• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৩ রাত

বেপরোয়া রাবি ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাকর্মীরা

  • প্রকাশিত ১১:২৩ সকাল সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯
রাবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ্য নেতারা মনে করেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাউন্সিল না হওয়ায় এসব নীতি বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। তাদের ওপর শাখা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিয়ন্ত্রণ নেই

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হলে সিট বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এছাড়াও ভিন্নমতের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মারধর, ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি, সাংবাদিকদের মারধরসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নিয়মিত আলোচনায় থাকছে রাবি ছাত্রলীগ। 

সর্বশেষ গত দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি গণমাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধির সিট দখল, গভীর রাতে শহীদ মিনার বেদিতে মোটরসাইকেল চালানোসহ নিজেদের মধ্যে দুইবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাকর্মীদের।

নেতাকর্মীদের এমন কর্মকাণ্ডে সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি ইমেজ সংকটের আশংকা করছেন সংগঠনটির শুভাকাংখী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ্য শিক্ষক।

ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ্য নেতারা মনে করেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাউন্সিল না হওয়ায় এসব নীতি বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। তাদের ওপর শাখা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিয়ন্ত্রণ নেই।

তবে, নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি মানতে নারাজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া। তিনি বলেন, সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছেন। ছাত্রলীগ একটি বড় সংগঠন, এর নেতাকর্মী সংখ্যাও অনেক। ফলে বিভিন্ন সময় দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আমরা তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি।


আরও পড়ুন: রাবিতে সাংবাদিকের সিট দখলে নিলেন ছাত্রলীগ নেতা


প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর গোলাম কিবরিয়াকে সভাপতি ও ফয়সাল আহমেদ রুনুকে সাধারণ সম্পাদক করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের এক বছর মেয়াদী কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। 

এদিকে, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে একের পর এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি, সাংবাদিকদের মারধর, ভিন্নমতের নেতা-কর্মীদের ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর, জিম্মি করে চাঁদা দাবি, ছুরিকাঘাত, শহীদ মিনার বেদীতে মোটরসাইকেল চালানোহ এবং একাধিকবার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ।

সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলে ছাত্রলীগের দুইপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর মাদার বক্স হলের গেস্ট রুমে বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ৭ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের বেদীতে ১১ সেপ্টেম্বর রাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নতুন বিতর্কে জন্ম দেন শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি রবি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর শহীদ হবিবুর রহমান হলে এক সাংবাদিকের সিট দখল করে নেন ছাত্রলীগের আইন বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম।


ছাত্রলীগ নেতা রাব্বানীই ছিলেন মোটরসাইকেল নিয়ে বেদীতে ওঠা সেই যুবক!


এছাড়াও চলতি বছরের ৫ আগস্ট চাঁদা না দেওয়ায় সংগঠনেরই এক কর্মীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রলীগের নেতা শান্তর বিরুদ্ধে। গত ৭ মে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজারাকৃত বাগানের লিচু পাড়তে গিয়ে প্রহরীদের হাতে মারধরের শিকার হন ছাত্রলীগের ৫-৬ জন নেতাকর্মী। পরে ৯ মে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বাগানের সব লিচু সাবাড় করে নিয়ে যান। এ ঘটনায় লিচু বাগানের ইজারাদার ১৫ই মে ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সহসভাপতি সাদ্দাম হোসেনকেসহ ৭ জনকে আসামী করে সিএমএম আদালতে চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেন।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ১৬ এপ্রিল ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সহ-সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম আশিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রলীগের আরেক সহ-সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম ও ইতিহাস বিভাগ শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত আনোয়ারের বিরুদ্ধে।


আরও পড়ুন- লিচু খেতে গিয়ে গণধোলাই খেলেন রাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা!


গত ১০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলে এক শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চার হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান মিশু ও সহ-সম্পাদক শাফিউর রহমান সাফির বিরুদ্ধে।

১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের এক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ ছাত্রলীগ কর্মী মো. মানিক আহমেদ রাজ’র বিরুদ্ধে। ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বহিরাগত এক নারী শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে পুলিশ ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর চাঁদা না পেয়ে এক যুবককে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ উঠে শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে। ৭ ডিসেম্বর নাট্যকলা বিভাগের হৃদয় নামে শিক্ষার্থীকে প্রতিশ্রুত অর্থ আদায়ের জন্য আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউর রহমান (রাথিক) ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জসীমউদ্দীনের বিরুদ্ধে। ৮ ডিসেম্বর পুলিশ ওই শিক্ষার্থীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে উদ্ধার করে।

সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির কয়েকজন সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকের সঙ্গে। তারা বলছিলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর হতে চলল। কিন্তু এখনো হল কমিটি দিতে পারেনি। তারা বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।


আরও পড়ুন: রাবিতে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ


অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইলিয়াছ হোসাইন বলছেন, বর্তমানে যারা ছাত্রলীগ করছে তারা পরীক্ষিত নয়। এদের মধ্যে আদর্শ চর্চার সংকট রয়েছে। মুখে জয় বাংলার স্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগ হয়ে যাচ্ছে। যারা ছাত্রলীগ করছে এদের অধিকাংশই ভোগের জন্য রাজনীতি করছে। ফলে ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্ট্রাচার্য ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগের যতগুলো ইউনিটে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি রয়েছে তার তালিকা করা হচ্ছে। ইউনিটগুলোতে শেষ কবে কমিটি হয়েছিল, সে সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ চলছে। তালিকা পাওয়ার পর দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়া হবে। নতুন কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিন হল কমিটি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে হল কমিটি নেই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত হল কমিটি দেয়ার নির্দেশ দেব।”