Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অদ্ভুত কিছু মানসিক সমস্যা

বিরল হওয়ায় এগুলো সম্পর্কে মানুষ কমই জানে

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:৩১ পিএম

মানসিক রোগ হিসেবে সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো রোগই বেশি পরিচিত। কিন্তু এর বাইরেও কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, যেগুলো বিরল হওয়ায় সে সম্পর্কে মানুষ কমই জানে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-

কোটার্ড সিনড্রোম

কোটার্ড সিনড্রোম আক্রান্ত মানুষকে জীবন্মৃত বা ওয়াকিং ডেড সিনড্রোম আক্রান্ত বলে বর্ণনা করা হয়। এ রোগে আক্রান্ত মানুষরা বিশ্বাস করে যে তারা মৃত এবং তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেকে আবার মনে করে যে তার দেহের কোনো একটি অংশ সক্রিয় নেই। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেদের অস্তিত্বকে অবিশ্বাস করে। তার ধারণা, তিনি জীবন্মৃত। নিজের আত্মা তাকে অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে।

এই রোগের নামকরণ করা হয়েছে ঊনিশ শতকের ফরাসি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ জুলস কোটার্ড এর নামানুসারে। তিনি ১৮৮২ সালে প্রথম এই রোগের উপসর্গ বিষয়ে ধারণা দেন।

সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্ণতা এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভোগা রোগীদের মধ্যে এই মানসিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এছাড়া ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ অ্যাসিক্লোভিরের বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এ রোগের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মস্তিস্কের যে অংশের সাহায্যে মানুষ চেহারা শনাক্ত করে এবং যে অংশ আবেগীয় বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত- এই দুই অংশের মধ্যকার সংযোগ বিচ্ছিন্নতা ঘটলে তার কারণে এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, বিরল এই উপসর্গের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা প্রতিরোধী চিকিৎসা, মানসিক রোগের চিকিৎসা এবং মেজাজ স্থিতিশীল রাখার চিকিৎসা কার্যকর। এছাড়া ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপিও কাজ করে।

ফ্রেগোলি সিনড্রোম

ফ্রেগোলি সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মনে করে যে, আলাদা আলাদা ব্যক্তি আসলে একজনই মানুষ, যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে। যারা এই সমস্যায় ভোগেন তারা মনে করেন যে, তারা ছদ্মবেশধারী ব্যক্তির দ্বারা নির্যাতিত।

এই সমস্যার নামকরণ করা হয়েছে ইতালির মঞ্চ অভিনেতা লিওপলডো ফ্রেগোলির নামানুসারে। তিনি মঞ্চে উপস্থিত থেকেই খুব দ্রুত চরিত্র পরিবর্তন করে ফেলতে পারতেন এবং এজন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন।

ফ্রেগোলি সিনড্রোম আরও অনেক মানসিক সমস্যার পাশাপাশি ঘটে থাকে। যেমন বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া এবং অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি। অর্থাৎ সাধারণত ব্যক্তির মুড, আবেগ বা মানসিক অবস্থার বিপরীতমুখী পরিবর্তন ঘটে যেসব মানসিক অবস্থায়।

২০১৮ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, বিশ্বজুড়ে এ ধরণের উপসর্গে আক্রান্ত মাত্র ৫০ জন ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া গেছে।

এরপর ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়,স্ট্রোকে ভোগা রোগীদের মধ্যে ১.১% ঘটনায় এ ধরনের সিনড্রোম দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই হিসেবে এ পর্যন্ত ৫০ জনের চেয়ে বেশি মানুষ এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তারপরও এটি বেশ বিরল মানসিক উপসর্গ।

এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম

এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম বিশ্বের অন্যতম বিরল স্নায়ুরোগগুলোর মধ্যে একটি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মনে করে যে তার হাতের আলাদা একটি মন আছে এবং সেটি তার নিজের মর্জিমাফিক কাজ করে। একইসঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন যে, তার হাত আসলে তার নিজের নয়।

“এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম” নামকরণ প্রথম প্রচলন করেন আমেরিকার নিউরোফিজিওলজিস্ট জোসেফ বোগেন।

মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের পর সেরে উঠছে এমন কিছু রোগীর মধ্যে দেখা দেওয়া অদ্ভূত ও নতুন আচরণকে বর্ণনা করার জন্য তিনি এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন।

এই সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সংবেদনশীলতা প্রক্রিয়াগতকরণ বিষয়ক জটিলতায় ভোগে এবং মনে করে যে তাদের হাতের কাজের সঙ্গে তারা জড়িত নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই উপসর্গে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই এলিয়েন হ্যান্ড এর নকল করেন এবং বিশ্বাস করেন যে তাদের হাতের উপর কোনো আত্মা ভর করেছে বা কোনো ভিনগ্রহের প্রাণি বা জীবের অস্তিত্ব রয়েছে তাদের হাতে।

এই রোগের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিমেনসিয়া, স্ট্রোক, প্রিয়ন ডিজিজ (মস্তিস্কের এক ধরণের মারাত্মক রোগ), টিউমার এবং খিঁচুনি।

সিনড্রোম ডি একবোম

একবোম’স সিনড্রোম হচ্ছে স্পর্শকাতর একটি হ্যালুসিনেশন (অবাস্তব কিছু দেখা) যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিশ্বাস করে যে তারা পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত এবং মনে করে যে তাদের চামড়ার নিচে পোকামাকড় কিলবিল করছে।

এই উপসর্গের নামকরণ করা হয়েছে সুইডিশ নিউরোলজিস্ট কার্ল একবোমের নামানুসারে। তিনি ১৯৩০ এর দশকে প্রথম এই অবস্থার বর্ণনা করেন।

একবোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, এই উপসর্গে বেশি আক্রান্ত হয় নারীরা (আক্রান্তের দুই তৃতীয়াংশ নারী) এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এই উপসর্গ সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

একবোম সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অন্য স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে সিজোফ্রেনিয়া, মস্তিষ্কের রোগ, স্নায়ুর রোগ, এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কিত জটিলতা।

এছাড়া যেসব ব্যক্তি অ্যালকোহল ত্যাগ করছেন, কোকেইন ব্যবহার করছেন, যাদের স্ট্রোক, ডিমেনসিয়া আছে এবং মস্তিষ্কের থ্যালামাস নামে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন ব্যক্তিরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।

একবোম সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীরা বেশিরভাগ সময় মানসিক চিকিৎসা নিতে চান না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে, এই সমস্যার জন্য শারীরিক চিকিৎসা দরকার।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমকে টড সিনড্রোমও বলা হয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক গঠন, দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ এবং স্থান বা সময় সম্পর্কিত অনুভূতি যথার্থ থাকে না।

এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মনে করেন, তাদের আশেপাশে থাকা জিনিসপত্র আকারে বাস্তবের তুলনায় অনেক ছোট, অন্যদিকে আশে পাশে থাকা মানুষ বাস্তবের তুলনায় আকারে অনেক বড়।

এর বিপরীত এম অনুভূতিও হয় - যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন, জিনিসপত্র বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় এবং মানুষজন আকারে অনেক ছোট।

এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছু মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে এবং মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিরদের মধ্যে এ ধরণের উপসর্গ বেশি দেখা যায়।

এতে আক্রান্ত ব্যক্তি ভয় পেয়ে থানে এবং ঘাবড়ে যান। এ কারণে চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রাম এবং অবসরের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই উপসর্গ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না।

About

Popular Links