Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টিকিটাকাকে ফিরতি টিকিট ধরিয়ে দিলো মরক্কো

 পেনাল্টি শুটআউটে স্প্যানিশদের ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখলো মরক্কো

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:২২ এএম

কাতার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের টাইব্রেকার পর্বের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুতির জন্য এক বছরেরও বেশি সময় আগে ক্লাব ফুটবলের অনুশীলনে এক হাজার পেনাল্টি চর্চার তাগিদ দিয়েছিলেন স্পেন কোচ লুইস এনরিকে। মরক্কোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেই পেনাল্টি শুটআউটের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হলো স্প্যানিশদের।

টাইব্রেকারের জন্য দলের খেলোয়াড়রা এনরিকের বলা উপদেশ অনুযায়ী পেনাল্টি অনুশীলন করেছিলেন কি-না কে জানে। তবে করলেও তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। টাইব্রেকারে একে একে স্পেনের পাবলো সারাবিয়া, কার্লোস সোলার এবং অধিনায়ক সার্জিও বুসকেটস লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হন। উল্টো দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক বনে গেলেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু।

ফলে পেনাল্টি শুটআউটে লা রোজাদের ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখলো মরক্কো। এর মাধ্যমে ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২) এবং ঘানার (২০১০) পর চতুর্থ আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলো আটলাস লায়নরা। শেষ আটে পর্তুগাল কিংবা সুইজারল্যান্ডের মোকাবিলা করবে আফ্রিকান দেশটি।

গ্রুপপর্বে জাপানের কাছে পরাজিত হওয়া ম্যাচ থেকে একাদশে পাঁচটি পরিবর্তন এনে মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) কাতারের এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে মরক্কোর মুখোমুখি হয় স্পেন। ম্যাচের শুরু থেকেই স্বভাবসুলভ বলের দখল রেখে আক্রমণ শানানোর চেষ্টা করে লা রোজারা। যদিও ম্যাচে প্রথমে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগটা এসেছিল মরক্কোর সামনে। তবে ১২ মিনিটে স্পেনে জন্ম নেওয়া আশরাফ হাকিমির ফ্রি-কিক ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।

সংগৃহীত ছবি

২৫ মিনিটে অবশ্য নিজেদের ভুলে পিছিয়ে পড়তে পারতো মরক্কো। যদিও আফ্রিকান দেশটির ভুল পাসে স্পেনের ফেরান তোরেস বল পেয়ে বাড়ান দানি ওলমোর উদ্দেশে। ডি-বক্সের মাঝে ওলমোর শট মরক্কান গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনুর হাত ছুঁয়ে ক্রসবারে লাগলেও তার আগেই লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তোলেন। মিনিট দুয়েক পর লেফব্যাক জর্দি আলবার বাড়ানো বল ধরে মরক্কোর গোলরক্ষককে একা পেয়েছিলেন মার্কো অ্যাসেন্সিও। তবে দুরূহ কোণে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড লক্ষ্যে না রাখতে না পেরে বল মারেন জালের পাশে।

৩৩ মিনিটে প্রথমবারের মতো স্প্যানিশ রক্ষণভাগের পরীক্ষা নেয় আটলাস লায়নরা। ফেরান তোরেসের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নেন মরক্কান লেফটব্যাক মাজারুই। তবে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন সেটি ঠেকালেও প্রথম দফায় তালুবন্দি করতে পারেননি। যদিও হাত ফসকানোর পর খুব দ্রুতই সেটি নিজের আয়ত্বে নেন সিমন।

প্রথমার্ধের শেষদিকে হঠাৎ করেই গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আফ্রিকান দেশ্যটি। ৪৩ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে হাকিমি স্পেনের ডি-বক্সে ক্রস ফেললেও সেটি ক্লিয়ার করেন স্প্যানিশ অধিনায়ক সার্জিও বুসকেটস। তবে পুরোপুরি বিপদমুক্ত না হওয়ায় বল এসে যায় মরক্কোর সোফিয়ান বুফালের পায়ে। তার ক্রস থেকে ফাঁকা জায়গায় হেড করেও বলটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি নায়েফ আগের্দ। প্রথমার্ধে বল দখলে এগিয়ে থাকলেও প্রতিপক্ষের গোলমুখের লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে পারেনি স্পেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর যা এই প্রথম।

টাইব্রেকারে স্পেনের কার্লোস সোলারের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিচ্ছেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু/এএফপি

গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধের খেলাও কিছুটা ম্যাড়ম্যাড়েভাবে এগোতে থাকে। যদিও এই সময়েও বল দখলে আফ্রিকান দেশটির চেয়ে এগিয়ে ছিল স্পেন। তবে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ত্রাস ছড়ানো কিংবা গোলের পরিষ্কার সুযোগ সৃষ্টি- কোনোটাই করতে পারছিল না ২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা। স্পেন কোচ লুইস এনরিকে মার্কো অ্যাসেন্সিওর জায়গায় গ্রুপপর্বের প্রতিটি ম্যাচেই গোল পাওয়া আলোভারো মোরাতা, পাবলো গাভির পরিবর্তে কার্লোস সোলার এবং ফেরান তোরেসের বদলে নিকো উইলিয়ামসকে নামালেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিলো না।

ম্যাচের ৭০ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা আলভারো মোরাতার দিকে বল বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন দানি ওলমো। তবে মরক্কোর নায়েফ আগের্দ তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ান। ৮০ মিনিটে ডান দিক থেকে নিকো উইলিয়ামস ডি-বক্সে দারুণ ক্রস ফেললেও প্রতিপক্ষের কড়া পাহারায় থাকার কারণে শট নিতে পারেননি দানি ওলমো। মিনিট ছয়েক পর গোলের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে মরক্কোও। ডান দিক থেকে হাকিম জিয়েখের ক্রসে ওয়ালিদ ছেদদিরা শটে নিলেও তাতে জোর না থাকায় উনাই সিমনের সেভ করতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। 

ম্যাচ যখন নিশ্চিত অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন হঠাৎ গোলের সুযোগ পেয়ে যায় স্প্যানিশরা। দানি ওলমোর ক্রসে কোন স্প্যানিশ খেলোয়াড় মাথা ছোঁয়ানোর আগেই কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু। কর্নার থেকে লাপোর্তে হেড করলেও তা মরক্কোর জমাট রক্ষণভাগের কাছে তা পাত্তা পায়নি। ফলে নির্ধারিত সময় শেষে ম্যাচ গোলশূন্য থাকায় দ্বিতীয়বারের মতো কাতার বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।


টাইব্রেকারেশ জয়সূচক পেনাল্টি নিচ্ছেন মরক্কোর আশরাফ হাকিমি/রয়টার্স

অতিরিক্ত সময়ের শুরু থেকেই গোলের জন্য মরিয়া হয়ে খেলতে থাকে স্পেন। তবে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে গোলের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিল মরক্কো। ১০৪ মিনিটে চেদ্দিরার কাছ থেকে বল পেয়ে যান উনাহি। তার সামনে ছিলেন শুধু স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমন। কিন্তু সিমনের বরাবর শট মারলে গোলবঞ্চিত হয় আফ্রিকান দেশটি। 

অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে মাত্র মিনিট তিনেক আগে মাঠে নামা স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড পাবলো সারাবিয়া গোলের দেখা প্রায় পেয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু দুরূহ কোণ থেকে সারাবিয়ার শট পোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। রেফারি এরপর শেষ বাঁশি বাজিয়ে দিলে দ্বিতীয়বারের মতো কাতার বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়।

টাইব্রেকারে প্রথমে শট নেওয়ার সুযোগ পায় মরক্কো। স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমনকে ফাঁকি দিয়ে বিপরীত দিকে বল জালে জড়িয়ে দেন আব্দেলহামিদ সাবিরি। এরপর স্পেনের পক্ষে প্রথম শট নিতে আসেন পাবলো সারাবিয়া। তার নেওয়া শট ইয়াসিন বোনু বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকাতে না পারলেও পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

মরক্কোর দ্বিতীয় শট থেকে হাকিম জিয়েখ দারুণভাবে লক্ষ্যভেদ করলে চাপে পড়ে স্পেন। সেই চাপ আরও বাড়ে যখন স্পেনের পক্ষে নেওয়া দ্বিতীয় শটে ইয়াসিন বোনুর সেভে কার্লোস সোলারও গোল করতে ব্যর্থ হন। মরক্কোর নেওয়া তৃতীয় শটটিতে বদর বানুনির পেনাল্টি উনাই সিমন ঠেকিয়ে দিলে ম্যাচে ফেরার আশা টিকে থাকে স্পেনের।

তবে স্পেনের অধিনায়ক সার্জিও বুসকেটস নিজেই সেই সুযোগকে গলা টিপে হত্যা করেন। বর্ষীয়ান এই মিডফিল্ডারের নেওয়া দুর্বল শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকান বোনু। ফলে মরক্কোর সামনে নতুন ইতিহাস রচনার দ্বার খুলে যায়। চতুর্থ শটে জন্মভূমির বিরুদ্ধে লক্ষ্যভেদ করে আশরাফ হাকিমি সেই নতুন ইতিহাসের জন্ম দেন।

চতুর্থ আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার উদযাপন মরক্কোর/এএফপি 


About

Popular Links