• শুক্রবার, এপ্রিল ০৩, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৫৩ দুপুর

মেসিকে দেখতে সাইকেলে চেপে রাশিয়ার পথে যাত্রা

  • প্রকাশিত ০২:৩৫ দুপুর জুন ২১, ২০১৮
francis-1-1529569284296.jpg
সাইকেল নিয়ে ক্লিফিন ফ্রান্সিস

“আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক এবং লিওনেল মেসি আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়, আমি তাঁকে পুজো দেই। আমার স্বপ্ন তাঁর সঙ্গে দেখা করা এবং আমার সাইকেলে তার স্বাক্ষর নেয়া”

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বাসায় যখন বসে ছিলেন ক্লিফিন ফ্রান্সিস। তার এক বন্ধু এসে জিজ্ঞেস করল যে সে এবারের বিশ্বকাপ দেখতে যাবে কিনা।

“অবশ্যই”, বলে উঠলেন ফ্রান্সিস। “দরকার হলে রাশিয়া ভ্রমণে বের হব এই মহা-আয়োজন দেখতে”। 

সেটা ছিল গত বছরের অগাস্টের কথা। কীভাবে কেরালা থেকে বিমানের টিকেট কেনার টাকা যোগাড় করবেন তা নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না ফ্রান্সিসের। পেশায় তিনি একজন ফ্রিল্যান্স গণিত শিক্ষক যার প্রতিদিনের আয় ৪০ ডলার।

“আমি চিন্তা করে দেখলাম রাশিয়া যাওয়ার মত টাকা যোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কী করা যায় তাহলে? সবচেয়ে কম খরচে ভ্রমণের উপায় কী হতে পারে? ভেবে দেখলাম, সাইকেলই হচ্ছে একমাত্র উত্তর।”

তার বন্ধুরা তাকে বিশ্বাস করতে পারে নি। কিন্তু ফ্রান্সিস তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল।

ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে, এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু করেন ক্লিফিন ফ্রান্সিস। প্রথমে বিমানে করে দুবাইতে যান, সেখান থেকে ফেরিতে করে ইরানে। ইরান থেকে প্রায় রাশিয়ার রাজধানীর দূরত্ব ২৬০০ মাইলেরও (৪২০০ কিমি.) বেশি। 

আর এই যাত্রার পুরষ্কার? আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির দেখা পাওয়ার সুযোগ।

“আমার সাইকেল চালাতে ভাল লাগে আর আমি ফুটবলের জন্য পাগল। আমি শুধু এই দুটি নেশাকে এক সুতোয় বেঁধেছি”, বলছিলেন ফ্রান্সিস। 

প্রথমে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল তার। তবে ভারত পাকিস্তানের বৈরি সম্পর্কের ঝুঁকিতে এই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয় তাকে।

‘ফুটবল আর সিনেমা’

তিনি বলেন, “পরিকল্পনার পরিবর্তন আনায় আমাকে অনেক টাকা গুনতে হয়েছে। আমি দুবাইতে আমার সাইকেলটি নিয়ে যেতে পারি নি। ফলে আমাকে নতুন আরেকটি সাইকেল কিনতে হয় যার দাম ছিল ৭০০ ডলার। এরকম লম্বা যাত্রার জন্য এই ধরণের সাইকেল খুবই যে ভাল তা না, কিন্তু এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।”

কিন্তু এই সাময়িক প্রতিবন্ধকতা অল্প সময়ের মধ্যেই ভুলে যান তিনি, যখন ১১ মার্চ প্রবেশ করেন ইরানের ‘বন্দর আব্বাস’-এ।

“এটা বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশ এবং মানুষজন ভীষণ অতিথিপরায়ণ। আমি সেখানে ৪৫ দিন ছিলাম অথচ হোটেলে থেকেছি মাত্র ২ দিন।

ফ্রান্সিস বলেন, তার কাছে প্রতিদিনের জন্য খরচ করার মতো মাত্র ১০ ডলার ছিল। কিন্তু তিনি ইরানের যেখানেই গেছেন, মানুষজন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাদের বাড়িতে থাকার জন্য আর আপ্যায়ন করেছে খাবার।

ইরানীদের সঙ্গে

তিনি বলেন, “ইরানের ব্যাপারে আমার ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। আমি উপলব্ধি করলাম যে ভূরাজনীতির উপর ভিত্তি আপনার কখনোই একটি দেশ সম্পর্কে ধারণা করে ফেলা ঠিক না।”

ইরানের অসাধারণ ভূমির বৈচিত্রও তার স্পষ্টভাবে মনে পড়ছিল।

“ইরানের গ্রামাঞ্চলের অপূর্ব দৃশ্য দেখে সাইকেল চালানোটা যেন তেমন গায়েই লাগছিল না। আমি ওখানে আবারও যাব ঠিক করেছি।”

“তারা আমাকে প্রতিজ্ঞা করায় যে আমি যেন রাশিয়া গিয়ে ইরান দলের পক্ষে উল্লাসধ্বনি করি। তারাও বলিউডের সিনেমা পছন্দ করে আর অধিকাংশ জায়গাতেই এই ব্যাপারটি আমাকে লোকজনের আলাপ শুরু করতে সাহায্য করেছে।”

“এটা একদমই সত্য যে ফুটবল আর সিনেমা পৃথিবীকে এক করতে পারে।”

‘সাইকেল চালিয়ে ওজন যায় কমে’ 

এর পরের বিরতি ছিল আজারবাইজান। সীমান্তের পুলিশ তার কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে একটু সমস্যায় পড়ে, কারণ নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে ইতোমধ্যে ফ্রান্সিসের ওজন কমে গেছে অনেকটাই।

“আমাকে দেখতে পাসপোর্টের ছবির মতো লাগছিল না। আমার সবকিছু যাচাই করতে পুলিশের ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়, তবে তারা আমার সাথে ভাল ব্যবহার করছিল।”

‘নো ম্যান’স ল্যান্ডে’ আটকে যাওয়া

ফ্রান্সিস যখন জর্জিয়ায় পৌঁছান, তাকে আবার ফিরে আসতে হয় এবং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। 

“আমার কাছে সকল কাগজপত্র ছিল কিন্তু আমি এখনও জানিনা কেন আমার প্রবেশ আটকে দেয়া হল। আমার সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার কারণে এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে যাই আমি।”

জর্জিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার ‘নো ম্যান’স ল্যান্ড’-এ ফ্রান্সিস্কে পুরো একদিন থাকতে হয়। তবে এরপর আজারবাইজান কর্তৃক দেয়া এক জরুরি ভিসায় তিনি আবার আজারবাইজানে প্রবেশ করতে পারেন।

“তখন আমি রাশিয়া যাওয়ার আরেক পথের সন্ধান পাই। আমাকে একজন জানায় যে আজারবাইজানের সাথে রাশিয়ায় দাগেস্তান অঞ্চলের সীমান্ত রয়েছে।”

“এটা অনিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও আমি সেখানে যাই কারণ অন্যপথে যাওয়ার আর সুযোগ ছিল না আমার। ৫জুন আমি দাগেস্তানে প্রবেশ করি।“

ভাষার সীমাবদ্ধতা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় দাগেস্থানে কারণ সেখানকার মানুষ ইংরেজিতে কথা বলতে পারে খুব কম। 

“আমি সাইকেলে করে এতদূর এসেছে দেখে সেখানকার মানুষজন খুবই অবাক হচ্ছিল।”

ফ্রান্সিস এখন তামবভ পর্যন্ত এসেছেন। মস্কো থেকে এই শহরের দূরত প্রায় ৪৬০ কিমি.। তাকে ২৬ জুনের মধ্যে মস্কো পৌছাতে হবে যেদিন ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মধ্যকার ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

ফ্রান্সিস বলেন, “এই একটিমাত্র ম্যাচের টিকেটই আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি”।

“কিন্তু আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক এবং লিওনেল মেসি আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়, আমি তাঁকে পুজো দেই। আমার স্বপ্ন তাঁর সঙ্গে দেখা করা এবং আমার সাইকেলে তার স্বাক্ষর নেয়া”

ফ্রান্সিস আশা করেন তার এই ভ্রমণ মানুষজনকে ফুটবল ও ফিটনেসের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করবে। 

“সাইকেল চালানো আপনাকে জীবনের আদিম প্রয়োজনের দিকে নিয়ে যাবে। সারাদিনের পর আপনার যা দরকার হবে তা হচ্ছে একটি স্নান, তাবু খাটানোর মতো একটি সুন্দর জায়গা আর ভাল খাবার। এইতো, আপনি তাহলেই সুখি।”


বিবিসি অবলম্বনে