Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পাঠকের কলাম : আমার চোখে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ 

পাহাড়সম চাপ নিয়ে সাকিবের নিখুঁত ক্যাপ্টেন্সি; মিরাজ-শান্তদের দুর্দান্ত নৈপুণ্য

ঢাকা ট্রিবিউন পাঠকের চোখে এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৫৪ পিএম

ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৩ শুরুর আগেই বাংলাদেশ দলকে ঘিরে শুরু হয় আলোচনা।

তামিম ইকবালবিহীন বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা হলে দেশব্যাপী তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। সমালোচনার সবচেয়ে সুচারু তীর তাক করা হয় ক্যাপ্টেন সাকিব আল হাসানের দিকে। এই অবস্থায় পাহাড়সম চাপ ও সমালোচনাকে সঙ্গী করে ভারতে পৌঁছে সাকিববাহিনী।

বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালাতে। প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান যাদের সাথে আমাদের অর্জনের কিছু নেই কিন্তু হারানোর আছে সবটুকুই।

অবাক করা তথ্য হলো, ১৭ বছর পর ভারতের মাটিতে কোন আন্তর্জাতিক ওয়ানডে (ওডিআই) ম্যাচ খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের একাদশের দুই তিনজন ছাড়া বাকিদের ভারতের মাটিতে খেলারই অভিজ্ঞতা নেই। অন্যদিকে আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তাদের হোম ভেন্যু হিসেবে ভারতের গ্রাউন্ড ব্যবহার করছে, পাশাপাশি তাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড় নিয়মিত আইপিএল খেলে।

সকালে টসে জিতে শুভ সূচনা করে বাংলাদেশ। ধর্মশালা তথা ভারতের পিচে সাধারণত বোলাররা তেমন সুবিধা পায় না। যেহেতু সকালে খেলা তাই দিনের শুরুতে পেসাররা কিছু মুভমেন্ট ও বাউন্স পেতে পারে এই চিন্তা থেকে সাকিব টসে জিতে ফিল্ডিং নেয়।

খেলা শুরু হলে আফগান ব্যাটাররা পেসারদের বিপক্ষে দৃঢ় ও সাবধানী শুরু করলে টস জিতে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটা বুমেরাং মনে হতে থাকে। ধর্মশালার আউটফিল্ড এর বালি পেসারদের কাজটা আরও কঠিন করে দেয়। ততক্ষণে মনে হতে থাকে ৮ জন ব্যাটসম্যান না নিয়ে একজন বাড়তি স্পিনার নেওয়া হলে ভালো হতো। ব্যাপারটা ধরতে পেরেই ছয় ওভার শেষেই  নিজেকে বোলিং আক্রমণে নিয়ে আসেন সাকিব। 

নিজের করা দ্বিতীয় ও দলের নবম ওভারে আফগানিস্তানের দলীয় ৪৭ রানের মাথায় ইব্রাহিম জাদরানকে আউট করে দলকে কাংখিত ব্রেকথ্রু এনে দেন। বারবার সুইপ করতে দেখে অফস্ট্যাম্পের অনেক বাইরে বল দিয়ে জাদরানকে একপ্রকার ফাঁদে ফেলেই ডিপস্কয়ার লেগে নবাগত তামিমের ক্যাঁচে পরিণত করেন সাকিব।

আবারো যখন জুটি জমে আফগানদের ইনিংস থিতু হয়ে যাচ্ছে ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির সাকিব। ষোলোতম ওভারে রহমত শাহকে মিডঅনে লিটনের ক্যাচ বানিয়ে ফেরান সাকিব। বোলিং পরিবর্তনে আজ সাকিব ছিলেন দুর্দান্ত। মিরাজ মেহেদী ছিলেন শুরু থেকেই যথেষ্ট হিসেবি ও অভ্রান্ত। ২৫তম ওভারে হাসমত উল্লাহকে আউট করে মিরাজের শুরু। ইনিংসের শুরুতে যে পেসাররা ছিল নিরীহ তাদেরই সাকিব দুর্দান্ত চেইঞ্জ করে কার্যকর করে তোলেন। মিরাজের স্ট্রাইকের ঠিক পরের ওভারে মোস্তাফিজ শিকার করেন বাংলাদেশের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত উইকেট রহমতুল্লাহ গুরবাজকে।

গুরবাজ ফিরে গেলে বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি নেমে আসে। ২৯তম ওভারে আবারো সাকিবের স্ট্রাইক। এবার নাজিবুল্লাহ জাদরানকে চমৎকার এক লেন্থ বলে বোকা বানিয়ে সরাসরি বোল্ড করেন ক্যাপ্টেন কুল।

আবারও বোলিং চেইঞ্জ করে তাসকিনকে আক্রমনে আনেন সাকিব। তাসকিনের চমৎকার ভিতরে ঢুকতে থাকা ইনসুইংয়ে ইনসাইড এজ হয়ে স্ট্যাম্প হারান আফগানদের ব্যাটিংয়ে অন্ততম ভরসা মোহাম্মদ নবী। খেলা ততক্ষণে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। মুহূর্তেই ১১২/২ থেকে  আফগানিস্তান ইনিংস পরিণত হয় ১২৬/৬ এ।

রশিদ খান ও আজমতউল্লাহ ওমরজাই কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ৩৫তম ওভারে আইপিএলে ব্যাটিংয়ে মাঝেমধ্যে বিপদজ্জনক হয়ে ওঠা রশিদকে সরাসরি বোল্ড করে ফেরান মিরাজ। পাশাপাশি শরীফুলও এই স্পেলে হয়ে ওঠেন আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী। আজমতউল্লাহ ওমরজাইকে তার ব্যক্তিগত ২২ রানের ছোট ক্যামিওতে বোল্ড করে থামালে আফগানদের রান দাঁড়ায় ১৫৬/৮-এ।

আবারও মুজিবকে সরাসরি বোল্ড করলে পরের ওভারেই ফেরায় মিরাজ। মিরাজ শরীফুলের যৌথ স্ট্রাইকে আফগান ব্যাটিং লেজ দাঁড়াতেই পারেনি। সাকিবও নিজেকে আর আক্রমণে আনার প্রয়োজন বোধ করেননি। একসময় মনে হয়েছিল সাকিবের আরেকটা ফাইফার হতেই পারে আজকে। কিন্তু এটা যে ক্যাপ্টেন সাকিব! দলের প্রয়োজনটাই আগে। ৩৮ তম ওভারের শুরুতেই ১৫৬-তেই গুটিয়ে যায় আফগানদের ইনিংস।

১৫৭ রানের ছোট্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে নিয়মিত ওপেনার লিটন দাস ও তানজিদ তামিমকেই শুরুতে পাঠায় বাংলাদেশ। ইনিংসের পঞ্চম ওভারে দলীয় ১৯ রানের মাথায় লিটন দাস ফারুকিকে পাঞ্চ করলে বল যায় পয়েন্টে নাজিবুল্লাহ জাদরানের হাতে। তানজিদ তামিম রান নেওয়ার চেষ্টা করলে নাজিবুল্লাহর সরাসরি থ্রোতে দলীয় ১৯ রানে ও ব্যক্তিগত ৫ রানে হারান নিজের উইকেট। আফগানিস্তানের সঙ্গে আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করা মিরাজকে ওয়ানডাউনে পাঠান সাকিব।  

মিরাজকে হয়তো আবারও ওপেনিংয়েই নামানো হতো। কিন্তু গোপন পরিকল্পনা অনেক আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আর স্কোরবোর্ডে কম রান থাকায় আস্থা রাখা হয়েছিলো নিয়মিত ওপেনারদের উপরেই।এরপর দলীয় ২৭ রানে ফারুকির বল ব্যাটে লেগে উইকেট হারান লিটন দাস। বাংলাদেশ শিবিরে কিছুটা চাপ নেমে আসে। উইকেটে আসেন নাজমুল হোসেন শান্ত। শান্ত-মিরাজের সাবলীল ব্যাটিংয়ে ৯৭ রানের পার্টনারশিপ তৈরি হলে বাংলাদেশ শিবিরের সব শঙ্কা দূর হয়।

ব্যক্তিগত ৫৭ রানের মাথায় নাভিন-উল-হকের বলে মিরাজ মিড অফে তুলে মারতে গেলে রহমত শাহ লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত ক্যাচে পরিনত করলে মিরাজের অসাধারণ ইনিংস সমাপ্ত হয়। এরপর সাকিব উইকেটে এলে শুরু হয় শুধু জয়ের অপেক্ষা। ব্যক্তিগত ১৪ রান ও দলীয় ১৪৬ রানে সাকিব আউট হয়ে ফিরলেও শান্ত ও মুশফিক আর কোনো উইকেট না খুইয়ে ১৫.২ ওভার বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করেন। এর মাঝে ৮৩ বলে ৩ চার ও ১ ছয়ে ৫৯ রানের চাপমুক্ত ইনিংস খেলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। 

ব্যাটে বলে অসাধারণ নৈপুণ্যে প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন মিরাজ। ওয়ানডাউনে গত বিশ্বকাপের সেরা পারফর্মার সাকিব দলের প্রয়োজনে মিরাজকে জায়গা করে না দিয়ে নিজে ব্যাটে এলে হয়তো নিজের ঝুলিতে ভরতে পারতেন আরেকটি ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার। কিন্তু আবারও বলতে হয়, এ যে ক্যাপ্টেন সাকিব। যার চিন্তা শুধু দলকে ঘিরেই।

তাই অসাধারণ জয়েই বিশ্বকাপ ২০২৩ শুরু করলো টাইগাররা।

আগামী ১০ অক্টোবর ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে একই মাঠেই ইংল্যান্ড বধের অপেক্ষায় এখন টাইগাররা। শুভকামনা সাকিববাহিনীর জন্য। স্বপ্ন তো দেখাই যায়, তাই না?

নূরুল আমিন কাজল, ম্যানেজার (এসপিও) অগ্রণী ব্যাংক, লাকসাম শাখা। তিনি পেশায় ব্যাংকার হলেও আপাদমস্তক ক্রিকেট অনুরাগী 

About

Popular Links