Sunday, June 16, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে কেন এত আলোচনা?

বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেই অনেকের কাছে “হিরো” বনে গেছেন ধ্রুব রাঠি। নির্বাচনের সময় তার বানানো ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০৬:৪১ পিএম

সদ্য সমাপ্ত ভারতের লোকসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক নেতাদের বাইরে একটি নাম ভেসে বেড়াচ্ছে; ধ্রুব রাঠি। শুধু ভারত নয়, পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে আলোচনা চলছে। ধ্রুব রাঠি মূলত একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কিন্তু প্রশ্ন হলো এত এত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের মাঝে কেন শুধু ধ্রুব রাঠি? নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার নামটি জুড়েই কেন এত আলোচনা।

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা বা বিরোধিতা করেই অনেকের কাছে “হিরো” বনে গেছেন ধ্রুব রাঠি। নির্বাচনের সময় তার বানানো ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে।

ধ্রুব রাঠির পরিচয়

ধ্রুব রাঠি একজন ভারতীয় ইউটিউবার। তার ইউটিউব যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে। গতবছর পর্যন্ত ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবার ছিল ১৩ মিলিয়নের বেশি। কিন্তু এখন তার প্রায় ২২ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তিনি তার চ্যানেলে ৫০০টিরও বেশি ভিডিও আপলোড করেছেন। ফেসবুকে তার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা তিন মিলিয়নের বেশি। তার একেকটি ভিডিও কোটি কোটি মানুষ দেখছেন।

ধ্রুব রাঠির জন্ম ভারতের রাজধানী দিল্লির নিকটবর্তী হরিয়ানা রাজ্যের রোহতক জেলায়। হরিয়ানা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য জার্মানিতে চলে যান। জার্মানিতে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ডিগ্রি লাভ করেন।

ওয়েবসাইট “ধ্রুব রাঠি ডটকম”-এ নিজের ভিডিও তৈরি করার পছন্দের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। ধ্রুব রাঠির মতে, “তথ্যবহুল ও শিক্ষামূলক কন্টেন্ট তৈরির মাঝে আমার দক্ষতা নিহিত; এমনসব কন্টেন্ট, যেগুলোতে বিভিন্ন জটিল বিষয়ের সুনির্দিষ্ট, সংক্ষিপ্ত ও সহজ ব্যাখ্যা থাকবে।”

সেখানে তিনি বলেন, “আমি আমার ভিডিও’র মাধ্যমে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা সত্যকে তুলে ধরতে এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, র‍্যাশনালিজম, ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ প্রচারে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”

নিজের সম্পর্কে ধ্রুব রাঠি বলেছেন, “আমার পড়াশুনার বিষয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রিনিউয়েবল এনার্জি। কিন্তু অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর আমার গভীর আসক্তি আছে। এ বিষয়ের ওপর আমার দ্বিতীয় স্নাতক ডিগ্রিও আছে। এছাড়া, আমি ভ্রমণ করতেও পছন্দ করি।”

গত বছর টাইম ম্যাগাজিনের “নেক্সট জেনারেশন লিডারস ২০২৩”-এর তালিকায় নাম উঠেছিল ২৯ বছর বয়সী ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির নাম। তিনি তার “ফ্যাক্ট-চেকিং” কাজের জন্য এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয়ের ওপর কন্টেন্ট তৈরির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।

গত বছরের মে মাসে বিতর্কিত ছবি “দ্য কেরালা স্টোরি” মুক্তি পাওয়ার পর ধ্রুব রাঠি ছবিটি নিয়ে কথা বলেন এবং ট্রলিংয়ের শিকার হন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ধ্রুব রাঠি সম্পর্কে লিখেছে, ২০১৪ সালে রাজনীতিতে চলমান দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে মোদির আবেগময় বক্তৃতা শুনে ধ্রুব রাঠিও আশার আলো খুঁজে পেয়েছিলেন। তখন তিনিও মোদির সমর্থক ছিলেন এবং মোদির উত্থানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মাথায় তিনি মোদির সমালোচক হয়ে ওঠেন। মোদির বিষয়ে তিনি আশাহত হন ২০১৫ সালে। তখন আম আদমি পার্টি দিল্লিতে একটি দুর্নীতিবিরোধী হেল্পলাইন চালু করেছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার, মানে মোদি সরকার সেই হেল্পলাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার রাজ্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করেছিল।

রাঠি একটি সাক্ষাৎকারে আল জাজিরাকে বলেন, “এটি আমার খুব বিস্ময়কর এক ব্যাপার ছিল। আমি অনুভব করেছি যে তারা ভারত থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে আগ্রহী নয়।”

তার মতে, যখন তিনি দেখছিলেন যে অনেক মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেল মোদী ও বিজেপির পক্ষে কথা বলছে, তখন তার হতাশা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

নির্বাচনকে কিভাবে প্রভাবিত করেছেন ধ্রুব রাঠি

ধ্রুব রাঠি ও তার কাজ ভারতীয় নির্বাচনের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা বলা কঠিন। তবে গত ৩ জুন, ভোট গণনার একদিন আগে তিনি “মাই লাস্ট মেসেজ” শিরোনামে প্রায় ২৪ মিনিটের দীর্ঘ একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। সেই ভিডিওটি এত বেশি জনপ্রিয় হয়েছে যে ভারতের নাগরিকরা তা শুধু দেখছেন না, বারবার শেয়ারও করছেন। সেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন যে তিনি কিভাবে শিক্ষামূলক কন্টেন্ট তৈরি করতে করতে রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর কন্টেন্ট তৈরি করা শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি শিক্ষামূলক ভিডিও বানাতে পছন্দ করি, তাই আমি কেবল এটিই করি। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে এমন কিছু বিষয় ঘটে, তারপর আমি আর নিজেকে থামাতে পারিনি। সেসময় চণ্ডীগড় নির্বাচনের জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ও দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন প্রিজাইডিং অফিসার ধরা পড়েন।”

তিনি বলেন, “এরপর আমি সর্বপ্রথম ‘ডিক্টেটরশিপ’ (স্বৈরাচারতন্ত্র) নিয়ে একটি ভিডিও বানিয়েছিলাম এবং আমি ভাবিনি যে এটি কোনো প্রভাব ফেলবে। কিন্তু যখন ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, আমি অবাক হয়ে দেখলাম যে ২০ মিলিয়ন মানুষ ভিডিওটি দেখেছেন এবং বর্তমানে তা ২৫ মিলিয়নে পৌঁছেছে।”

ধ্রুব রাঠি বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম যে আমি যা অনুভব করছি, আপনারাও ঠিক একই অনুভূতির মাঝ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাকে যেসব বিষয় উদ্বিগ্ন করে তুলছিল, আপনাকেও একই বিষয় উদ্বিগ্ন করছে। এমনকি, আমার এ বিষয়ের ওপর আর কোনো ভিডিও বানানোর ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু কাকতালীয়ভাবে হয়ে যায়। কারণ এরপর এমন দুটো ঘটনা ঘটে…প্রথমত, অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয়েছিল এবং দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “আমি আমার প্রথম ভিডিওতে যা বলেছিলাম, তা সত্যি হচ্ছে। এরপরে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে মানুষকে জাগ্রত করতে হবে এবং এই কাজটি পাহাড়ে আরোহণের চেয়েও বেশি কঠিন।”

অনেকে ভারতের নির্বাচনি ফলাফলে ধ্রুব রাঠির ভিডিওগুলোর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ধ্রুব’র ভাষ্য, তার মতো আরও অনেকে আছেন, যারা নির্ভয়ে তাদের কাজ করছেন।

এ বিষয়ে তিনি ভারতের সুপরিচিত সাংবাদিক রাভিশ কুমার, আভিসার শার্মা, আজিত আঞ্জুম প্রমুখের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি পুনম আগরওয়াল, মানীষা পান্ডে, নিধি সুরেশ এবং আরিফা খানম শেরওয়ানি, মীনা কোতওয়াল, ড. মেডুসাসহ গোলা, কাবিরন, গ্রিমা, নেহা সিং রাঠোরের মতো আরও অনেকের কথাও বলেন।

মনসুর নামক একজন ব্যক্তি ধ্রুব রাঠির ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “হাওয়া বদল করে দেওয়া ভারতীয় নায়কের সাথে পরিচিত হন, যিনি একাই মোদির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।”

সাবেক সাংবাদিক আকাশ ব্যানার্জী তার “দ্য দেশ ভক্ত” নামক ইউটিউব চ্যানেলে ধ্রুব রাঠির স্বৈরাচারের ভিডিওটি সম্পর্কে বলেন যে এটি সরাসরি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে। সেই ভিডিওটি লাখ লাখ মানুষ দেখলেও তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

ব্যানার্জি বলেন, “ভিডিওতে স্বৈরাচার শব্দটির ব্যবহার এটিকে বিশেষ করে তুলেছে।”

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কেন আলোচনা?

ভারতের নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে যখন স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে- নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় ধ্রুব রাঠীকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

আসমা শিরাজি নামে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ধ্রুব রাঠির ছবিসহ একটি টুইট শেয়ার করে লিখেছেন, “যখন কেউ শাসনামলের বিরুদ্ধে কথা বলতো না, তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র বিরোধীপক্ষ।”

উমাইর জাভেদ নামে একজন ব্যবহারকারীও এক্সে লিখেছেন, “পাকিস্তানের অনেক লোক অনলাইনে কন্টেন্ট তৈরির মাধ্যমে স্ট্যাবলিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এর জন্য তারা চড়া দামও দিয়েছে।”

অন্য একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ধ্রুব রাঠি অবশ্যই সম্মানের যোগ্য।”

ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে গত কয়দিন ধরে বাংলাদেশেও ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভু নামে একজন বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধ্রুব রাঠির ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে। ধ্রুব চায়নি ভারত একনায়কের হাতে জিম্মি হয়ে যাক। ধ্রুব সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়েছে সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বলে দিচ্ছে মোদি ম্যাজিক ফিকে হয়ে গেছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না বিজেপি। মোদিকে ধরাশায়ী করার জন্য যারা লড়েছেন, ধ্রুব রাঠি তাদের একজন।”

একইভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আরও অনেকেই ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন। তারা ধ্রুব রাঠির ভূমিকা নিয়ে প্রশংসাও করছেন।

About

Popular Links