• বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪২ রাত

পৃথিবীতে প্রাণের উপাদান এসেছিল যেভাবে

  • প্রকাশিত ০৬:৪৩ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ২১, ২০১৮
সৌরজগৎ
প্রতীকী ছবি

প্রাণের জন্মের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান শর্করা প্রকৃতিতে থাকে বিভিন্ন রূপে। তারাই জীবদেহের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

পৃথিবীতে প্রাণের উপাদান আবির্ভাব নিয়ে রয়েছে অশেষ কৌতুহল আর নানা মত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসার এক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল বলছে, অন্য কোনও গ্রহাণু থেকেই প্রাণের জন্ম হয়েছিল পৃথিবীতে। প্রাণ সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান শর্করা প্রথমে ছিল না পৃথিবীতে। পৃথিবীকে খুব জোরে ধাক্কা মেরে সেই শর্করাই এই গ্রহে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল কোনও গ্রহাণু। কোটি কোটি বছর আগে ঘটেছিল এমন ঘটনা।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার এইমস রিসার্চ সেন্টারের একদল গবেষক এই তথ্য দিয়েছেন। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ন্যাচার কমিউনিকেশন’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায়।

জানা যায়, গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে মহাকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করে সহজেই সেখানে শর্করা বানাতে সক্ষম হন নাসার বিজ্ঞানীরা। এভাবেই নিজেদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ হাজির করেন তারা।

কোন শর্করা প্রাণের প্রাথমিক উপাদান?

প্রাণের জন্মের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান শর্করা প্রকৃতিতে থাকে বিভিন্ন রূপে। তারাই জীবদেহের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ‘২-ডিঅক্সিরাইবোজ’ হল তেমনই একটি শর্করা। যা ডিএনএ (জিনের কার্যকরী একক) তৈরির গুরুত্বপূর্ণ তথা প্রাথমিক উপাদান।

সাধারণ দৃষ্টিতে মহাকাশকে অনন্ত শূন্য মনে হলেও, মহাকাশ আদৌ তেমন নয়। দু’টি মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যে থাকে একটি ‘ইন্টারস্টেলার মিডিয়াম’। যা ভরা থাকে ধুলোবালি আর গ্যাসের মিশ্রণে। আর সেই মাধ্যমের ঘনত্বও সামান্য। নাসার অ্যাস্ট্রোকেমিস্ট্রি গবেষণাগারে ঠিক সেই রকম পরিবেশই কৃত্রিমভাবে তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানীরা।

পরম শূন্য তাপমাত্রায় (মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থাকা একটি অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে রাখা হয়েছিল পরীক্ষায় ব্যবহৃত নমুনা পদার্থটি। কারণ, সেটাই মহাকাশের গড় তাপমাত্রা। তা রাখা হয়েছিল একটি ‘কসমিক চেম্বার’-এ। সেই ‘কসমিক চেম্বার’-এ একটি পাইপের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল গ্যাসীয় অবস্থায় থাকা মিথানল (মিথাইল অ্যালকোহল) ও জলীয় বাস্পের মিশ্রণ।

নাসার বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পরম শূন্য তাপমাত্রার জন্য অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে রাখা ওই নমুনার উপর বরফের আস্তরণ পড়লেও অতিবেগুণী রশ্মি (আলট্রা-ভায়োলেট রে) সেই বরফকে গলিয়ে দিয়েছে। তৈরি করেছে ‘২-ডিঅক্সিরাইবোজ’ শর্করা। শুধু তাই নয়, সেখানে তৈরি হয়েছে শর্করাজাত আরও কয়েকটি পদার্থ। পরীক্ষার এই ফলই চমকে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের।

অতিবেগুণী রশ্মি ব্যবহারের কারণ

যে কোনও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ওপর অতিবেগুণী রশ্মির প্রভাব বেশ প্রকট। তাই অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে রাখা নমুনার উপরে লাগাতার ফেলা হয়েছিল অতিবেগুণী রশ্মি। মহাকাশের যে পরিবেশে ওই রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়, ঠিক সেই পরিবেশটাই গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছিল।

নাসার অ্যাস্ট্রোকেমিস্ট্রি গবেষণাগারের বিজ্ঞানী স্কট স্যান্ডফোর্ড বলেছেন, ‘‘মহাকাশ যদি প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উপকরণ নিজেই তৈরি করে নিতে পারে, তা হলে আমাদের বানানো মহাকাশের মতো পরিবেশে তা কেন তৈরি হতে পারবে না? গত দু’দশক ধরে এই প্রশ্নটাই আমরা নিজেদের করে এসেছি। আর তার জবাবটা এ বার পেয়ে গিয়েছি।’’

পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম: প্রচলিত ধারণাগুলো

পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণ এসেছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রচুর গবেষণার পরেও বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কোনও তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান পৃথিবীতেই ছিল, নাকি তা অন্য কোনও মহাজাগতিক বস্তু থেকে এসেছিল, তা নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাণ সৃষ্টির উপাদানের সঠিক মিশ্রণ আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল। আর সেটাই পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি করেছে। এই মিশ্রণের ক্ষেত্র বা ধারক হিসাবে ধরা হয় সমুদ্রের উষ্ণ জল বা কোনও উষ্ণ প্রস্রবণকে।

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ বলছে, কোনও গ্রহাণু বা ধূমকেতু থেকেই এই গ্রহে এসেছিল প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উপাদান।

নাসার বিজ্ঞানীদের ভোট দ্বিতীয় মতবাদের পক্ষে। তাদের মতে, আছড়ে পড়া গ্রহাণু-ধূমকেতুদের দৌলতেই প্রাণ সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শর্করাজাতীয় উপাদানে এক সময় ভর্তি হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর পিঠের উপরিভাগ। সেই সব উপাদানই উপযুক্ত আবহাওয়ায়, জলের সংস্পর্শে এসে ডিএনএ বা আরএনএ তৈরির প্রাথমিক উপাদান- ‘২-ডিঅক্সিরাইবোজ’ শর্করা তৈরি করেছে। 

এই গবেষণা পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির তত্ত্বে যে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে নিঃসন্দেহে বলা যায় এমন কথা।