Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কখনোই বিশ্বকাপ না খেলা দুর্ভাগা মহাতারকারা (পর্ব ১)

ক্লাব ফুটবলে এসব তারকাদের মাঠ মাতিয়ে রাখতে দেখলেও ফিফা বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে তাদের ফুটবল নৈপূুণ্যের সাক্ষী হতে পারেননি ফুটবলপ্রেমীরা 

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ১১:০৩ পিএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে মুখিয়ে থাকেন প্রতিটি খেলোয়াড়ই। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নিজ দেশের প্রতিনিধি হওয়ার গর্ব অনুভব করতে কে না চায়! পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তিরা বিশ্বকাপ ফুটবলে কেবলমাত্র দেশকে প্রতিনিধিত্বই করেননি, এনে দিয়েছেন সাফল্যও।

কিন্তু এমন অনেক খেলোয়াড়ও আছেন যারা ব্যক্তি পর্যায়ে অমিত প্রতিভাবান এবং সফল হলেও কখনো দুর্ভাগ্য, আবার কখনো অজানা কারণে বিশ্বকাপ ফুটবলে পা রাখতে পারেননি। ক্লাব ফুটবলে এসব তারকাদের মাঠ মাতিয়ে রাখতে দেখলেও গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে তাদের ফুটবল শৈলীর সাক্ষী হতে পারেননি ফুটবলপ্রেমীরা।

চলুন দেখে নিই ফুটবলের এমন কিছু দুর্ভাগা মহাতারকাকে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে উজ্জ্বল থাকলেও ফিফা বিশ্বকাপ যাদের ঔজ্জ্বল্য দেখতে পারেনি-

আলফ্রেডো ডি স্টেফানো (আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, স্পেন)

ফুটবলের রাজা পেলের কাছে শ্রেষ্ঠ ফুটবলারের অ্যাখ্যা পেয়েছিলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। তর্কসাপেক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ক্লাব ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় পঞ্চাশের দশকে ফুটবলের ওপর রীতিমত ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা, স্পেন এবং কলম্বিয়া তিনটি দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার পরেও বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলা হয়নি ডি স্টেফানোর।

১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর ব্লন্ড অ্যারো খ্যাত ডি স্টেফানো প্রথমে জাতীয় দল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু আলবিসেলেস্তেরা রাজনৈতিক ১৯৫০ বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সেবার ফুটবলের বিশ্বযজ্ঞে ছিলেন না প্রয়াত এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। ১৯৫৪ বিশ্বকাপেও আকাশী-সাদা শিবির অনুপস্থিত ছিল। ততদিনে কলম্বিয়ার হয়েও খেলতে শুরু করেন ডি স্টেফানো, যার কারণে জুটেছিল ফিফার নিষেধাজ্ঞাও।

আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, স্পেনের হয়ে খেললেও বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হয়নি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর/সংগৃহীত

১৯৫৮ বিশ্বকাপ আসতে আসতে স্পেনের নাগরিকত্ব পেয়ে তাদের হয়ে খেলা শুরু করেন দুবারের ব্যালন ডি অরজয়ী স্টেফানো। তবে ইউরোপের দেশটি বাছাইপর্বের বৈতরণী পার করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৬২ বিশ্বকাপে অবশ্য লা রোজাদের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ এসেছিল স্টেফানোর সামনে। তবে সেবার বাদ সাধে চোট। শেষ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র সুপার ব্যালন ডি অর জেতার পরেও কখনোই বিশ্বকাপ খেলা হয়নি ডি স্টেফানোর।

ইয়ান রাশ (ওয়েলস)

গ্যারেথ বেলের আগ পর্যন্ত নামের পাশে ২৮ গোল নিয়ে ইয়ান রাশই ছিলেন ওয়েলসের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ক্লাব ফুটবলে লিভারপুলের হয়ে দুই মেয়াদে ১৫টি মৌসুম খেলেছেন রাশ। পাশাপাশি জুভেন্টাস, নিউক্যাসেল ইউনাইটেড, লিডস ইউনাইটেডের মতো ক্লাবেও খেলেছেন এই ফরোয়ার্ড।

সে সময় গোলমুখে ইয়ান রাশের চেয়ে ভয়ংকর আর কেউ ছিলেন না। দলগতভাবে অল রেডদের হয়ে যেমন পাঁচ বার ইংলিশ লিগ এবং দুবার ইউরোপিয়ান কাপের শিরোপা রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত অর্জনে প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা তরুণ, বর্ষসেরা খেলোয়াড়, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু- কোনোটিরই অপূর্ণতা ছিল না ইয়ান রাশের।

ওয়েলসের ইতিহাসের সাবেক সর্বোচ্চ গোলদাতা ইয়ান রাশ/সংগৃহীত

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল বরাবরই ইয়ান রাশের জন্য আক্ষেপের এক জায়গা হয়ে ছিল। দুই দশকেরও দীর্ঘ পেশাদার ক্যারিয়ারে ইয়ান রাশ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ১৬ বছর। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত চারটি বিশ্বকাপের কোনো আসরেই মূলপর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে নিজের সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হয়েও বিশ্বকাপ না খেলার আক্ষেপ নিয়েই ক্যারিয়ার শেষ করতে হয় রাশকে।

বার্নড সুস্টার (জার্মানি)

ক্লাব ফুটবলে তিন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার হয়ে খেলা একমাত্র ফুটবলার হলেন বার্নড সুস্টার। ক্লাব ক্যারিয়ারের সিংহভাগ স্বাভাবিকভাবেই লা লিগায় কাটিয়েছেন এ মিডফিল্ডার। দুবার জিতে নিয়েছেন বর্ষসেরা নন স্প্যানিশ ফুটবলারের খেতাব ডন ব্যালন অ্যাওয়ার্ডও।

জাতীয় দল পশ্চিম জার্মানির হয়েও দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন সুস্টার। ১৯৮০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা পশ্চিম জার্মানি দলের অংশ ছিলেন এই মিডফিল্ডার। সেই সঙ্গে ২১ বছর বয়সেই হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড়ও। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পশ্চিম জার্মানির হয়ে সুস্টারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা বেশি দূর এগোয়নি।

দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের কারণে আলবেনিয়ার বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে একটি প্রীতি ম্যাচে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কোচ এবং ফেডারেশনের চক্ষশূল হন। সেবার যদিও কোনোরকমে ঝামেলাটা মিটে যায়। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির হয়ে ম্যাচ পরবর্তী একটি সেলিব্রেশন পার্টিতে দলের সঙ্গে যোগ না দেওয়ায় আবারও তার সঙ্গে কোচ-ফেডারেশনের দ্বন্দ্ব লাগে। তবে এবার সুস্টারের কিছু সতীর্থও তার বিরুদ্ধে চলে যান।

কেবলমাত্র বোর্ডের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হয়নি বার্নড সুস্টারের/সংগৃহীত

ক্রমাগত এসব দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে একসময় সুস্টারের জন্য জাতীয় দলের দরজা চিরতরে বন্ধই হয়ে যায়। এ জার্মানও বিশ্বকাপ না খেলেই ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন। কে জানে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দলের সঙ্গে বনিবনা হয়ে গেলে হয়ত ১৯৮৬ সালের রানার্সআপ এবং ১৯৯০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানির দলে দেখা যেত ব্লন্ড অ্যারো খ্যাত এ মিডফিল্ডারকে।

জর্জ উইয়াহ (লাইবেরিয়া)

দীর্ঘ ১৮ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে জর্জ উইয়াহ খেলেছেন মোনাকো, পিএসজি, এসি মিলান, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, মার্শেইয়ের মতো বাঘা বাঘা ক্লাবে। দলগত অর্জনের মধ্যে রয়েছে ইতালিয়ান সিরি আ, ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান, এফএ কাপের মতো শিরোপা। ইউরোপীয় ফুটবলে আফ্রিকান ফুটবলারদের মধ্যে তাকে অন্যতম সফল খেলোয়াড় বলে বিবেচনা করা হয়।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে ১৯৯৫ সালে প্রথম নন ইউরোপীয় এবং একমাত্র আফ্রিকান হিসেবে জিতে নিয়েছিলেন ব্যালন ডি অর এবং ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার। তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন আফ্রিকার বর্ষসেরা ফুটবলার হিসেবে। কখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা না জিতলেও ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে বগলদাবা করেছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব। এতসব অর্জনের জন্য জর্জ উইয়াহকে আফ্রিকার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বলে অনেকে একবাক্যে মেনে নেন।

লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ/সংগৃহীত

ক্লাব ফুটবল তাকে দুহাত ভরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বরাবরই দুর্ভাগা ছিলেন এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। জন্মেছিলেন যে লাইবেরিয়ার মতো দেশে! বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত উইয়াহ কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। জাতীয় দলের হয়ে ৬০ ম্যাচে ২২ গোল করে বিশ্বকাপ ফুটবল না খেলেই তাকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানতে হয়।

About

Popular Links