Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তালেবানের ‘খাঁচা থেকে বেঁচে’ দুই বোনের স্বপ্নের পথে যাত্রা

২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখল করলে দুই বোনের সাইক্লিং ক্যারিয়ারও হুমকিতে পড়ে যায়

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৩ পিএম

স্বপ্নের শুরুটা ২০১৭ সালে। আফগানিস্তানের ফারইয়াব প্রদেশে স্থানীয়ভাবে সাইকেল রেস দেখে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুই বোন ইয়ুলদুজ হাশিমি ও ফারিবা হাশিমি। রক্ষণশীল দেশটিতে নারী হয়ে পেশাদার সাইক্লিস্ট হওয়ার স্বপ্ন ছিল বেশ দুরূহ। তবে তাদের স্বপ্ন এখন বাস্তব। যদিও এই স্বপ্নপূরণের পথে তাদের পেরোতে হয়েছে লম্বা এক কণ্টকাকীর্ণ পথ। মুক্ত হতে হয়েছে তালেবানের “খাঁচা” থেকে।

এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে প্রতিবেশীর সাইকেল ভাড়া করে কয়েক ঘণ্টার অনুশীলনে সাইকেল চালানো শিখে ফেলেন তারা।

তবে ওই সময় রক্ষণশীল সমাজের কারণে সবাইকে জানিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি তাদের। পরিবারকে না জানিয়ে, নাম পাল্টে, লম্বা পোশাক ও সানগ্লাস চোখে দিয়ে রেসে অংশ নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় হন তারা।

এরপর শুধু জয়ের পালা। একের পর এক রেস জিততে শুরু করলে একসময় বিষয়টি জেনে যায় পরিবারও। ফারিবা বলেন, “শুরুতে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সাইকেল চালানো থামাতে বলে। আমরা হাল ছেড়ে দিইনি। গোপনে সাইকেল চালাতে থাকি।”

তবে পরিবার বাধা দেয়নি তাদের। দুই বোন জানান, “ওই সময় পরিবার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করলেও সাইকেল চালানোকে সমর্থন করেছেন।”

কিন্তু এটি মেনে নেয়নি রক্ষণশীল সমাজ। মানুষ তাদেরকে প্রতিদিনই বিরক্ত করত। এমনকি মেয়ে সহপাঠীরাও সাইকেল চালানো নিয়ে তাদের বিরক্ত করত। ফারিবা বলেন, “সেখানে বেশকিছু হুমকি ছিল। মানুষজন গাড়ি ও রিকশা দিয়ে তাদের আঘাত করতে চাইত।”

ইয়ুলদুজ হাশিমি ও ফারিবা হাশিমি/সংগৃহীত


কিন্তু দুই বোনই আফগানিস্তানের জাতীয় দলে ডাক পেলে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।

ইয়ুলদুজ বলেন, “আমরা শুধু চাইতাম রেসে জিততে। এরপর যেদিন জাতীয় পর্যায়ের ডাক এলো, আমি সেই দিনটির কথা ভুলতে পারব না। আমার মনে হচ্ছিল আমি বিশ্বজয় করেছি।”

ফারিবা যার বয়স এখন ১৯ বছর, সেদিনের কথা স্মরণ করে বিবিসি স্পোর্টসকে তিনি বলেন, “এর অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন পাখির মতো উড়ছি।”

২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান। ওই সময়  ক্রীড়াক্ষেত্র ও গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। নারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার দরজাও। এছাড়া মাহরাম ছাড়া দূরে ভ্রমণ, পার্কে প্রবেশও নিষিদ্ধ হয়ে যায় নারীদের।

ওই সময় দুই বোনের সাইক্লিং ক্যারিয়ারও হুমকিতে পড়ে যায়। তবে তারা হাল ছেড়ে দেননি। তারা জানতেন, ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে হলে তাদের আফগানিস্তান ছাড়তে হবে।

স্বপ্নের পথে হাঁটতে দুই বোন একসময় যোগাযোগ করেন ১৯৯৭ সালে সাইক্লিং জগতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালীয় নারী সাইক্লিক আলেক্সান্দ্রা কাপ্পেলোত্তোর সঙ্গে। ২০২১ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তিনি কাবুল গিয়েছিলেন। সেখানেই দুই বোনের সঙ্গে আলেক্সান্দ্রার সাক্ষাৎ হয়।

সেই পরিচয়ের সুবাদে দুই বোন আবারও আলেক্সান্দ্রার সঙ্গে মেইলে যোগাযোগ করে সাহায্য চান। কাপ্পেলোত্তো তাদের শঙ্কার বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘ ও ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

তিনি বলেন, “তারা সাহায্য চেয়েছিল। তাদের জীবন বিপদাপন্ন। এটিই স্বাভাবিক যে তাদের সাহায্য করা। পরে আলেক্সান্দ্রা কাপ্পেলোত্তোর চেষ্টায় ইতালীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে নুরিয়া মোহাম্মদি, জাহরা রেজাই ও আরেজো সারওয়ারি এই তিন নারী সাইক্লিস্টসহ দুই বোন ইয়ুলদুজ হাশিমি ও ফারিহা হাশিমি কাবুল ছাড়ার ফ্লাইটে ওঠেন।”

এই নারী সাইক্লিস্টদের জন্য এয়ারপোর্টের অভিজ্ঞতা ছিল বিভ্রান্তির। কারণ তারা জানেন না, আদৌ কবে আবার তাদের পরিবারের সঙ্গে তারা দেখা করতে পারবেন।

ফারিবা বলেন, “আমি কখনোই ভাবিনি যে আমি একজন শরণার্থী হব। কখনোই ভাবিনি আমাকে দেশ ছাড়তে হবে।”

বর্তমানে কাপ্পেলোত্তোর সহায়তায় তারা থাকছেন ইতালির উত্তরে ভেনেতোর এক পাহাড়ি অঞ্চলে। এলাকাটি সাইক্লিস্টদের জন্য খুবই জনপ্রিয়। কাপ্পেলোত্তো তাদের জন্য নতুন সাইকেল ও পেশাদার কোচেরও ব্যবস্থা করেছেন। ফারিবার মতে কাপ্পেলোত্তো একজন ইতালিয়ান হিরো। ফারিবা বলেন, “তিনি আমাদের মায়ের মতো।”

তালেবানের খাঁচা থেকে বেরিয়ে এখন চমৎকার সময় কাটাচ্ছেন দুই বোন। তবে তাদের মনে শঙ্কা, হয়তো আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হবে না!

About

Popular Links