Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক থেকে কী অর্জন করল বিএনপি

৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচনায় ছিল

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫২ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন প্রতিনিধির সঙ্গে শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে অন্তত তিনটি বিষয়কে অর্জন হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলের নেতারা বলছেন, বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপির গুরুত্বের বার্তা উঠে এসেছে। তারা আরও বাস্তবমুখী বলে বোঝা গেছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিও উঠে এসেছে।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, “৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক করতে দেশটির তৎপরতা ছিল বিগত দুই নির্বাচনের (দ্বাদশ ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন) চেয়েও লক্ষণীয়।”

একই সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনে “যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ” ভূমিকা রয়েছে বলেও প্রচার ছিল জোরেশোরে। এসব বিষয় প্রতিনিধি দলের আলোচনায় উঠে এসেছে-এমন দাবি করেন একজন উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতা।

তার দাবি, “বিএনপি যেন প্র্যাক্টিক্যাল হয়, সেদিকেও মনোযোগ রাখতে বলা হয়েছে।”

তবে দলের বিদেশ বিষয়ক কমিটির একজন সদস্য মনে করছেন, মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর ছিল নির্বাচনোত্তর “ফ্যাক্টস-ফাইন্ডিং” করার জন্য। তারা একটি মূল্যায়ন তৈরি করবে এবং ওয়াশিংটনকে রিপোর্ট করবে।

এই নেতা আরও উল্লেখ করেন, “বাইডেন প্রশাসনের জন্য গণতন্ত্র, মুক্তমত, অবাধ চিন্তা, মানবাধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বেশ কিছু বিষয়ে নির্বাচনোত্তর ভাষ্য তৈরি করবে প্রতিনিধি দল।”

মার্কিন কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকটি বিবৃতি দিয়েছেন। তবে এই সফররত প্রতিনিধি দলের মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল বলে জানিয়েছেন বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন। 

তিনি বলেন, “আমি মনে করি, নির্বাচনোত্তর মূল্যায়ন এবং সেই মূল্যায়নের ওপর রিপোর্ট করতেই প্রতিনিধি দল সফর করেছেন। তারা দেশের সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সরকারের বাইরে একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা মূলত পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর মূল্যায়ন করতে এসেছিলেন।”

শনিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আফরিন আক্তারের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের বিদেশ বিষয়ক কমিটির প্রধান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সদস্য শামা ওবায়েদ।

ওই দিন বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসসি) দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ডিরেক্টর এলিন লাউবাকের, ইউএসএআইডির এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মাইকেল শিফার ও ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত পিটার হাস উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে নীতিনির্ধারণী কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। এ বৈঠকে দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো উঠে আসে। 

তবে মির্জা ফখরুল ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলীয় ফোরামে এ বৈঠক নিয়ে কোনো আলাপ করেননি।

সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন সদস্য বলেন, “বৈঠক নিয়ে আমি অন্ধকারে আছি।”

মঙ্গলবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে (মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে) অংশ নেওয়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি সেদিনই বলেছি, বৈঠক নিয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। আজও করতে পারছি না।”

ভারতবিরোধী অবস্থান ছিল একটি কৌশল

২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় করা কয়েকটি চুক্তির প্রতিবাদে সমাবেশ করে বিএনপি। ওই সমাবেশ ছিল অন্তত সাত-আট বছর পর বিএনপির প্রকাশ্য ভারতবিরোধিতা। ওই সমাবেশের পর আর প্রকাশ্য ভারতবিরোধিতায় দেখা যায়নি বিএনপিকে।

দীর্ঘ কয়েক বছরের বিরতির পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-আগে গত ২৬ নভেম্বর, ১ ডিসেম্বর, ২২ ডিসেম্বরও  ২৪ ডিসেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ভারতের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

২৬ ডিসেম্বর ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে রিজভী আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচনের মদতদাতা ভারত।”

এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বিভিন্ন সময় ভারত নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তবে অন্য সিনিয়র নেতারা এ বিষয়টিকে নীরবতা রক্ষা করে চলেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও দলটির চেয়ারপার্সন কার্যালয়ের সঙ্গে নিযুক্ত দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনোত্তর ভারতবিরোধিতা নিয়ে বিএনপি দৃশ্যমান দুটো অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রথমটি হচ্ছে, ধর্মভিত্তিক ও ডানপন্থি দলগুলোকে “ভারতবিরোধিতায়” উৎসাহ জোগানো। দ্বিতীয়ত, দলের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কর্মসূচি না দেওয়া।

দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপির সঙ্গে সমমনা ডানপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের “ভারতবিরোধী” কর্মসূচি নিয়মিত প্রচার চালানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এই কৌশলের কারণ জানতে চাইলে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, “ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি কর্মসূচি দেবে না বিএনপি। তবে দেশের অভ্যন্তরে ‘ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট ও ডান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে তুষ্ট রাখার জন্য’ উৎসাহ অব্যাহত থাকবে।”

বিশেষ করে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ইসলামি ও প্রো-ইসলামি দলের জোট গঠনের যে আলোচনা চলছে, তাতে এই ভারত ইস্যুটিই প্রধান হিসেবে রাখা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।

এসব দলের কয়েকজন নেতা উল্লেখ করেন, ভারতের কারণে প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। মালদ্বীপের মতো রাষ্ট্র সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। সেখানেও ভারতীয় পণ্য পরিহারের বিষয়টি এসেছে। এ কারণে দেশের উৎসাহী কিছু ডানপন্থি দল ইস্যুটিকে “রাজনৈতিক” করার জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি করছেন।

১২ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা, বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, “ভারত ইস্যুতে ১২ দলীয় জোটের প্রোগ্রামের সিদ্ধান্ত হয়েছে আমাদের জোটের বৈঠকে। জোটের বেশ কয়েকজন শরিক দলের নেতা এ প্রস্তাব করেন। লক্ষণীয়, ভারতকেও তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। আমরা ভারতের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, তাদের উপলব্ধি করা দরকার-তারা একা হয়ে পড়ছে।”

ভারত প্রসঙ্গে বিএনপির সমমনা দলগুলো বিরোধিতা করলেও দলের সিনিয়র নেতারা এ প্রসঙ্গটি খুব একটা সামনে আনতে চাইছেন না। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদ এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী সমালোচনা করলেও মুখে “ভারত” শব্দটি অনুল্লেখ রেখেছেন।

১২ দলীয় জোটের ভারতবিরোধী মিছিলে পুলিশের বাধা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, “জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ১২ দলীয় জোটের কর্মসূচি পুলিশি বাধায় পণ্ড করা অগণতান্ত্রিক, আইনের শাসনের পরিপন্থি ও সরকারের ভিন্নমত দলনের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।”

লক্ষণীয়, পুরো বিবৃতিতে “ভারত” শব্দটি উল্লেখ করেননি মির্জা ফখরুল।

এ প্রসঙ্গে ১২ দলীয় জোটের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “ওরা (বিএনপি) বড় দল হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলবে না, এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-প্রত্যাশী। এ কারণে তারা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করছে না।”

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভারতবিরোধিতা শুরু করার আগে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর তাগিদ ছিল বেশি। ২০২২ সালে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিক্রম কুমার দোরাইস্বামীর সঙ্গে একাধিকবার একান্তে আলাপ করেন বিএনপির একাধিক নেতা। এই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছরের ১৬ মার্চে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির পাঁচ জন নেতাকে বাসায় নিমন্ত্রণ করেন।

একাদশ নির্বাচনের পথ ধরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সালাহউদ্দিন আহমেদ দিল্লিতে গিয়ে নানা মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

২০১৮ সালেও নির্বাচনপূর্ব সফরে ভারত যান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু ও হুমায়ুন কবির। পরবর্তীকালে বিদায়ী বছরের নভেম্বর থেকে আবার ভারত বিরোধিতায় ফেরে বিএনপি।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার প্রতিবাদে ও একটি মসজিদে নামাজের আয়োজন করে বিএনপি। এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি দূতাবাসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে দেখা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডক্টর আবদুল মঈন খান।

দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “ভারত ইস্যুতে কিছু জানি না। আমি অ্যাগ্রি করি না, ইন্টারেস্টেডও না। বিএনপি তো মওলানা ভাসানী না, বিএনপি ক্ষমতায় আসার দল।”

তিনি দাবি করেন, “যেসব নেতা ভারতের বিরুদ্ধে বলছেন, তাদের বক্তব্য নিজেদের এজেন্ডা রয়েছে।”

বিএনপির বিদেশ বিষয়ক কমিটির প্রধান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটা চিন্তা করে দেখতে হবে। আমি তো কারাগার থেকে বেরোনোর পর এখনও পুরোপুরি ফিরতে পারিনি। পুরো জিনিসটা আমার কাছে ক্লিয়ার না। বিষয়টি বুঝতে হবে।”

About

Popular Links