জরাজীর্ণ স্কুলটি ছিল মাদকের আখড়া, এখন ‘গোলাপি শিশুপার্ক’

একসময় জরাজীর্ণ দশা আর মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল কুমিল্লা রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছিল না ব্যবহারের উপযোগী কোনো শৌচাগার। শৌচাগারের বর্জ্য আর মাঠের ডোবার পানি মিশে একাকার হয়ে থাকত সবসময়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও পানি জমত।

এমন অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে চাইত না, ফলে বাড়তে থাকে ঝরে পড়ার হার। তবে প্রায় পরিত্যক্ত সেই স্কুলটিই এখন গোলাপি রঙে রাঙানো এক দৃষ্টিনন্দন শিশুপার্কে রূপান্তরিত হয়েছে।

আগে যেখানে কেবল নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়তো, এখন পরিবেশের আমূল পরিবর্তন দেখে মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের এখানে পাঠাচ্ছেন।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, স্কুলের উত্তর-পূর্ব কোণে স্থাপন করা হয়েছে দোলনা ও স্লিপার। সেখানে খুদে শিক্ষার্থীদের হুড়োহুড়ি আর উচ্ছ্বাস বাতাসে আনন্দের ঢেউ তুলছে। মাঠের লেকে ফুটেছে লাল শাপলা, আর ফুলের বাগানে পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত চারপাশ। বিদ্যালয়ের আঙিনায় পতপত করে উড়ছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে আধুনিক বেঞ্চ। পরিবেশের দিক থেকে অভিভাবকরা এখন এটিকে কুমিল্লা জেলার অন্যতম সেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে দাবি করছেন।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হালিম মজুমদার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এই স্কুলের সৌন্দর্যবর্ধন করেছেন। এর ফলে যেখানে আগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০০ জনের কিছু বেশি, পরিবেশ উন্নত হওয়ায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ জনে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইজা আক্তার মাহি, নুসরাত জাহান নুরী, আরিফা মুনতাসীর ইসলাম, নাদিমুল ইসলাম ও মো. আবদুল্লাহ জানায়, আগে স্কুলের কক্ষে নোংরা পানি থাকত, মাঠে হাঁটা যেত না। এখন স্কুলটি শিশুপার্কের মতো সুন্দর হয়ে যাওয়ায় সেখানে সময় কাটাতে তাদের খুব ভালো লাগে।

অভিভাবক সজল ঋষি বলেন, এখানে আগে মাদকের আড্ডা বসত। বর্তমানে পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে। বড় স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য না থাকায় আমার তিন সন্তান এখানেই পড়ে। এখন সুন্দর পরিবেশ দেখে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরাও এখানে পড়তে আসছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাছলিমা আক্তার জানান, ভবন নিচু হওয়ায় বছরের প্রায় ৮ মাস সেখানে পানি জমে থাকত। সংস্কারের ফলে সেই সমস্যা এখন দূর হয়েছে।

তিনি বলেন, “আগে এটি মাদকের আখড়া ছিল, কিন্তু এখন আমাদের স্কুলটি জেলার অন্যতম সুন্দর স্কুল। এজন্য আমি আবদুল হালিমকে ধন্যবাদ জানাই।”

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থী সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়লেও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় তাদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে তিনি সরকারের কাছে একটি নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান।

উদ্যোক্তা আবদুল হালিম মজুমদার বলেন, “শিক্ষাঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ না দেখে আমি নিজেই কিছু কাজ করেছি। এখানে একটি নতুন ভবন নির্মিত হলে বর্তমান শ্রেণিকক্ষ সংকটও দ্রুত কেটে যাবে।”