সাম্প্রতিককালে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতার একাধিক ঘটনা সামনে উঠে এসেছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই সাভার ও আশুলিয়া থানায় ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাসহ নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ২৪টির মতো মামলা হয়েছে।
পুলিশের সাভার সার্কেলের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সাভার এবং আশুলিয়া থানায় ২৪টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে সাভার মডেল থানায় ৬টি এবং আশুলিয়া থানায় ১৮ মামলা। সাভার মডেল থানার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ১১ জন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে।
আর আশুলিয়া থানায় ১৮টি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ২২ জনসহ অজ্ঞাত ৬-৭ জন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০ জনকে, পলাতক ১২ জন।
ধর্ষণের ভিডিও নিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইল’, বাদ যায়নি শিশুও
গেল ১৬ এপ্রিল বিকালে সাভারের ডগরমোড়া এলাকায় একটি বাড়িতে ১৬ বছর বয়সী এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার ভুক্তভোগী তরুণীর বাবা জানান, ১৬ এপ্রিল বিকালে তার মেয়ে বাড়ির পাশে একটি দোকানে যান। সেখান থেকে ফেরার সময় শান্ত নামে এক যুবক তাকে টেনে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে শান্ত, ইমনসহ ৪ জন মিলে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণের সময় ধারণ করা হয় ভিডিও। ধর্ষণের বিষয়টি কাউকে জানালে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিবে বলে হুমকি দেয় ধর্ষকরা। পরে বিষয়টি পরিবারকে জানালে মামলা করা হয়।
এছাড়া গেল ১৪ মার্চ সাভারের আশুলিয়ায় ধর্ষণ মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. ইমরান, ওরফে বিপি ইমরান নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় পলাতক আরও দুইজন।
ভুক্তভোগী নারী জানান, র্দীঘদিন ধরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিপি ইমরানের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় এবং তাকে দিয়ে টিকটকের ভিডিও তৈরি করতেন। কিন্তু ভুক্তভোগী নারী হঠাৎ টিকটক করতে না চাইলে ১২ মার্চ দুপুরে একা পেয়ে আশুলিয়ার পশালবাড়ি এলাকার নিজ বাড়িতে অভিযুক্ত ইমরান তাকে ধর্ষণ করেন।
পরে অন্য দুই আসামিকে ডেকে এনে তাদের সহযোগীতায় ওই নারীকে মারধর করেন। এরপর ওই নারী ১৪ মার্চ আশুলিয়া থানায় তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অপর দুই আসামি- জুনায়েদ ও সুমাইয়া।
গত ৭ এপ্রিল সাভারের বিরুলিয়ায় সাত বছর বয়সী এক কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। পরে, এ ঘটনায় আব্দুল বারেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হলে তাকে গ্রেপ্তার করে থানা পুলিশ।
গেল ২৪ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এস এম তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত তারিকুল ইসলামের সনদ স্থগিত করে তদন্ত কমিটি ঘোষণা করেন।
এছাড়া গত ২৪ জানুয়ারি সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় রাজ্জাকের মালিকাধীন ভাড়া বাড়িতে স্বামীকে জিম্মি করে নববধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় ২৩ মার্চ র্যাব-৪ এর একটি দল আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের চিনছিনা মোড় এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি মোসাদ্দেক খানকে গ্রেপ্তার করে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন তিনি। সেদিন রাতে বাড়ির কেয়ারটেকার ঘরের দরজা খুলতে বলেন। দরজা খুললে কয়েক জন্য ব্যক্তি তাদের বিয়ের কাবিননামা দেখতে চান। একপর্যায়ে ওই স্বামীকে জিম্মি করে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন তারা।
সমাজের ভয়ে বিচার পাওয়া থেকে দূরে অনেকেই
সমাজ সচেতন ও বিশেষজ্ঞ নাগরিকরা বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটনায় অনেকে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও বেশিরভাগই নারী ও শিশুর পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে প্রশাসনের সহায়তা নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এতে অনেক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে থেকে যায়।
সাভার দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, “নারীর প্রতি সহিংসতা সামাজিক ব্যধী ও অপরাধ। অনেক নারী লোকলজ্জা ও মানসম্মনের ভয়ে পুলিশের কাছে আসেন না। এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসা উচিত।”
ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান বাদল বলেন, “ধর্ষণের সর্ব্বোচ সাজা মৃত্যুদণ্ড। তবে অপরাধের ওপর ভিত্তি করে সাজা নির্ধারিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা বিচার চান। তবে অনেক ঘটনায় জানাজানি ও সম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার এমন ঘটনা এড়িয়ে যেতে চান। অনেকেই মামলার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ভয় পান। আইনজীবী, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে চান না। এতে আসামিরা সুযোগ পেয়ে যায়।”
ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, ট্রাফিক এন্ড অপস) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “গেল তিন মাসে সাভার ও আশুলিয়া থানায় ধর্ষণ সংক্রান্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ৩৩ জন ও অজ্ঞাত আসামি ৬-৭ জন। আর এজাহারভুক্ত ২৭ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”