Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নান্দাইলের প্রত্যন্ত গ্রামের তিন কিশোরী ফুটবলার যাচ্ছেন রোনালদোর দেশে

সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, শত কটূক্তি সয়ে, তারা লিখেছেন এক সাফল্যের গল্প। বলা হচ্ছে স্বপ্না, শিখা ও তানিশার কথা। ফুটবলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে  তাদের পর্তুগালে পাঠাচ্ছে সরকার

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২২, ০১:৩০ পিএম

দারিদ্র্যের সঙ্গে বুক চিতিয়ে লড়ে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে উঠেছেন পর্তুগীজ ফুটবল তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সে গল্প সবারই কম-বেশি জানা। প্রায় একই রকম সংগ্রামী জীবন ময়মনসিংহের অদম্য সাহসী তিন কিশোরী ফুটবলারের।

সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, শত কটূক্তি সয়ে, তারা লিখেছেন এক সাফল্যের গল্প। বলা হচ্ছে স্বপ্না, শিখা ও তানিশার কথা। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়ি এই তিন কিশোরীর।

তাদের সাফল্যগাঁথার শুরু ২০১৯ সালের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট থেকে। সেবার টুর্নামেন্টে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় জেলার নান্দাইল উপজেলার শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন তার তিনজন।

বর্তমানে তারা নান্দাইল পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

এ বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) বঙ্গমাতা নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের সেরা ৪০ খেলোয়াড়কে দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মধ্যে থেকে ১৬ জনকে বাছাই করে প্রশিক্ষণের জন্য পর্তুগালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৬ সদস্যের এই দলের মূল একাদশে রয়েছেন শিখা ও স্বপ্না। তানিশা রয়েছেন অতিরিক্ত ৫ জনের তালিকায়।

নৈপুণ্য দেখিয়ে ফুটবল রেকর্ডের বরপুত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশে ফুটবল শিখতে যাবেন নান্দাইলের মেয়েরা। এ খবরে আনন্দের বাতাস বইছে উপজেলাজুড়ে।

উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের ইলাশপুর গ্রামের কৃষক ফয়জুউদ্দিনের মেয়ে স্বপ্না আক্তার জিলি, একই ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামের টমটম চালক বিপ্লব মিয়ার মেয়ে  সিনহা জাহান শিখা এবং মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামের দিনমজুর দুলাল মিয়ার মেয়ে তানিয়া আক্তার তানিশা। 

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বড়দের খেলা দেখে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জন্মে স্বপ্নার। শুরু করেন নিয়মিত ফুটবল চর্চা। আগ্রহ দেখে স্কুলের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন উজ্জল তাকে খেলার সুযোগ করে দেন।

ঢাকা ট্রিবিউনকে স্বপ্না বলেন, ‘‘অনেক কষ্টে এই পর্যন্ত আসা। প্র্যাকটিসে আসার টাকা যোগাতে কষ্ট হয়েছে। অনেক সময় টাকার অভাবে প্র্যাকটিস করতে আসতে পারিনি। তারপরও হাল ছাড়িনি। ইচ্ছা ছিল বলেই পেরেছি। ইউরোপে প্র্যাকটিস শেষে  দেশের জন্য কাজ করতে চাই।’’ 

মাতৃহারা শিখার সংগ্রম শুরু তৃতীয় শ্রেণি থেকে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আরেকটি বিয়ে করায় নানার বাড়িতে চলে যান তিনি। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে শিখা তৃতীয়। ছোটবেলা থেকে খেলাধুলায় বেশ আগ্রহী শিখা ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেন। এমন আগ্রহ নজরে আসে প্রশিক্ষক মকবুল হোসেনের। তারই পৃষ্ঠপোষকতায় উপজেলা, জেলা, বঙ্গমাতা গোল্ডকাপসহ বিভিন্ন পর্যায়ের খেলাধুলায় অংশ নেন শিখা। ১০ কিলোমিটার গ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে প্রশিক্ষণে আসতেন তিনি। 

শিখা বলেন, ‘‘বাবা সবসময় উৎসাহ দিতেন। প্র্যাকটিসে আসা-যাওয়ার খরচ দিতেন তিনি। বাবা যে স্বপ্ন দেখতেন আজ তা পূরণের দ্বারপ্রান্তে। এখন আমার চাওয়া পর্তুগাল থেকে ফিরে দেশের হয়ে খেলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। প্রথমে যারা কটূকথা বলত, এখন তারাই আমাদের নিয়ে গল্প বলে।’’

আর কোনো বাধাই দমাতে পারেনি তানিশাকে। কানে তুলো দিয়ে কটূবাক্য এড়িয়ে হেঁটেছেন লক্ষ্যে, পেয়েছেন সাফল্য। নিজেদের থাকার ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই তানিয়া আক্তার তানিশার পরিবারের। চার সদস্যের পরিবার তাদের। 

ছোটবেলায় একবার মায়ের সঙ্গে পৌর শহরে কেনাকাটা করতে এসে চণ্ডিপাশা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেখে খেলার প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। 

ঢাকা ট্রিবিউনকে তানিশা বলেন, ‘‘খেলতে গিয়ে রোষানলে পড়েতে হয়েছে অনেকবার। মানুষের কটূকথা হজম করে আজ পর্তুগালে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। স্বপ্ন এখন জাতীয় দলের হয়ে খেলার। অস্বচ্ছল পরিবারের হাল ধরতে চাই।’’

নান্দাইল পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, ‘‘আমার বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী ফুটবল প্রশিক্ষণে পর্তুগাল যাচ্ছে, এটা গর্বের বিষয়। আমি তাদের সবসময় বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছি। তারা ভালো করুক সেই প্রত্যাশা করি।’’

About

Popular Links