• বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:৪৩ বিকেল

ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা কমছে, প্রমাণ সরকারি পরিসংখ্যানেই

  • প্রকাশিত ০৯:২৯ রাত সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯
আসাম
ভারতের আসামে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) থেকে বাদ পড়েছেন রাজ্যের প্রায় ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। ছবি: এএফপি

ভারতে বাংলাদেশিদের কথিত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যখনই আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক হয়, তখন নির্ভরযোগ্য বা সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব থাকে সব বর্ণনাতেই 

তারিখটা ছিল ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর। ভারতে পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশন সবে শুরু হয়েছে। সেই অধিবেশনেই দেশটির তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে জানালেন, ভারতে নাকি প্রায় ২ কোটির মতো অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বসবাস করছেন।

এই পরিসংখ্যান সরকার কোথা থেকে বা কোন সূত্রে পেল, সেটা তিনি কিছু খোলসা করেননি। শুধু বলেছিলেন, “অ্যাভেলেবল ইনপুটস” বা প্রাপ্ত তথ্যমতে এই সংখ্যাটা জানা যাচ্ছে। তবে সেইসঙ্গেই মন্ত্রী জানান, বহু বাংলাদেশি নাগরিকই কোনও বৈধ ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট (পাসপোর্ট, ভিসা) ছাড়া ভারতে প্রবেশ করছে বলে খবর আছে। কিন্তু যেহেতু পুরো কাজটাই ঘটছে গোপনে ও পর্দার আড়ালে, তাই গোটা দেশজুড়ে এই ধরনের বাংলাদেশির সংখ্যা কত সেটা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। 

আসলে ভারতে বাংলাদেশিদের কথিত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যখনই আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক হয়, তখন নির্ভরযোগ্য বা সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব থাকে সব বর্ণনাতেই।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতে এই “দুই কোটি” সংখ্যাটা ঘোরাফেরা করছিল-কিন্তু স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পার্লামেন্টে লিখিতভাবে সেই সংখ্যাটা উল্লেখ করার পর তা একটা সরকারি বৈধতা পেয়ে গেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিজেপি নেতারা এখন সভা-সমাবেশ-সেমিনারে অম্লানবদনে বলতে পারেন, “এদেশে দু’কোটিরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশি লুকিয়ে আছে, আর আমরা তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করব।”


আরও পড়ুন: ‘প্রত্যেককে ২ প্যাকেট খাবার ধরিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে’


কিন্তু এই দুই কোটি সংখ্যাটা কীভাবে এল, তার উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা রয়েই গিয়েছে। উপরন্তু ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারির (২০১১) যে অভিবাসন-সংক্রান্ত ডেটা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে বরং দেখা যাচ্ছে ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ১০বছর আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

ফলে এই মুহূর্তে যখন ভারতের নানা রাজ্যে আসামের ধাঁচে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি খোঁজার হিড়িক পড়েছে, সেই পটভূমিতেই কিন্তু এই নতুন পরিসংখ্যান নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরছে। যা থেকে সম্ভবত এটাও পরিষ্কার, এই “হিড়িক” আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

কেন সেন্সাস ডেটা সামনে এল আটবছর পর?   

অর্থনীতিবিদ চিন্ময় টাম্বে আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক, ভারতে অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণাও করছেন তিনি। “ইন্ডিয়া মুভিং : আ হিস্ট্রি অব মাইগ্রেশন” নামে একটি প্রশংসিত বইয়েরও লেখক।

সেই চিন্ময় টাম্বে সম্প্রতি একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ২০১১ সালের সেন্সাসের অভিবাসন-সংক্রান্ত ডেটা কেন প্রায় আট বছর পর ২০১৯’র গোড়ায় এসে প্রকাশ করা হল, তার কারণ সম্ভবত সেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা কমছে। এই তথ্য সরকার যতদিন সম্ভব চেপে রাখতে চেয়েছিল বলেই তার সন্দেহ।

২০১১র সেন্সাস ডেটা বলছে, বাংলাদেশে জন্মানো ব্যক্তির সংখ্যা ভারতে তখন ছিল ৩৭ লক্ষ – যা ১০বছর আগের তুলনায় অন্তত ১০ লক্ষ কম। আর যদি কখনও বাংলাদেশে ঠিকানা ছিল এমন ব্যক্তিদের হিসেব ধরা হয় সেক্ষেত্রেও ২০০১ সালে ৩১ লক্ষের তুলনায় ২০১১তে সংখ্যাটা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ লক্ষে।

সেকারণেই চিন্ময় টাম্বে বলছেন, “বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ থেকে যে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে বা ইউরোপে যাওয়ার যে ঝোঁক অনেক বেশি বেড়েছে এই পরিসংখ্যানেই তা প্রমাণিত। তারচেয়েও বড় কথা, এই সময়কালে মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ যে প্রভূত উন্নতি করেছে সেকারণেই বাংলাদেশিদের ভারতে যাওয়ার গরজও কমে গেছে।

বাংলাদেশিরা কেন আজকাল খামোখা ভারতে যাবেন, এই বক্তব্যের সমর্থনে সরকারও ঠিক এই যুক্তিই দিয়ে থাকে। এখন ভারত সরকারের সেন্সাস ব্যুরোর পরিসংখ্যানও কার্যত সেই তথ্যকেই সমর্থন করছে। 


আরও পড়ুন: আসামের এনআরসি নিয়ে মমতার উদ্বেগ


৬৪ হাজার শরণার্থীকে ফেরত নেয় বাংলাদেশ  

গত জানুয়ারি মাসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ-১৮ দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর জানতে পারি ভারতে ৬৪ হাজার বাংলাদেশি শরণার্থী রয়েছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমি তাদের ফেরত নিয়ে এসেছিলাম।"

আসামের জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকা প্রণীত হওয়ার পর কয়েক প্রজন্ম আগে বাংলাদেশ থেকে আসামে যাওয়া মানুষরা বিপদে পড়বে কিনা, নিউজ এইটিনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার কাছে জানতে চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বিশ্বে অভিবাসন একটি খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভারতের বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসী হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এখন যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী হচ্ছে, তখন আমাদের দেশ থেকে মানুষ কেন ভারতে যাবে এবং সেখানে গিয়ে থাকবে, তা আমি বুঝতে পারি না।"

২ সেপ্টেম্বর একই সংবাদমাধ্যমকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, "১৯৭১ সালের পর কেউই বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায়নি। তারা ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে আসামে ঠাঁই পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নয়।"

৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দলের সাধারণ সম্পাদক  এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “ভারতের নাগরিকত্ব বাতিলকৃতদের মধ্যে ৬০ ভাগই হিন্দু, মুসলামান হচ্ছে ৪০ ভাগ।  তারাতো ভারতেই বাস করছিল, ভারতেই নাগরিক, আর তাদের এখনই দেশছাড়া করবে এমন সিদ্ধান্ত এখনই ভারত সরকার নেয়নি। আমরা সাধারণভাবে জানি ১৯৭১ সালের পরে কোন বাংলাদেশি ভারতে মাইগ্রেট করেনি।"

বাংলাদেশিদের ভারত ন্যাচারালাইজ করুক

দিল্লির দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার কলামনিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক অভীক বর্মনও বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু এখন ভারতের চেয়েও অনেক বেশি দ্রুত হারে বাড়ছে তাই সেদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যাও কার্যত ‘শূন্যের কোঠায়’এসে ঠেকেছে।

কিন্তু যারা এর আগে থেকেই ভারতে অবৈধভাবে রয়ে গেছেন তাদের নিয়ে তাহলে কী করণীয়?

অভীক বর্মন বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন,“আমি মনেকরি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বা ভারতে ঢোকার তারিখ বিবেচনা না-করে এই কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের ‘ন্যাচারালাইজ’ করে স্বাভাবিক নিয়মে ধীরেধীরে নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়াই একমাত্র পথ। ইউরোপের অনেক দেশও ঠিক একই পন্থা নিয়েছে, কারণ এটাই এই সমস্যার একমাত্র যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান।”

তিনি যুক্তি দিচ্ছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যেহেতু কোনও ডিপোর্টেশন চুক্তি নেই তাই ভারত যদি লক্ষলক্ষ লোককে অবৈধ বাংলাদেশি বলে শনাক্তও করে তাহলে তাদের বৈধ চ্যানেলে সেদেশে ফেরত পাঠানোর কোনও রাস্তাই নেই।

দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে একটা ‘কাট-অফ ডেট’নির্ধারণ করাও হবে খুব গোলমেলে ব্যাপার। আসাম চুক্তি যেমন বলে, ১৯৭১’র ২৫শে মার্চের আগে যারা বাংলাদেশে এসেছেন তারাই কেবল ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য। ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব বিল আবার বলছে ২০১৪র ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে আসার কথা–যদিও সেটা শুধু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জন্য প্রযোজ্য, মুসলিমরা সে সুবিধা পাবেন না।

তাছাড়া এনআরসি-কে নিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশ ভারতের সব রাজ্য আদৌ মানতে বাধ্য কিনা, তানিয়েও বিস্তর সাংবিধানিক জটিলতার অবকাশ আছে। সেকারণেই অভীক বর্মন মনে করেন,“এই কথিত বাংলাদেশিদের ভারতীয় সমাজের মূল স্রোতের মিশিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান–কিন্তু মুশকিল হল, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অঙ্ক যে অন্যকথা বলে!”


আরও পড়ুন: আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় নেই ১৯ লাখ আবেদনকারী


বাংলাদেশকে বোঝাতে হলে ক্যারট চাইস্টিক নয়

ভারতের নামি স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ’র (অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন) সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাটে’ এই কথিত বাংলাদেশি অভিবাসন ইস্যুতে বছরপাঁচেক আগে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তার সেই পর্যবেক্ষণ আজকের এনআরসি বিতর্কের পটভূমিতেও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।

জয়িতা ভট্টাচার্যর বক্তব্য ছিল, “দুম করে কিছু লোককে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে ভারত যদি জোর করে তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে তাহলে কোনও লাভই হবে না। এখানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করাটাই দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ।”

আর বাংলাদেশকে এই আলোচনায় রাজি করানোর ক্ষেত্রে ‘স্টিকে’র (লাঠি) বদলে ‘ক্যারট’ই (গাজর) বেশি কার্যকর হবে, এখনও এটাই তার অভিমত। অর্থাৎ ঢাকাকে কোনও ভয় দেখিয়ে দিল্লি এখানে তাদের কার্যসিদ্ধি করতে পারবে না বরং এখানে যে বাংলাদেশেরও লাভের সম্ভাবনা আছে সেটাই ঢাকাকে বোঝাতে হবে বলে জয়িতা ভট্টাচার্যর পরামর্শ।

যেমন, ভারতে যদি সত্যিই লক্ষ লক্ষ অবৈধ বাংলাদেশি থেকে থাকেন, তাহলে দেশে তাদের রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠাতে হয় বেআইনি রাস্তাতেই-আর তাতে বাংলাদেশ সরকারও কোটি কোটি ডলার রাজস্ব হারায়। 

দুইদেশের আলোচনাসাপেক্ষে এই ধরনের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ওয়ার্ক ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট চালু করা গেলে তাতে লাভ দু’পক্ষেরই, এমন একটা প্রস্তাবও তখন উঠে এসেছিল।

তবে সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা প্রতিবছরই কমছে–আর‘দুই কোটি’-র যে সংখ্যা নিয়ে বিজেপি নেতাদের এত লম্ফ-ঝম্প, তার কোনও মেথডোলজি বা নির্ভরযোগ্যতাই নেই। যে দাবির ভিত্তিতে তারা ভারতকে ‘অবৈধ বিদেশি-মুক্ত’ করার অভিযানে নেমেছেন, ভারত সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানই তাকে সমর্থন করছে না।