Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিশ্বকাপের আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতারা (শেষ পর্ব)

বিশ্বকাপের বিগত আসরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তুলনামূলক অখ্যাত বা আলোচনার বাইরে থেকে এসেই কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:৫৮ পিএম

প্রতিটি বিশ্বকাপ শুরুর সময় থেকেই সর্বোচ্চ গোলদাতা কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ থাকে না। ফুটবলীয় পরাশক্তি দেশগুলোর নম্বর নাইনদেরই সম্ভাব্য গোল্ডেন বুটজয়ীদের তালিকায় রাখা হয়। তবে বিশ্বকাপের বিগত আসরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তুলনামূলক অখ্যাত বা আলোচনার বাইরে থেকে এসেই কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার বগলদাবা করে নিয়েছেন।

আগের দুই পর্বে আমরা জেনেছিলাম ১৯৩০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপগুলোর সর্বোচ্চ গোলদাতাদের কথা। চলুন আজ তাহলে দেখে নিই কারা কারা ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপগুলোর সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব কারা জিতেছেন-

১৯৯৪: ওলেগ সালেঙ্কো (রাশিয়া) ও হ্রিস্টো স্টইচকভ (বুলগেরিয়া)

৩২ বছর পর আবারও যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতার সাক্ষী হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। তবে যে দুজন সেবার গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন তাদের কেউই ফেবারিট কোনো দলের হয়ে সেবার বিশ্বকাপ খেলেননি।

গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই ম্যাচে ব্রাজিল আর সুইডেনের কাছে হারে প্রথম রাউন্ড থেকেই রাশিয়ার বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়। সুইডিশদের বিপক্ষে এক গোল করা ওলেগ সালেঙ্কো গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ক্যামেরুনের বিপক্ষে করে বসেন ৫ গোল।

ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে ৫ গোল করার কীর্তি রয়েছে শুধুমাত্র রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোরই/টুইটার

ওলেগ সালেঙ্কোই ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার যিনি টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচে ৫টি গোল করেছেন। রাশিয়া বিদায় নিলেও ৬ গোল করে রুশ ফরোয়ার্ড ঠিকই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে টিকে থাকেন।

বুলগেরিয়ার হ্রিস্টো স্টইচকভ বাদে আর কেউই সেই বিশ্বকাপে সালেঙ্কোকে ছুঁতে পারেননি। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গোলবিহীন থাকলেও গ্রিসের বিপক্ষে পরের ম্যাচে জোড়া গোল করেন বুলগেরিয়ান স্ট্রাইকার। প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচে আগেরবারের রানার্সআপ আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও গোলের দেখা পান তিনি।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে বুলগেরিয়াকে চতু্র্থ করার পথে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন হ্রিস্টো স্টইচকভ/টুইটার

পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্বে রোমানিয়া আর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানিও স্টইচকভের গোলের ধারা আটকে রাখতে পারেনি। সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তিনি গোল পেলেও বুলগেরিয়া পরাজিত হয়। সুইডেনের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল না পাওয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর সঙ্গেই গোল্ডেন বুট ভাগাভাগি করতে হয় এই বুলেগেরিয়ান ফরোয়ার্ডকে।

১৯৯৮: ডেভর সুকার (ক্রোয়েশিয়া)

যুদ্ধবিগ্রহের ফলে বলকান রাজ্যগুলো ভেঙে যে কয়টি নতুন দেশের জন্ম হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতার আট বছর পর ১৯৯৮ সালে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ক্রোয়েশিয়ানরা।

নিজেদের অভিষিক্ত বিশ্বকাপেই তৃতীয় হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছিল ক্রোয়েশিয়া। আরে ক্রোটদের সেই স্বপ্নযাত্রার প্রধান সারথী ছিলেন ডেভর সুকার।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে অভিষেকেই ক্রোয়েশিয়াকে তৃতীয় করার পথে ৬ গোল করেছিলেন ডেভর সুকার/টুইটার

গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে জ্যামাইকা আর জাপানের বিরুদ্ধে গোল করেন সুকার। প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নিজের নামের পাশে গোল যোগ করতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড।

তবে দ্বিতীয় পর্বে রোমানিয়া, কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানি, সেমিফাইনালে ফ্রান্স আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে গোল করতে ভুল হয়নি সুকারের। ফলে নামের পাশে ৬ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটও বগলদাবা করে নেন এই ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার।

২০০২: রোনালদো (ব্রাজিল)

আগের বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর দুই বছরের হাঁটুর চোটের দুঃস্বপ্নের শোককে শক্তিতে পরিণত করেই যেন জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায় এসেছিলেন রোনালদো। ২০০২ বিশ্বকাপে রীতিমত ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্ম হয়েছিল তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সেরা এই স্ট্রাইকারের।

সেবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই তুরস্কের বিপক্ষে গোলের খাতা খুলেন রোনালদো। গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচে চীন আর কোস্টারিকা দুদলের সঙ্গেই ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার করেন জোড়া গোল।

প্রথম রাউন্ডের বিধ্বংসী ফর্মটা নকআউট পর্বেও টেনে নেন রোনালদো। দ্বিতীয় রাউন্ডে বেলজিয়াম ও সেমিফাইনালে আবারও তুরস্কের বিপক্ষে জাল খুঁজে পান ফেনোমেনন। যদিও মাঝে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোলবঞ্চিত ছিলেন তিনি।

তবে ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জোড়া গোলের মাধ্যমে ব্রাজিলকে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতিয়ে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দুঃস্মৃতি মাটিচাপা দেন রোনালদো। সেই সঙ্গে ৮ গোল করে ২০০২ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটও নিজের দখলে নেন আগের আসরের গোল্ডেন বলজয়ী সেলেসাও ফরোয়ার্ড।

২০০৬: মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি)

ক্লাব ফুটবলে তেমন বড় কোনো নাম না হলেও ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে মিরোস্লাভ ক্লোসা এক অতি পরিচিত নাম। ক্যারিয়ারে যতবার বিশ্বকাপ খেলেছেন, তার প্রতিটিতেই তিনি আশ্চর্যরকমের ধারাবাহিক ছিলেন। এই ধারাবাহিকতার বদৌলতেই বিশ্বকাপে একে একে ১৬ বার জালে বল জড়িয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন এই স্ট্রাইকার।

ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ২০০৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে কোস্টারিকার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন ক্লোসা। পরের ম্যাচে জন্মভূমি পোল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে গোলের দেখা না পেলেও গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে আবারও জোড়া গোল করেন এই জার্মান ফরোয়ার্ড।

ঘরের মাঠে অনুষ্ঠেয় ২০০৬ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটজয়ী জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা /টুইটার

ক্লোসা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের ফর্মটা নকআউট পর্বে টেনে নিতে পারেননি। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ব্যতিত দ্বিতীয় রাউন্ডে সুইডেন, সেমিফাইনালে ইতালি কিংবা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে পর্তুগালের বিরুদ্ধে গোলবঞ্চিত ছিলেন এই কিংবদন্তি।

তবে তাতে অবশ্য গোলসংখ্যার দিক থেকে ক্লোসাকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। বিশ্বকাপ শেষে তাই ৫ গোল করা জার্মান স্ট্রাইকারের হাতেই ওঠে গোল্ডেন বুট।

২০১০: টমাস মুলার (জার্মানি)

১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতির দাবিদার ছিলেন একাধিক ফুটবলার। ২০১০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালিস্ট ছিল স্পেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি আর উরুগুয়ে। সেই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতারাও এসেছিলেন তাদের দল থেকেই।

প্রথমবারের মতো স্পেনকে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি এনে দিতে লো রোজাদের হয়ে ৫ গোল করেছিলেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ডেভিড ভিয়া। সমানসংখ্যক গোল করে ১৯৭৮ সালের পর আবারও নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে নিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন ডাচ ফরোয়ার্ড ওয়েসলি স্নাইডার।

জার্মানিকে টানা তৃতীয়বারের মতো তৃতীয় করতে ৫ গোল করে বড় অবদান রেখেছিলেন টমাস মুলার। অন্যদিকে, ৪০ বছর পর উরুগুয়েকে শেষ চারের তোলার মূল কারিগর হিসেবেও সেই আসরে ৫ গোল করেছিলেন সেবারের গোল্ডেন বলজয়ী ডিয়েগো ফোরলান।

২০১০ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতা জার্মানির টমাস মুলার/টুইটার

তবে নিজে ৫ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের তিন গোলের সরাসরি অবদান রেখেছিলেন মুলার। বাকি তিনজনের গোলসংখ্যা সমান হলেও তারা সতীর্থদের দিয়ে করাতে পেরেছেন মাত্র এক গোল। তাছাড়া, বাকিদের চেয়ে মাঠেও কম সময় থেকেই সমানসংখ্যক গোল করেছিলের মুলার। তাই গোল্ডেন বুটো যায় তরুণ জার্মান ফরোয়ার্ডের ঝুলিতেই।

২০১৪: হামেস রদ্রিগেজ (কলম্বিয়া)

৩৬ বছর পর ২০১৪ সালে আবারও দক্ষিণ আমেরিকায় বসেছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। কনমেবলের অধীন লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর সামনে তাই ছিল নিজেকে প্রমাণের বড় সুযোগ।

কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ সেই সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন বৈকি। মূল পজিশন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও ২০১৪ বিশ্বকাপে যেন গোলশিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি।

২০১৪ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ/টুইটার

গ্রুপপর্বে গ্রিস, আইভরি কোস্ট ও জাপানের সঙ্গে তিন ম্যাচেই গোলের দেখা পেয়েছিলেন হামেস। উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন এই কলম্বিয়ান। এর মধ্যে হামেস প্রথম গোলটি করেছিলেন ২৩ মিটার দূর থেকে দর্শনীয় এক ভলিতে, যা সেই বছরের সুন্দরতম গোল হিসেবে পুসকাস অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে কলম্বিয়া হেরে গেলেও সেই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদ করে সেই বিশ্বকাপে নিজের ৬ষ্ঠ গোল করেন হামেস। পরবর্তীতে তাকে আর কেউ টপকাতে না পারায় এই তরুণ কলম্বিয়ানই জিতে নেন গোল্ডেন বুট।

২০১৮: হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড)

মাত্র ২৫ বছরেই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিলেন হ্যারি কেইন। তবে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপকে ঠিকই স্মরণীয় করে রেখেছিলেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।

টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচেই তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন কেইন। পরের ম্যাচে পানামার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। এর মাধ্যমে জিওফ হার্স্ট এবং গ্যারি লিনেকারের পর তৃতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব অর্জন করেন কেইন।

২০১৮ বিশ্বকাপে ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন/টুইটার

গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে কেইন অবশ্য বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গোলবঞ্চিত ছিলেন। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়ার সঙ্গে পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদ করে গোলের ধারায় ফেরেন এই ফরোয়ার্ড।

বিশ্বকাপের বাকি অংশে অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেন, সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলের দেখা পাননি হ্যারি কেইন। কিন্তু তার আগে যে ৬টি গোল করেছিলেন সেটিই এই স্ট্রাইকারের গোল্ডেন বুট জয়ের জন্য ছিল যথেষ্ট।

About

Popular Links