Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিশ্বকাপের আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতারা

বিশ্বকাপের বিগত আসরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তুলনামূলক অখ্যাত বা আলোচনার বাইরে থেকে এসেই কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:১৪ পিএম

চার বছরের প্রতীক্ষার পর আবারও ফিরে আসছে ফিফা বিশ্বকাপ।  “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ”-খ্যাত প্রতিযোগিতাটি শুরু হতে আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি। তবে সবার গায়ে ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের আঁচ লাগতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে বসবে বিশ্বকাপের পরবর্তী অর্থাৎ ২২তম আসর। ২০০২ সালের পর আবারও এশিয়া মহাদেশে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ নিয়ে কারোরই আগ্রহের কমতি নেই।

ফুটবল হলো গোলের খেলা। মাঠে খেলোয়াড়রা যতই শিল্পের তুলিতে দর্শকদের মাতিয়ে রাখুক না কেন, গোলই দিনশেষে ফুটবলের জয়-পরাজয়ের নির্ধারক। তাই মূলত মাঠে ফরোয়ার্ড-স্ট্রাইকারদের ওপরেই পাদপ্রদীপের আলো থাকে।

প্রতিটি বিশ্বকাপ শুরুর সময় থেকেই সর্বোচ্চ গোলদাতা কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ থাকে না। ফুটবলীয় পরাশক্তি দেশগুলোর নাম্বার নাইনদেরই সম্ভাব্য গোল্ডেন বুটজয়ীদের তালিকায় রাখা হয়। তবে বিশ্বকাপের বিগত আসরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তুলনামূলক অখ্যাত বা আলোচনার বাইরে থেকে এসেই কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার বগলদাবা করে নিয়েছেন।

চলুন তাহলে দেখে নিই কারা কারা ফিফা বিশ্বকাপের বিগত আসরগুলোতে সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব জিতেছেন-

১৯৩০: গিলের্মো স্ট্যাবিল (আর্জেন্টিনা)

বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর বসেছিল ১৯৩০ সালে, আয়োজক ছিল উরুগুয়ে। শিরোপাও জিতেছিল তারাই। তবে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছিলেন আরেক লাতিন আমেরিকান পরাশক্তি আর্জেন্টিনার গিলের্মো স্ট্যাবিল।

সেবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন স্ট্যাবিল। তিনদিন পর লাতিন আমেরিকান প্রতিবেশী চিলির বিপক্ষে জোড়া গোল করেন এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। জোড়া গোল করেছিলেন সেমিফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেও।

১৯৩০ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আর্জেন্টিনার গিলের্মো স্ট্যাবিল/সংগৃহীত

গিলের্মো স্ট্যাবিলের গোলের ধারা অব্যাহত ছিল ফাইনালেও। শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে স্বাগতিক উরুগুয়ের বিপক্ষেও গোলের দেখা পেয়েছিলেন এই স্ট্রাইকার। যদিও আলবিসেলেস্তেদের চ্যাম্পিয়ন করতে সেটি যথেষ্ট ছিল না।

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে আর কখনোই মাঠে নামা হয়নি স্ট্যাবিলের। তবে যে চার ম্যাচ সুযোগ পেয়েছিলেন, তাতেই ৮ গোল করে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে পেয়ে গেছেন অমরত্ব।

১৯৩৪: অল্ড্রিচ নেইয়েডলি (চেকোস্লোভাকিয়া)

বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় আসরে চেকোস্লোভাকিয়ার প্রথম ম্যাচেই রোমানিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেন নেইয়েডলি। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও ম্যাচের শেষদিকে গোল করে চেকোস্লোভাকিয়াকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান তিনি।

শেষ চারে হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে পশ্চিম জার্মানিকে একাই ধসিয়ে দিয়ে দলকে ফাইনালে পৌঁছে দেন নেইয়েডলি। তবে ফাইনালে গিয়ে স্বাগতিক ইতালির বিরুদ্ধে তিনি আর গোলের দেখা পাননি। চেকোস্লোভাকিয়াকেও তাই সন্তুষ্ট থাকতে হয় রানার্সআপ হয়েই।

১৯৩৪ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা চেকোস্লোভাকিয়ার অল্ড্রিচ নেইয়েডলি/টুইটার

চেকোস্লোভাকিয়াকে বিশ্বসেরা বানাতে না পারলেও চার ম্যাচে ৫ গোল করে ঠিকই ১৯৩৪ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব নিজের করে নেন অল্ড্রিচ নেইয়েডলি।

১৯৩৮: লিওনিডাস (ব্রাজিল)

বিশ্বকাপের তৃতীয় আসরে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম ম্যাচেই পোল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন লিওনিডাস। পরবর্তীতে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচেই গোলের দেখা পান এই স্ট্রাইকার। ব্রাজিলও পৌঁছে যায় শেষ চারে।

সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইতালি। অতি আত্মবিশ্বাসের কারণেই কি-না, ইতালিয়ানদের বিপক্ষে লিওনিডাসকে খেলাননি ব্রাজিল কোচ। ফলশ্রুতিতে দলের আক্রমণভাগের সেরা খেলোয়াড় ছাড়া ব্রাজিলও হেরে যায় আজ্জুরিদের কাছে।

১৯৩৮ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ব্রাজিলের লিওনিডাস/সংগৃহীত

ব্রাজিল কোচের সিদ্ধান্ত যে কত বড় ভুল ছিল, তার প্রমাণ লিওনিডাস দিয়েছিলেন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেই। সুইডেনের বিপক্ষে সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন ফ্ল্যামেঙ্গো, সাও পাওলোর মতো ক্লাবে খেলা এই স্ট্রাইকার।

মাত্র চার ম্যাচ খেলে ৭ গোল করে ১৯৩৮ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন লিওনিডাস। সেমিফাইনালে তাকে বসিয়ে না রাখলে হয়ত সেবারই সেলেসাওদের প্রথম বিশ্বকাপ জয় করা হয়ে যেতো।

১৯৫০: আদেমির (ব্রাজিল)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে প্রায় এক যুগ পর আবারও মাঠে গড়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপ ফুটবলের চতুর্থ আসরের আয়োজক ছিল সুন্দর ফুটবলের আঁতুড়ঘর খ্যাত ব্রাজিল। সেবার হট ফেবারিটও ছিল সেলেসাওরা।

টুর্নামেন্টে সেলসাওদের আক্রমণের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন আদেমির। গ্রুপপর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেন এই ফরোয়ার্ড। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে গোলহীন থাকলেও শেষ ম্যাচে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে গোলের দেখা পান তিনি।

১৯৫০ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ব্রাজিলের আদেমির/সংগৃহীত

সেবারের বিশ্বকাপে কোনো নকআউট পর্ব ছিল না। প্রথম রাউন্ডের বাধা পেরোনো চার দলকে নিয়ে মাঠে গড়ায় ফাইনাল রাউন্ড। সেখানে সুইডেনের বিপক্ষে একাই চার গোল করেন আদেমির। পরের ম্যাচে স্পেনের বিরুদ্ধেও জোড়া গোল করেন এই স্ট্রাইকার।

তবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে জাল খুঁজে পাননি আদেমির। ফলে ব্রাজিলও ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যায়। ছয় ম্যাচে ৯ গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার নিয়েই আদেমিরকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

১৯৫৪: সান্দোর কক্সিস (হাঙ্গেরি)

বিশ্বকাপের পঞ্চম আসরে গোলবারের সামনে রীতিমত তাণ্ডব চালিয়েছিলেন সান্দোর কক্সিস। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে এই হাঙ্গেরিয়ান হয়ে উঠেছিলেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকদের মূর্তিমান আতঙ্ক। ফলশ্রুতিতেও হাঙ্গেরিও ২৭ গোল করে সেবার হয়ে উঠেছিল বিপক্ষের দুঃস্বপ্ন।

১৯৫৪ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন কক্সিস। পরের ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে এই স্ট্রাইকার করে বসেন ৪ গোল। কোয়ার্টার ফাইনালে আগের বিশ্বকাপের রানারআপ ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করেন তিনি।

১৯৫৪ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হাঙ্গেরির সান্দোর কক্সিস/সংগৃহীত

সেমিফাইনালে হাঙ্গেরির প্রতিপক্ষ ছিল আরেক লাতিন আমেরিকান দেশ উরুগুয়ে। নির্ধারিত সময়ে অমীমাংসিত থাকা সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জোড়া গোল দিয়ে দলকে ফাইনালে তোলেন কক্সিস। সেই সঙ্গে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা দুই অঙ্কে নিয়ে যান তিনি।

ফাইনালে হাঙ্গেরির প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি, যাদের বিরুদ্ধে প্রথম রাউন্ডে ৪ গোল করেছিলেন কক্সিস। তবে ফাইনালে গোলের দেখা পাননি। ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স খ্যাত সেউ হাঙ্গেরিরও তাই জেতা হয়নি বিশ্বকাপ। তবে ১১ গোল করে সেই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন কক্সিসই।

১৯৫৮: জ্যাঁ ফন্টেইন (ফ্রান্স)

১৯৫৮ বিশ্বকাপকে হয়ত দর্শকরা ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয় এবং ফুটবলের রাজা পেলের উত্থানের জন্যই মনে রেখেছেন। কিন্তু সেবারের আসরে পাদপ্রদীপের আলোর পুরোটাই নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন ফ্রান্সের জ্যাঁ ফন্টেইন। ক্যারিয়ারে মাত্র একবারই বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি, আর তাতেই জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

সেবারের আসরে বলতে গেলে হেসে খেলেই গোলের ফোয়ারা ছুটিয়েছিলেন জ্যাঁ ফন্টেইন। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৬টি ম্যাচ খেলে দুটি হ্যাটট্রিক (যার মধ্যে একটি ৪ গোল) এবং দুটি ব্রেসসহ (জোড়া গোল) সর্বমোট ১৩ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার বগলদাবা করে নেন এই ফরাসি স্ট্রাইকার, যা ফ্রান্সকে তৃতীয় করতে রেখেছিল বড় ভূমিকা।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা জ্যাঁ ফন্টেইন/সংগৃহীত

জ্যাঁ ফন্টেইনই সর্বশেষ খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপের এক আসরে ১০টির বেশি গোল করতে পেরেছেন। তারপর আর কোনো ফুটবলারই বিশ্বকাপের এক আসরে নিজের গোলসংখ্যা দুই অঙ্কে নিয়ে যেতে পারেনি।

১৯৬২: ফ্লোরিয়ান আলবার্ট (হাঙ্গেরি), ভ্যালেন্তিন ইভানভ (সোভিয়েত ইউনিয়ন), দ্রাজান জেরকোভিচ (যুগোস্লাভিয়া), লিওনেল সাঞ্চেজ (চিলি), গারিঞ্চা ও ভাভা (ব্রাজিল)

১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপের আসরে যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা দেখা যায়। সেবার হাঙ্গেরির ফ্লোরিয়ান আলবার্ট, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেন্তিন ইভানভ, যুগোস্লাভিয়ার দ্রাজান জেরকোভিচ, চিলির লিওনেল সাঞ্চেজ, আর ব্রাজিলের গারিঞ্চা ও ভাভা করেছিলেন ৪ গোল।

তবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের দুই সদস্য গারিঞ্চা ও ভাভা গ্রুপপর্বে কোনো গোলের দেখা পাননি। বরঞ্চ দুই সেলেসাও ফরোয়ার্ডের সবগুলো গোলই এসেছিল কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল আর ফাইনালে।  

About

Popular Links