দিবস সংখ্যা ছিল সমকালের। আমি কন্ট্রিবিউটর ছিলাম এ দৈনিকের রাজনৈতিক সাময়িকী ম্যাগাজিন “জনমঞ্চ“ এর। এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন এসএ মামুন ভাই। প্রয়াত গোলাম ফারুক ভাই ছিলেন তখনের সমকালের ফিচার এডিটর।

“মৃগয়ায় কালক্ষেপ” উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধকালে লন্ডনের প্রবাস জীবনের চালচিত্র নিয়ে লেখা। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আহমদ ছফার “অলাতচক্র” উপন্যাস। ছফা উলঙ্গ করেন কলকাতার প্রবাসী সরকারের কিছু ফূর্তিযোদ্ধাকে। যখন বাংলার বীরযোদ্ধারা লড়ছে খেয়ে না খেয়ে, তখন সোনাগাছি যৌনপল্লীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে প্রবাসী সরকারের নাম ভাঙানো। পুলিশ তখন জানায়, স্যার আপনারা এখানে আসেন কেন? আপনারা বললেই তো আমরা পৌঁছে দিতে পারি।

সৈয়দ শামসুল হকের “মৃগয়ায় কালক্ষেপ” উপন্যাসেও আছে লন্ডনের ফূর্তিযোদ্ধাদের বিবরণ। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর শোনার পর উপচে পড়া মদ, বিয়ারের পার্টি। জনযোদ্ধাদের ভুলে গিয়ে চিয়ার্সের সঙ্গে চলে ক্ষমতার ভাগাভাগি। চরিত্ররা বলতে থাকে, তুমি তো বোধহয় ঢাকার ডিসি হচ্ছো? আর তুমি ফরেন মিনিস্ট্রিতে? চলতে থাকে হাসা হাসি হিহি।

বহুল প্রচারিত “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা”র নামে একাত্তরের অব্যাখ্যাত এ চিত্রের উপন্যাস আমাকে আওয়ামী লীগপন্থি সৈয়দ হককে অন্যভাবে চেনায়। আমি এটি নিয়ে “জনমঞ্চ” এ সৈয়দ শামসুল হকের ভাষ্য অনুলিখনের প্রস্তাব দেই। মামুন ভাই তো রাজি। আমার ভেতর শিহরণ কাজ করছিলো সৈয়দ শামসুল হককে ফেস করার।

রাতে হক ভাই কলব্যাক করেন। গুলশানের বাসার ঠিকানা দেন। বলেন, চলে আসো। পরদিন গেলাম। আমার সংগ্রহে থাকা তাঁর কিছু বই ব্যাগে নেই অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য (যদিও এর কিছুই আমার সংগ্রহে এখন নেই)। দোতলা এক বিপুল বাড়ির সামনে দাঁড়াই। এর নিচতলায় সম্ভবত কোনো বুটিক শপ ছিল। বাড়িরক্ষীদের পরিচয় দেয়ার পর আমাকে ড্রয়িংরুমে বসতে বলা হয়। বাড়িটি দেখি ডুপ্লেক্স। মাঝে দোতলার সিঁড়ি। পেইন্টিং, বই আর বিপুল শৌখিন শোপিসে ভরা। আমার জন্য চা, নাস্তা আসে। এর প্রায় ৫ মিনিট পর সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। টক টক টক শব্দ করে সৈয়দ হক নামছেন। গায়ে পাঞ্জাবি আর চাদর। আমি দাঁড়িয়ে যাই। আমার জন্য তীব্র স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্ত ছিল সেটি। কিন্তু উনি আমার জড়তা ভেঙে দেন। হাত বাড়িয়ে দেন। বলেন, বসো না, শাওন। চা শেষ করো। আমার খুব ভালো লেগেছে যে, তুমি আমার এই বইটা নিয়ে কথা বলতে এসেছো।

এরপর আমি “মার্জিনে মন্তব্য” নিয়ে কথা তুলি। বলি, গুরুবিদ্যা সব শিখিয়ে দিলেন তো হক ভাই! তিনি হাহা করে হেসে ওঠেন। টুকটাক কথার পর রেকর্ডার অন করি। সৈয়দ শামসুল হকের অনবদ্য বচন তাতে ধারণ হতে থাকে। প্রায় ২০ মিনিটের মতো কথা বলেন তিনি। এরপর আমাকে তার পেইন্টিং, ভাস্কর্য দেখাতে দোতলায় নিয়ে যান। বিস্ময় জাগানিয়া ছিল তার বইয়ের সংগ্রহ। আমি অনেক সময় নিয়ে তা দেখি। হক ভাই অ্যাপল ম্যাকে লিখতেন। তার ব্যবহৃত সব গ্যাজেট দামী। এরপর ব্যাগে নিয়ে আসা বইগুলোতে অটোগ্রাফ নেই।

হক ভাইয়ের সহধর্মীনি ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের লেখাও আমার ভালো লাগে। আমার বোন তুলি আপু ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় তার একটি বই গিফট করেন। সে বইয়ের নাম "তুমি এখন বড় হচ্ছো"। এখন আমার মনেহয় বয়সন্ধিকালে প্রতিটি কিশোর, কিশোরীর এই বই পড়া উচিত। যৌনতা ও প্রজনন বিজ্ঞান এত সহজভাবে তিনি বুঝিয়েছেন তা অকল্পনীয়। আমার ব্যাগে এ বইটিও ছিল। হক ভাইয়ের কাছে জানতে চাই, ম্যাম, আছেন কীনা? তিনি বললেন, ওর একটু দেরি হবে ফিরতে।

আহা! সেলফির যুগ থাকতো যদি তখন! সৈয়দ হকের সাথে একটা ছবি হলেও ধরে রাখতে পারতাম। আর আমি তো তখন ইউজ করি ৮০০ টাকা দামের মোটোরোলা। এক ঘণ্টার বেশি সময় তার সাথে থাকি। চলে যাবো। নিচে নামি। বিদায় নিচ্ছি। এমন সময় হক ভাই বলেন, হাসান দাঁড়াও। বলে তিনি দোতলায় যান। কয়েক মিনিট পর আবার সেই সিঁড়িতে টক টক টক শব্দ। একটি কমলা হাতে দিয়ে বলেন, এটা খেতে খেতে যাও ভাই। এমন হৃদয়জয়ী মানুষ ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক।

২০০৮/০৯ সালের দিকে আবার হক ভাইকে দেখার সুযোগ হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তখন ‘বেঙ্গল বারতা’ প্রকাশ করতে যাচ্ছে। অফিস বনানী। আমি সেখানে নির্দিষ্ট কিছু কনটেন্ট নিয়ে লেখার প্রস্তাব দেই। মেঘদলের শিবু’দাও (শিবু কুমার শীল) সে অফিসে যেতেন। খুব সকালে ঐ অফিসে গেলেও দেখতাম হক ভাই কাঁচের ঘরে বসে তার ম্যাকে লিখে যাচ্ছেন আর লিখেই যাচ্ছেন। ইবাদতরত মানুষ যেমন একাগ্রতায় সেজদাহ দেয় তেমনভাবে।

সারাটা জীবন লিখেই গেছেন হক ভাই। অবিশ্বাস্য যার পরিমাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের পড়া তিনি শেষ করেননি। বিলেত গিয়ে বিবিসিতে কাজ করেছেন। খুব ছোটবেলায় গেছেন ভারতে। জানতেন ফিল্ম বানানোর খুঁটিনাটি। এক কথায় স্বশিক্ষিত এমন এক সৃষ্টিশীল মানুষ; যাকে বলা যায়, ওয়ান ম্যান আর্মি। অনেক কীর্তিমান ছিলেন, আছেন ও আসবেন আমাদের জনপদে। কিন্তু জলেশ্বরী স্রষ্টা একক সৈয়দ হক এক অনন্য মানুষ। তার ভাষায় বলতে হয়,. . .

মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর

নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর . . ."

১৯৩৫ সালের আজকের দিনে কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। এখন চিরঘুমেও আছেন সেই জন্মভূমিতেই।

অনন্তলোকে ভালো থাকুন হক ভাই। বুকঝিম ভালোবাসা আপনার জন্য।

শুভ জন্মদিন, সৈয়দ শামসুল হক!


ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



About

Popular Links