• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৪ রাত

মাশরাফি: প্রধানমন্ত্রী সুযোগ দিয়েছেন, এলাকার জন্য কাজ করতে চাই

  • প্রকাশিত ০৭:৪১ রাত ডিসেম্বর ৪, ২০১৮
mashrafe
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বিন মর্তুজা। ছবি- মো. মানিক/ঢাকা ট্রিবিউন

"আপনি যদি কোনও দলকে সাপোর্ট করেন, আপনার অবশ্যই প্রকাশ্যে সেটা বলা উচিত"

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার রাজনীতিতে আসার ঘোষণার পর থেকেই তার ভক্ত, অনুসারীদের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।

এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেজে বিস্তারিত লিখে ভক্তদের মনের প্রশ্ন দূর করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে মঙ্গলবার মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিজের রাজনীতিতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এ ডানহাতি পেসার।

আগামী ৯ ডিসেম্বর মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সেই অনুযায়ী মাশরাফির সংবাদ সম্মেলনে আসার কথা ৮ ডিসেম্বর।

কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর এখনো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি মাশরাফি। স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সম্মেলনের বড় অংশ যে তার রাজনীতিতে আসা নিয়ে হবে তা অনুমেয়ই ছিল। 

রাজনীতি নিয়ে বেশির ভাগ প্রশ্ন থাকবে ভেবেই ম্যাচের আগেরদিনের সংবাদ সম্মেলন আরও আগে নিয়ে আসা হয়।

রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে মাশরাফি বললেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি সুযোগ দিয়েছেন আমাকে, আমার এলাকার জন্য কিছু কাজ করার। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি আমার জন্য বড় সুযোগ তাদের জন্য কাজ করার।"

সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ক্যাপ্টেন। 

নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কারণে খেলার প্রতি যে ফোকাসটা থাকে, সেই ফোকাসটা বিঘ্নিত হবে কিনা? 

মাশরাফি: আমার কাছে একদমই না, বা আমার মাইন্ড সেট-আপ এ একদমই না। আমি এখনো ওখানের (ভোট সংক্রান্ত কাজে) সাথে পুরো জড়িত না। আমার পুরোপুরি প্র্যাকটিসে মন আছে। অবশ্যই ১৪ তারিখের পরে আমি ওখানে মনোযোগ দেব। আর ১৪ তারিখ পর্যন্ত আমি মনোযোগ পুরোপুরি খেলায় রাখতে চাই। 

নির্বাচনের সিদ্ধান্তটা আপনি কেন নিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ৫ বছরে এমন কী কী কাজ করেছে যে আপনি নির্বাচনের জন্য অনুপ্রাণিত হলেন। 

মাশরাফি: প্রথমত, আমি যেটা চিন্তা করছিলাম- আর সাত থেকে আট মাস বাকি আছে ওয়ার্ল্ড কাপের। ওয়ার্ল্ড কাপের পরে যদি আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়, এরপরে সাড়ে চার বছরে হয়তোবা আমি জানি না যে আমার কী অবস্থান আসবে। আর আমার একটি সুযোগ এসেছে যেটা আমি এনজয় করি সবসময়, জানেন যে আমি একটি ফাউন্ডেশনও করেছিলাম। আমার জন্য একটি সুযোগ এসেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি সুযোগ দিয়েছেন আমাকে, আমার এলাকার জন্য কিছু কাজ করার। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি আমার জন্য বড় সুযোগ তাদের জন্য কাজ করার। তাই এখান থেকেই মনে হয়েছে, সাড়ে আট মাস/নয় মাস পরে জাতীয় নির্বাচন আবার হবে না, তাই এই সুযোগটা নেওয়া। যদি নির্দিষ্টভাবে ক্রিকেকেট কথা বলি, তাহলে অবশ্যই আমাদের পারফরম্যান্সটা সবার আগে যে বাংলাদেশের ক্রিকেট সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা। সেটা অবশ্য আপনারাও জানেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন আগের থেকে অনেক ভাল দল। এবং সুযোগ-সুবিধাও আগের থেকে অনেক বেশি আছে। আমি আশা করি বাংলাদেশ আরও সামনে এগিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।     

ঘরের মাঠে আপনার শেষ ওয়ানডে সিরিজ নির্বাচনের কারণে আলোচনা থেকে সরে যাচ্ছে, বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

মাশরাফি: প্রথমত আমি বলেছি, আমার মাইন্ড সেট আপ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ছিল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর্যন্ত মনে হচ্ছিল আমি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর পারবো কিনা জানি না। তারপরও আমার ফিটনেস পারফর্মেন্স ঊনিশ পর্যন্ত চলছিল বলে আমি মোটামুটি এগিয়েছি। সেটাই বলছি আমার বিশ্বকাপ পর্যন্ত মাইন্ড সেট আপ আছে। তারপর রিভিউ করার সুযোগ আছে, আমি যদি সেই অবস্থায় না থাকি তাহলে অবশ্যই আমাকে কুইট করতে হবে। আর যদি থাকে তাহলে অবশ্যই আমি চেষ্টা করবো, তার আগেও যে কোনো কিছু হতে পারে। ২০১১ বিশ্বকাপের পর আপনাদের এখানেই ৫০% বিশ্বাস করেছিল যে আমার ক্যারিয়ার শেষ। আল্লার রহমতে আরও সাত বছর ক্যারি করতে পেরেছি। ওইখানে আমার ফ্যামিলির সবাই ভেবেছিল আমি পারবো কিনা। 

শেষ সিরিজ নিয়ে?

মাশরাফি: আমার কাছে এ নির্বাচনে আসার আগেও যেমন ছিল এই সিরিজটাও সেরকম। আমার শেষ আর শুরুতে কিছু আসবে না। তবে অবশ্যই সিরিজটা জিততে চাই। আমার চোখে ঠিক আট দশটা সিরিজ যেভাবে খেলছি এটাও তাই। 

ক্রিকেটের বাইরে রাজনৈতিক মানুষজনের সাথে ঘোরাঘুরি?

মাশরাফি: না এখনও ঘোরার সুযোগ পাইনি। যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সিরিজটা খেলার পর যাবো। নড়াইলের মানুষজনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আমি যেতে পারিনি, গেলে আমার যেই কাজগুলো আছে সেগুলো আমি করবো। 

রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে ভাবনাগুলো কী ছিল?

মাশরাফি: আমার ক্যারিয়ার প্রায় শেষের দিকে। আমি শচীন টেন্ডুলকার বা ম্যাকগ্রা না যে আমার কথা মানুষ স্মরণ রাখবে। আমি আমার মতো করেই ক্রিকেটটা খেলেছি, যতটুকু পেরেছি খেলেছি। তবে আমি সবসময় এনজয় করেছি মানুষের জন্য কাজ করতে পারা। এটা আমার ছোটবেলার শখ ছিল বলতে পারেন। এই সুযোগটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দিয়েছেন। এবং সে কারণেই বৃহৎ পরিসরে যদি কিছু করা যায়। 

বাংলাদেশে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে, তাদের দিক থেকে ভিন্ন দলের মন্তব্য সম্পর্কে কী ভাবছেন?

মাশরাফি: আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি যে আপনার নিজস্ব পার্সোনালিটি থাকা উচিত। আপনি যদি কোনও দলকে সাপোর্ট করেন, আপনার অবশ্যই প্রকাশ্যে সেটা বলা উচিত। এরকম অনেকেই আছে যে সাপোর্ট করে কিন্তু বলতে পারে না। আমার কাছে মনে হয় যে, প্রত্যেকেই যে দল করে সেই সম্মানটা থাকা উচিত। তার মতো করে সে দেশের জন্য কাজ করবে এই মানসিকতা থাকা উচিত। যারা যে কমেন্ট করবে বা করছে ওগুলা তো আমার নিয়ন্ত্রণে নাই এবং আমি তাদের কিছু বলতেও পারবো না। তবে আমার রেসপেক্ট অবশ্যই তাদের উপরে আছে। 

তিন দিন পরে সিরিজ, সব কথা রাজনীতি নিয়ে, পুরোপুরি ক্রিকেটে আছেন?

মাশরাফি: এজন্যই (রাজনীতি নিয়ে) আমি আজ প্রেস কনফারেন্সে আসছি যাতে পোস্ট ম্যাচে আর কেউ রাজনীতি নিয়ে কথা না বলেন। না হলে ম্যাচের আগের দিন যদি প্রেস কনফারেন্স করতাম এই প্রশ্নগুলো তখন হতো। আমি ব্যক্তিগভাবে মনে করেছি আপনাদের মনে যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে এখনি ফেস করা উচিত।

বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে এলেন না ব্যক্তিগতভাবে এলেন?

মাশরাফি: আমি ব্যক্তিগতভাবেই বলেছি, কালকে রাবিদ ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করেছি। যে অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে। উত্তরগুলো দেয়া উচিত আমার মনে হয়। আজ হোক কাল হোক আমার ফেস করতেই হতো। খেলার মধ্যে যাতে এই প্রশ্নগুলো না হয় এইজন্যই আমার আসা।

বিশ্বকাপের পরও খেলবেন কিনা রিভিউ করবেন, সংসদ সদস্য হয়ে গেলে আর খেলাটা চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা? 

মাশরাফি: প্রথমত আমার লক্ষ্য বিশ্বকাপ পর্যন্তই থাকবে। বিশ্বকাপ পর্যন্ত আট মাসের ব্যাপার। আট মাস পর্যন্ত যেভাবে খেলে আসছি ওইভাবে খেলার চেষ্টা করব। আমার পারসোনাল গোলও ছিল বিশ্বকাপ। পরে সেটা রিভিউ করব কিনা সেই সময়ই বলে দেব।

রাজনীতিতে আসার পরে এদেশেরে অনেকে গতানুগতিক রাজনীতিতে গা ভাসায়। আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী যে আপনি গতানুগতিক রাজনীতিতে গা ভাসাবেন না? 

মাশরাফি: আমি এজন্য আপনাদের স্বপ্ন দেখাতে আসি নি। গতানুগতিক কথা আমি বলতেও চাই না। এমন কোনও কথা আমি বলতে চাই না যেটা কালকে আপনি মিলাতে পারবেন না। আমার কাছে মনে হয় যে, সে সুযোগটা যদি আমার আসে, আপনাদের এখনি চিন্তা করার সুযোগ নেই যে আমি নির্বাচিত হয়ে গেছি। নির্বাচিত হওয়ার পরে সেই সুযোগটা যদি আসে, আপনাদের যদি মনে হয় আমাদের কাজগুলো রিভিউ করতে আপনারা করবেন। তখন প্রশ্ন করবেন। এখন আসলে বলা কঠিন। 

নড়াইলের সমর্থন?

মাশরাফি: সাপোর্ট আলহামদুলিল্লা ভালো আছে। আমি পারসোনালি এখনও যেতে পারিনি তাই টোটালি বলাটা কঠিন। খেলার পরে গেলে বুঝতে পারব। 

দেশের ক্রিকেটে মাশরাফির চিন্তা কী?

মাশরাফি: দেশের ক্রিকেটের কথা যেটা বললাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালোই চলছে। এখন যারা আছেন ক্লিয়ারলি বলতে পারেন। আমার অবস্থান থেকে যতটুকু সাপোর্ট দেয়ার ততটুকু দেব।

একটা প্রশ্ন তোলা হয়,  কোটা আন্দোলন বা নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে আপনি দেশ নিয়ে কোনও কথা বলেন নি, এখন আপনি দেশ নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন। তাদের জন্য কোনো জবাব আছে কিনা। 

মাশরাফি: কোটা আন্দোলন নিয়ে যেটা বললেন, এত ডিপলি রাজনীতি আমি কখনো করিও নি, জানিও না, বুঝিও না। আমার উদ্দেশ্য খুব সিম্পল, মানুষের জন্য করে আমি শান্তি পাই। ততটুকুই করা। আমাকে ডিপ লেভেলের পলিটিসিয়ান যদি ভাবেন, সেটা আমি এখনও হয় নি। ওই লেভেলে ভাবলে সেটাও আমার সাথে অবিচার হবে। আমার এক্সপেরিয়েন্স পুরোপুরি নতুন। তবে যেটা আমি বলেছি, আমি ভাল কাজ অবশ্যই করতে চাই। এটা সামনে দেখা যাবে কতটুকু করতে পারি।  

বোর্ডে আসতে চান কিনা?

মাশরাফি: আমি তো আগেই বললাম সামনে কি হবে জানি না। নির্বাচন হলে নির্বাচনে জিততে হবে। তাই এই পর্যায় পার না হলে বলা যায় না কিছুই।

বিসিবি প্রধান বা বিসিবির ডিরেক্টরদের সাথে কথা হয়েছে কিনা। এবং টিম মেটদের মন্তব্য আছে কিনা রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে। 

মাশরাফি: এখনও কারোর সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা হয় নি। 

আপনার দল না জিতলে আপনার ভবিষ্যত?

মাশরাফি: কালকে আপনার জীবনে কী ঘটবে আপনি জানেন না। আমার জীবনে কী ঘটবে সেটাও আমি জানি না। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্লিয়ার মাইন্ড নিয়ে যাচ্ছি কিনা। আমি শুধু নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কালকে আমার সাথে কী হবে সেটা জানি না। তাই এতকিছু ভাবার সুযোগ এখানে নেই।

টেস্ট থেকে অবসর?

মাশরাফি: দেখা যাক, আমি তো দশটা কাজ তো একসাথে করব না। আর টেস্ট মনে হয় এমনিই বলে দেব। আর টেস্ট তো আট বছর ধরে খেলছি না।

পরিবার থেকে বাধা, সমর্থন?

মাশরাফি: খুব স্বাভাবিক, পারিবারিকভাবে জানার পর এটা একটা নতুন জিনিস তাদের জন্য। তাদের জন্যও মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে, আমারও লাগবে। এটাই স্বাভাবিক। হয়তো বা ওইভাবে রাজনীতি আমার বাসায় কেউ করেনি। এটাই সত্যি। তো কিছুটা সময় তো তাদেরও লাগবে মানিয়ে নিতে।

কীভাবে মানালেন?

মাশরাফি: মানামানি (হাসি)। সবাইকে যেটা বললাম অ্যাডজাস্ট করতে হবে।