• বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩০ দুপুর

সাক্ষাৎকারে তামিমের আক্ষেপ প্রকাশ

  • প্রকাশিত ০২:২৩ দুপুর সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮
এক হাতে বল মোকাবেলা করছেন তামিম
মেডিকেল রিপোর্ট অন্তত ৬ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকার কথা বললেও ভাঙা হাতেই তিনি মুশফিককে সঙ্গ দিতে শেষ উইকেটে মাঠে নেমে পড়েন দলকে উজ্জীবিত করতে। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন।

এতকিছুর পরও হতাশ বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তামিম। গত রবিবার তিনি তার অভিব্যাক্তি ব্যাক্ত করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে।

তামিমের বীরত্বে মুগ্ধ সমগ্র ক্রিকেটবিশ্ব। ভাঙা কবজি নিয়ে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের এই ড্যাশিং ওপেনার যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রশংসায় ভাসছে ক্রিকেটবিশ্বের প্রতিটি মহল। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারে লাকমালের বল মোকাবেলা করার সময় কবজির হাড় ভেঙে যাওয়ায় মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। মেডিকেল রিপোর্ট অন্তত ৬ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকার কথা বললেও ভাঙা হাতেই তিনি মুশফিককে সঙ্গ দিতে শেষ উইকেটে মাঠে নেমে পড়েন দলকে উজ্জীবিত করতে। দলের চরম সংকটের মুহূর্তে বন্ধু তামিমকে ভাঙা হাতে স্ট্রাইক বদলের জন্য ব্যাট করতে দেখে দারুণভাবে উজ্জীবিত হয়েছেন ১১২ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিকও। যার ফলাফল মুশফিকের একটি টর্নেডো। শেষ ১৫ বলে তিনি করেছেন ৩২ রান। তার থেকেও বড় কথা তামিমের এই অসীম বীরত্ব পুরো দলকেই এতোটাই অনুপ্রাণিত করেছে যে বল করতে নেমে তারা শ্রীলঙ্কাকে এমনকি মুশফিকের সমান রানটাই করতে দেয়নি। শ্রীলংকা অলআউট মাত্র ১২৪ রানেই এবং ১৩৭ রানে জিতে বাংলাদেশ পায় একদিনের ক্রিকেটে দেশের বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় জয়। তবে, এতকিছুর পরও হতাশ বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তামিম। হতাশাটা এশিয়া কাপে খেলতে না পারার। গত রবিবার তিনি তার অভিব্যাক্তি ব্যাক্ত করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে।

এখন কেমন বোধ করেছেন?     

আমি এই জয়টা একটুও উপভোগ করতে পারছিনা। আমি খুবই হতাশ। আমার মনে হয় না আমার ১০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এর থেকে বেশী হতাশ কখনও হয়েছি। আমি এশিয়া কাপে অনেক অনেক আশা নিয়ে খেলতে এসেছিলাম। কিন্তু, চোটের কারণে খেলতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং প্রচন্ড হতাশার। আমি গতকাল থেকে প্রচন্ড হতাশায় ভুগছি। সেদিন (শনিবার) যা হল তাতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম এশিয়া কাপে আমার করার আর কিছুই নেই। তাই আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল তাই করেছি। আমার ভাগ্যে যদি এশিয়া কাপের আর ঐ একটা বলই খেলার সু্যোগ থাকে তাহলে তাই হোক। এই চিন্তাটাই আমাকে ঐ একটা বল খেলার জন্য উৎসাহিত করেছে সবচেয়ে বেশী। ঐ একটা বলে খেলার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ন পার্টনারশিপ হয়েছে, এইটাই বেশী গুরুত্বপূর্ন। কিন্তু, দিনশেষে আমি খুবই হতাশ। 

ভাঙা হাত নিয়ে আবার ব্যাট করতে নামার নেপথ্যের ঘটনাটা কি ছিল?

আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখন মিঠুন আর মুশফিক একটা ভাল পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছিল, কিন্তু আমি ড্রেসিং রুমে ফিরতে ফিরতেই বাংলাদেশের দ্রুত ২-৩ উইকেটের পতন হয়। মাশরাফি ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘মুশফিক টিকে থাকলে ব্যাট করতে নামতে হবে’। প্রথমে আমি ভাবছিলাম উনি আমার সাথে মজা করছেন। তারপর উনি যখন আরক কয়েকবার আমাকে বলার পর আমি এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। আমি ভাবসিলাম যদি শেষ ওভার হয় এবং আমি যদি স্ট্রাইকে না যাই তাহলে আমিও নামতে পারি কারণ আমাকে কিছুই করতে হবেনা নেমে। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। কারণ বাংলাদেশের অনেকগুলো উইকেট পড়ে গেছে আর শেষ ওভার আসতে তখনও ২০ ওভার বাকি। তারপর ৩ ওভার বাকি থাকতে যখন রুবেল ব্যাট করছিল তখন আমি প্যাড পরতে শুরু করি। তারপর যখন মুস্তাফিজুর আউট হয় তখনও অভারের এক বল বাকি যদিও আমাদের পরিকল্পনা ছিল যদি মুশফিক স্ট্রাইকে থাকে তাহলেই আমি নামব। ফিজিও আমাকে বলছিলেন আমি দৌড়াতে পারবনা। তিনি আসলে আমাকে মাঠে নামতেই দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু, দিনশেষে সিদ্ধান্তটা আমার নিজের ব্যাক্তিগত। সিদ্ধান্তটা আমি নিলেও পরিকল্পনাটা মাশরাফি ভাইয়ের। উনি আমার সাথে যেভাবে কথা বলছিলেন তাতে আমি আরও উজ্জীবিত হয়ে উঠি। আমার হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় উনি নিজের হাতে আমার গ্লাভস কেটেছেন, প্যাড পরিয়ে দিয়েছেন- না না প্যাড পরিয়েছে মমিনুল, মাশরাফি ভাই আমাকে গার্ড পরিয়ে দিয়েছেন (হাসি)। সম্ভবত একজন খেলোয়াড়ের আরেকজন খেলোয়াড়কে গার্ড পরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটা ইতিহাসে প্রথমবার ঘটল।

নিজের ক্যারিয়ারকে ঝুঁকিতে ফেলে ব্যাট করতে নামার সময় আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন?

আমি জানতাম আমি ঐ একটা বল খেলতে পারব। কিন্তু কোচ আমাকে নামার কোন দরকার নেই বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম না, আমি একটা বল খেলতে পারব। তখন তিনি বলেন ‘আরেকবার ভেবে দেখ, এটা একান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। ঐ ১৫-২০ সেকেন্ডে আমি ভাবছিলাম যে পৃথিবীর যে বোলারই বল করুক ঐ একটা ডেলিভারি আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে খেলার চেষ্টা করব। একটু আগেই আমার কবজির হাড় ভেঙেছে এবং ভাঙা হাত একটুও নাড়ানো যায় না। ঐ সময় এমনকি দৌড়ানও আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আপনারা দেখেছেন আমি ঐ বলটা খেলার সময় আমার বাম হাত আমি কোমরের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু ইমপ্যাক্টের জন্য হাতটা সামনে এসে পড়েছিল। যদি বলটা মিস করতাম তাহলে ওটা সোজা আমার বাম হাতে এসে লাগত। তাই আমি এসব চিন্তাই করছিলাম না। ঐ ১৫-২০ সেকেন্ড আমি সম্পূর্ণ অন্য কথা ভাবছিলাম। আমার এটা চিন্তা করতে খুবই খারাপ লাগছিল যে এশিয়া কাপে এইটাই আমার শেষ বল মোকাবেলার জন্য। আমি ভাবছিলাম যদি এতে ১০ টা রানও যোগ হয় তাহলেও ভাল। আমার মনে হয় কেউই ৩২ রানের পার্টনারশিপ হবে চিন্তা করেনি। আমিও করিনি। মুশফিক অবিস্বাস্য কিছু শট খেলেছে। একবার ঐ পরিস্থিতিতে মুশফিকের অবস্থাটা চিন্তা করে দেখুন, ও জানত যে ওকে প্রতি বলেই শট নিতে হবে। আমি ভাবসিলাম যে ২,৩,৪ বা ৬ রান যাই হোক, ওদেরকে (শ্রীলঙ্কা) অন্তত এই ৬ রান হলেও বেশী করতে হবে। 

যখন ক্রীজে গেলেন তখন আপনার মাথায় কি চলছিল?

ব্যাপারটা পুরোটাই ছিল প্রচন্ড আবেগের কারণ আমি আমার দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। আমি জানতাম যে আমি একটা সেঞ্চুরি কিংবা বাউন্ডারী মারতে পারবনা।

মাঠে মুশফিকের সাথে আপনার কি আলোচনা হয়েছিল?

আমি মুশফিককে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছিলাম। ওকে বল দেখে খেলার জন্য বলেছিলাম, প্রতি বলেই বড় শট খেলতে বারণ করেছিলাম। আপনি যদি অর শট গুলো দেখেন, তাহলে দেখবেন প্রতিটা শটই নিখুঁত ক্রিকেটীয় এবং এর সাথে আছে ওর (মুশফিকুর রহিম)দারুণ বুদ্ধিমত্তা। 

আপনাকে নামতে দেখে মুশফিকের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

ওতো বুঝতেই পারেনি যে আমি একহাতে খেলেছি। ইনজুরির পর ওই প্রথম আমার হাতের অবস্থা দেখেছিল। 

আপনার কি মনে হয় আপনি হঠাৎ ব্যাট করতে নামায় শ্রীলঙ্কা খেলার মোমেন্টাম হারিয়ে ফেলেছিল?

ওদের কি হয়েছিল জানিনা। তবে আমাদের রান যখন ২২৯ থেকে ২৬১ হয় তখনই ম্যাচের মোমেন্টাম আমাদের দিকে চলে এসেছিল। 

আপনার এই বীরত্বে সবাই অভিভূত। এ নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

আমি তো এভাবে চিন্তাই করিনি। এখন সবাই এটা নিয়ে এতকিছু বলছে। আমিতো জীবনেও এমন কিছু হবে তা ভাবিনি। আমি শুধু আমার দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম।