Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এশিয়া কাপ: বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা জয়

পাহাড়ের মতই অটল ছিলেন মুশফিক। উইকেটের অন্যপ্রান্তে আসা যাওয়ার খেলা চললেও অপরপ্রান্তে অবিচল ভাবে উইকেট কামড়ে থেকে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। টেলেন্ডারদের সাথে নিয়ে দুইশ'র গণ্ডি পার করেন টাইগার শিবিরের মিঃ ডিপেন্ডেবল। দর্শকদের উপহার দিয়েছেন ক্যারিয়ার শ্রেষ্ঠ শতক। 

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৪৬ এএম

সময়টা খুব কঠিন ছিল বাংলাদেশের জন্য। একদিকে বৈরী কন্ডিশন, অন্যদিকে অনেক দিন পর দলে ফেরা লাসিথ মালিঙ্গার আগুনের গোলার মতো বল। ফলাফল ব্যাটিং সহায়ক পিচেও টস জিতে ব্যাটিং করতে নামা বাংলাদেশের প্রথম ওভারেই জোড়া উইকেটের পতন। লিটন এবং সাকিব পর পর দুই বলে মালিঙ্গার শিকার হয়ে ফিরে গেছেন খালি হাতেই। 

এরপর তামিমের পালা। তবে আউট হয়ে নয়, তিনি ফিরে গেলেন কবজির হাড়ে চিড় ধরায়। চোটে গোটা টুর্নামেন্টটাই তখন শেষ তামিমের জন্য। এশিয়া কাপের শুরুটা এমন ভাবেই শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ৩ ওভার শেষে বাংলাদেশের ২ উইকেট আর রিটায়ার্ড হার্টে তামিমকে হারিয়ে টাইগারদের সংগ্রহ মাত্র ৩ রান! 

এরপর মিঠুনকে সাথে নিয়ে ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করেন মুশফিক। ধীর গতির শুরুতে দলের প্রথম বাউন্ডারী আসে ৮ম ওভারে। ১০ম ওভারে ক্যাচ তুললেও শ্রীলঙ্কান ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় জীবন ফিরে পান মুশফিক। 

আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন তিনি। কৃতিত্বটা অবশ্য মিঠুনেরও। তিনি স্পিনারদেরকে দারুণভাবে খেলে রানের চাকা সচল করে তোলেন আর মুশফিকের ওপর থেকে চাপটা সরিয়ে দেন। দু'জনে মিলে ৩য় উইকেট জুটিতে তোলেন ১৩১ রান। দুইজনেই তুলে নেন অর্ধ্বশতক। 

আশার পালে হাওয়া লাগতেই আবারও ছন্দপতন। ইনিংসের ২৬তম ওভারে ৫ চার আর ২ ছক্কায় ব্যক্তিগত ৬৩ রানে মালিঙ্গার শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন মিঠুন। পরের ২ ওভারে আপোনসো এবং মালিঙ্গার শিকার হয়ে মাহমুদুল্লাহ আর মোসাদ্দেক প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলে আবারও ব্যাকফুটে চলে যায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। 

তবে পাহাড়ের মতই অটল ছিলেন মুশফিক। উইকেটের অন্যপ্রান্তে আসা যাওয়ার খেলা চললেও অপরপ্রান্তে অবিচল ভাবে উইকেট কামড়ে থেকে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। টেলেন্ডারদের সাথে নিয়ে দুইশ'র গন্ডি পার করেন মুশফিক। দর্শকদের উপহার দেন তার ক্যারিয়ার শ্রেষ্ঠ শতক। 

মিঃ ডিপেন্ডেবল উইকেট আগলে থাকলেও তার সাথে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন জুটি বাঁধতে পারেননি টেলএন্ডারদের কেউই। মেরাজ(১৫) এবং মাশরাফি(১১) কিছুটা চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। ৪৭তম ওভারে মুস্তাফিজ রানআউট হয়ে গেলে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৯ উইকেটে ২২৯ রান। ইনজুরিতে পড়া তামিমের মাঠে আসার কোন সম্ভাবনা না থাকায় এইখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের লড়াই। কিন্তু তিনি যে তামিম। লড়াই করেই তিনি অভ্যস্থ।

ম্যান অব দ্যা ম্যাচ মুশফিক কিন্তু ম্যান অব দ্যা কান্ট্রি তামিম

তিনি আবারও ফিরলেন বাইশ গজে। ভাঙা হাতে ব্যান্ডেজ নিয়েই চলে এলেন দলের সংকটের সময়ে। নেমে তাকে একটা বল অন্তত খেলতেই হবে কারণ মুস্তাফিজ ওভারের ৫ম বলে আউট হয়েছেন। হয়ে যেতে পারে বড় কোন ইনজুরি কিংবা গোটা ক্যারিয়ার থমকে যেতে পারে একটু বেসামাল জায়গায় বল লাগলে। 

তবুও তিনি আসলেন। এক হাতেই মোকাবেলা করলেন বাউন্সারটি নিখুঁত একটি ডিফেন্সিভ শটে। ব্যস ঐ একটি ডিফেন্সিভ শটেই তিনি বাংলাদেশকে জয়ের নেশায় উজ্জীবিত করে তুললেন একটি অবিশ্বাস্য ইতিহাস রচনার মাধ্যমে। 

মুশফিকও প্রতিদান দেন বন্ধুর এই অসম সাহসী পদক্ষেপের। শেষ ১৬ বলে বাঘের ক্ষিপ্রতায় তুলে নেন মহামূল্যবান ৩২টি রান। ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসটি খেলে আউট হবার আগে মাত্র ১৫০ বলে ১৪৪ রানের একটি ক্ল্যাসিক রচনা করে ফেলেছেন তিনি। বাংলাদেশও পেয়ে যায় ২৬১ রানের একটি চ্যালেঞ্জিং স্কোর। 

লঙ্কানদের পক্ষে দুর্ধর্ষ বোলিং করে ৪ উইকেট তুলে নেন মালিঙ্গা। এছাড়াও ডি সিলভা ২টি এবং লাকমাল, থিসারা ও আপোনসো ১ টি করে উইকেট তুলে নেন। 

তামিমের লড়াইয়ের নেশা, মুশফিকের হার না মানা ক্ল্যাসিক ইনিংস- প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য এর থেকে বেশী আর কিছু দরকার ছিলনা টাইগারদের।

বোলিংয়েও দেখা গেল সেই তীব্র লড়াইয়ের ক্ষুধা। নেতৃত্বে আমাদের চিরচেনা যোদ্ধা মাশরাফি। শুরুটা করেন মুস্তাফিজ। তার শিকার মেন্ডিস।  পরের অভারেই আসেন মাশরাফি আর এসেই ফিরিয়ে দেন বিপদজনক থারাঙ্গাকে। ততক্ষণে টাইগারদের মধ্যে পেয়ে বসেছে জয়ের তীব্র ক্ষুধা। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই শুন্যতেই ফিরিয়ে দেন ডি সিলভাকে। এরপর ১০ম ওভারেই মেরাজ কুশল পেরেরাকে ফিরিয়ে দিলে শ্রীলংকার ইনিংসের মেরুদন্ড ভেঙে যায়। 

এরপর মাশরাফিরা একদম চেপে ধরে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের। যার ফলে শ্রীলঙ্কা শিবিরের তখন আসা যাওয়ার মিছিল। মাত্র ৬৯ রানেই তাদের ৭টি উইকেটের পতন ঘটে। এরমাঝে উইকেট তুলে নেন মেরাজ আর রুবেল। মাঝখানে লাকমাল কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও ইনিংসের ৩৬ তম ওভারেই মাত্র ১২৪ রানেই গুটিয়ে যায় লঙ্কানদের ইনিংস। বাংলাদেশ তুলে নেয় ১৩৭ রানের এক চিরস্মরণীয় জয়। 

একদিনের ক্রিকেটে দেশের বাইরে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। বাংলাদেশের পক্ষে মাশরাফি, মুস্তাফিজ এবং মেরাজ ২টি করে এবং সাকিব, রুবেল ও মোসাদ্দেক একটি করে উইকেট তুলে নেন। অনবদ্য ১৪৪ (১৫০) রানের ইনিংসের জন্য ম্যাচ সেরা হোন মুশফিক। 

সবাই সাহসিকতা কিংবা বীরত্বের কথা বললেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হল বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটীয় চেতনার এক আমূল পরিবর্তন। তার সাথে অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়ে একটা অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত ম্যাচ উপহার দিল টাইগাররা। জয়ের অভ্যাস আগে হলেও এতটা পরিণত খেলা আগে তেমন একটা দেখা যায়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটে। 

এ জয় দূর্দান্ত! এ জয় এক ভিন্ন স্বপ্নের বাহক! এই জয়টা সত্যিই অন্যরকম, শুধুমাত্র একটি জয়ের থেকেও অনেক বেশি প্রাপ্তির এবং অনেক বেশি স্বস্তির। স্বস্তিটা টাইগারদের ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপক্বতার জন্য। 

স্কোরলাইন:  বাংলাদেশ ২৬১ (৪৯.৩ ওভার); শ্রীলঙ্কা ১২৪ (৩৫.২ ওভার)।

ফলাফল: বাংলাদেশ ১৩৭ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা : মুশফিকুর রহিম।

About

Popular Links