Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ওয়েব ডেভলপমেন্ট ক্যারিয়ার যেভাবে বদলে দিতে পারে আপনার জীবনের গতিপথ

বাংলাদেশি সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো শুধু দেশেই না, দেশের বাইরে বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি প্রোজেক্টেও প্রচুর কাজ করছে। ফলে ডেভেলপারের চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে

আপডেট : ০৩ জুন ২০২২, ০৪:০৬ পিএম

ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বর্তমান আইটি সেক্টরের জনপ্রিয় পেশা। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশেও অসংখ্য মানুষ ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।

ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট পেশা নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের আলী শাহরিয়ার বাপ্পার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন নির্ঝর আনজুম।

নির্ঝর আনজুম সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ২০ বছর দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি একটি বিশ্বব্যাপী ওয়েব-অ্যাপ্লিকেশন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জুমশেপার (JoomShaper) এ সিটিও (CTO) হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন) হিসেবে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া তিনি ই-কমার্স অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ’র ডিজিটাল সার্ভিস স্টান্ডিং কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি, সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ’র আজীবন সদস্য।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি অনেক বছর যাবৎ সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন, বাংলাদেশের এই সেক্টরের ভবিষ্যত কেমন?

নির্ঝর আনজুম: জব পোর্টালগুলোতে দেখবেন ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ক্যাটেগরিতে চাকরির সংখ্যা সবসময়ই বেশি। ডেভেলপার শুধু ওয়েব বা সফটওয়্যার কোম্পানিতেই প্রয়োজন পড়ে না, পাশাপাশি মার্কেটিং এজেন্সি, গ্রুপ অব কোম্পানি, গার্মেন্টস, এনজিও, ফাইনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানসহ অনেক কোম্পানিতেই প্রয়োজন হয়। কারণ দিন দিন সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজড হচ্ছে, যেখানে নিজ নিজ ওয়েবসাইট এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং মেইন্টেনেন্সের জন্য ডেভেলপারের প্রয়োজন রয়েছে।

তাছাড়া বাংলাদেশি সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো শুধু দেশেই না, দেশের বাইরে বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি প্রোজেক্টেও প্রচুর কাজ করছে। ফলে ডেভেলপারের চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ডেভেলপারদের কাজের চাহিদা সামনের দিনে আরও বাড়বে। চাকরির বাজারে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি সেক্টর।

সৌজন্য ছবি

ঢাকা ট্রিবিউন: একজন ওয়েব বা সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে গেলে কী কী শেখা দরকার?

নির্ঝর আনজুম: আসলে ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট মোটামুটি একই ধরনের প্রোগ্রামিংয়ের ভাষা দিয়ে করা যায়। কিন্তু এই দুই ধরনের কাজের মধ্যে পার্থক্য হল ডোমেইন নলেজে; অর্থাৎ ওয়েব ডেভেলপার হতে গেলে ওয়েব এপ্লিকেশনগুলো কীভাবে কাজ করে, ওয়েবের ফিচারগুলো কী রকম হয়, সেগুলো জানা জরুরি। আবার  সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে গেলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম কীভাবে চলে, ব্যবসার কাজগুলো কী ধরনের ফিচারের মাধ্যমে অটোমেট করা সম্ভব, সেগুলো জানা জরুরি।

প্রোগ্রামিংয়ের ল্যাঙ্গুয়েজ টেকনোলোজির দুইটি প্রকার রয়েছে। একটি হল ব্যাকএন্ড (সার্ভার সাইট), যেমন- জাভা (Java), গোল্যাঙ্গ (GoLang), সি-শার্প (C#), পাইথন (Python), পিএইচপি (PHP)। অন্যটি হল ফ্রন্টএন্ড (ব্রাউজার সাইটের), যেমন- এইচটিএমএল (HTML), সিএসএস (CSS), জাভাস্ক্রিপ্ট (JavaScript) ইত্যাদি।

একজন চাইলে ফ্রন্টএন্ড ডেভলপার বা ব্যাকএন্ড ডেভলপার হতে পারেন। আবার চাইলে উভয় বিষয়েও বিশেষজ্ঞ বা Full-Stack Developer হতে পারেন। একজন যেকোনো একটি দিকে দক্ষতা অর্জন করলেই সহজে আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে বা ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করার সুযোগ অর্জন করতে পারেন।

উল্লেখ্য, শুধু ভাষা জানা থাকলেই বেশি দূর এগোনো সম্ভব না। সেই ভাষার ফ্রেমওয়ার্ক বা লাইব্রেরি জানা জরুরি। যা বড় পরিসরের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার ডেভলপ করতে সাহায্য করবে। যেমন- জাভাতে স্প্রিং বুট (Spring Boot), গোল্যাঙ্গে জিন (Gin), সি-শার্প’র ক্ষেত্রে এএসপিডটনেট কোর (ASP.NET Core), পাইথনে জ্যাঙ্গো (Django), পিএইচপিতে লারাভেল (Laravel), জাভাস্ক্রিপ্ট’র ক্ষেত্রে রিঅ্যাক্টজেএস (ReactJS), অ্যাঙ্গুলারজেএস (AngularJS), ভিইউইজেএস (VueJS), নোডজেএস (NodeJS) ইত্যাদি।

প্রতীকী ছবি/ সংগৃহীত

আবার কেউ যদি শুধু ছোট বা মাঝারি পরিসরের ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করতে চান তাহলে কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়েও কাজ করতে পারেন। যার মধ্যে ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress), ওপেনকার্ড (OpenCard) এবং ম্যাজেন্টো (Magento) বেশ জনপ্রিয়।

ঢাকা ট্রিবিউন: অনেকগুলো প্রোগ্রামিং টেকনোলোজির কথা বললেন, এর মধ্যে বেশি কাজের সুযোগ কোন টেকনোলোজিতে বা কোনটি ভালো?

নির্ঝর আনজুম: প্রোগ্রামিং টেকনোলোজিগুলোর কোনোটাই খারাপ না। কাজের প্রয়োজনে যা সহজ মনে হবে তাই বেছে নিতে হবে। একজন ডেভেলপার তার ক্যারিয়ার যে প্রোগ্রামিং টেকনোলজিতেই গড়ে তোলেন না কেন, তিনি যদি সেই টেকনোলোজির ওপর ভালো দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে অবশ্যই তিনি ক্যারিয়ারে ভালো করবেন।

তবে, বাংলাদেশে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের চাকরি এখন পর্যন্ত সব চাইতে বেশি পিএইচপি টেকনোলোজিতে এবং সফটওয়ারের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি জনপ্রিয় এএসপিডটনেট এবং জাভা। সফটওয়ারের ক্ষেত্রে পাইথন’র ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। জাভাস্ক্রিপ্ট টেকনোলোজির ক্ষেত্রে রিঅ্যাক্টজেএস, এবং ভিইউইজেএস’র ব্যবহারও বাড়ছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: যারা নন-আইটি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসছেন, তাদের জন্য কোন টেকনোলোজিগুলো শেখা সহজ?

নির্ঝর আনজুম: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি আমি ১২ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রোগ্রামিংয়ে অসাধ্য বলে কিছু নেই। আমার বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী নন-আইটি বাকগ্রাউন্ড থেকেই এসেছে। তারা দেশে বিদেশে কাজ করছে। প্রতি বছর নন-আইটি থেকে অনেক ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছে। বা অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করছে।

তবে, সহজ কোনো টেকনোলোজি নিয়ে কাজ করতে চাইলে পিএইচপিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। পৃথিবীর প্রায় ৭৭.৪% ওয়েবসাইটই পিএইচপি দিয়ে তৈরি।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনি যেসকল প্রোগ্রামিং টেকনোলোজির কথা বললেন এখানে আর কিছু কি শেখার প্রয়োজন রয়েছে?

নির্ঝর আনজুম: হ্যাঁ, যেকোনো ডেভেলপারকে ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যারে ডাটা ম্যানেজ করার জন্য অন্ততপক্ষে কোনো একটি ডাটাবেজ ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে হয়। সব থেকে জনপ্রিয় ডাটাবেজগুলোর মধ্যে এমওয়াই এসকিউএল (MySQL), এমএস এসকিউএল (MsSQL), ওরাকল (Oracle), মঙ্গো ডিবি (MongoDB), ক্যাসান্দ্রা (Cassandra) ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয়। সাধারণত, পিএইচপি, জাভা, পাইথন, গোল্যাঙ্গ’র সঙ্গে এমওয়াই এসকিউএল, ওরাকল বা মঙ্গো ডিবি বা ক্যাসান্দ্রা বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে, এএসপিডটনেট’র সঙ্গে এমএস এসকিউএল সব থেকে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ঢাকা ট্রিবিউন: একদম ল্যাঙ্গুয়েজ না জেনে কী কোনো প্রকার ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব?

নির্ঝর আনজুম: অবশ্যই। কেউ যদি প্রোগ্রামিং না জেনেও রেগুলার ছোট বা মাঝারি টাইপের ইকমার্স, কর্পোরেট ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফোরাম বা নিউজপেপার ইত্যাদি তৈরি করতে চান, তাহলে ওয়ার্ডপ্রেস দিয়েই তা সম্ভব। সিএমএস ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে ৬৪.১% ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে তৈরি। তবে, বিশেষ কোনো ফিচার যা ওয়ার্ডপ্রেসে নেই, এমন কিছু তৈরি করতে গেলে প্রোগ্রামিং শিখতেই হবে। ওয়ার্ডপ্রেস পিএইচপি ল্যাংগুয়েজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

ঢাকা ট্রিবিউন: কেউ নতুন প্রোগ্রামিং শিখতে চাইলে কেমন সময় লাগতে পারে?

নির্ঝর আনজুম: এটা নির্ভর করবে যিনি শিখবেন তিনি কেমন সময় দিচ্ছেন; তার কম্পিউটার, ওয়েবসাইট, ইন্টারনেট ইত্যাদি সম্পর্কে আগের বেসিক ধারণা কেমন ইত্যাদির ওপর। সাধারণত, একটি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ, সেই ল্যাংগুয়েজের ফ্রেমওয়ার্ক এবং কোনো একটি ডেটাবেজ শেখা, এবং সেই টেকনোলোজিতে অন্তত একটি প্রফেসনাল প্রজেক্ট করা- সব মিলিয়ে আট থেকে ১২ মাস সময় লেগে যেতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউন: প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা ওয়েব এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শিখছে- কিন্তু অনেকেই তো চাকরি পাচ্ছে না। এর কারণ কি?

নির্ঝর আনজুম: চাকরি না পাওয়ার নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে তাদের দক্ষতা ঠিকমতো রিজিউমিতে ফুটিয়ে তুলতে পারে না। ফলে প্রথম ধাপেই তারা বাদ পড়েন। বিশেষ করে ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা না থাকায় পরবর্তী ধাপে অনেকে বাদ পড়েন। এছাড়া, বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে জানে না কোন চাকরিতে আবেদন করলে তার ডাক পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেকে দক্ষতার চাইতে বড় পোস্টে আবেদন করেন এবং এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন। আবার অনেকে সাহস না থাকায় আবেদনই করেন না ফলে সুযোগ হাতছাড়া হয়।

এখন আমি যদি শুধুমাত্র একটি তিন মাসের ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স করে চিন্তা করি, এবার আমি ওয়েব ডেভেলপার হয়ে যাব, সেটি আমার ভুল।

তাই চাকরি প্রত্যাশীদের সবার আগে খুঁজে বের করা উচিত তিনি যে সেক্টরে কাজ করবেন সেই সেক্টরের কোম্পানিগুলো কী কী দক্ষতা চাচ্ছে। এবার সেই দক্ষতাগুলো যদি অর্জন করি, এবং ছোট হলেও সেই সম্পর্কিত একটা প্রাকটিকাল প্রোজেক্ট করি, তাহলে কিন্তু আমার চাকরি পাওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়।

 

About

Popular Links