বারবার অপরাধ, তবু বদলায় না জাবির নিরাপত্তা বাস্তবতা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগের পর আবারও সামনে এসেছে ক্যাম্পাসে বহিরাগত ও ভবঘুরেদের অবাধ বিচরণের প্রশ্ন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত একাধিক প্রবেশপথ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বহিরাগতদের আনাগোনা, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসিক ক্যাম্পাসটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মঙ্গলবার (১২ মে) রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হলসংলগ্ন এলাকায় এক ছাত্রীকে ঝোপে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। সহপাঠীরা তাঁর চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনার পর রাতভর বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেপ্তার, প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

এদিকে ঘটনার পর বুধবার (১৩ মে) রাতভর বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফাহমিদা মুন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনের পূর্ণ দায় স্বীকার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়।

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর “কুইক রেসপন্স টিম” গঠন করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োজিত সকল নিরাপত্তাকর্মীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক কার্যকর ইমার্জেন্সি হটলাইন চালু, ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রনয়ণের দাবিও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও অবস্থানের মতো ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালী অংশের আশ্রয়ে বহিরাগতদের হলে অবস্থান, মোটরসাইকেল মহড়া, এমনকি নির্জন এলাকায় আড্ডার ঘটনাও নিয়মিত বলে দাবি তাদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইমরোজ ইলা বলেন, “আমরা শুধু এ ঘটনার প্রতিবাদে নয়, বরং একটি ব্যর্থ ও উদাসীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। যে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল মুক্তচিন্তার অভয়ারণ্য, সেখানে বহিরাগত কর্তৃক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে। এটি প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার নগ্ন প্রমাণ।“

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, “বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি বা শক্তি প্রদর্শনের সময় বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে আনা হয়। পরে তাদের অনেকেই ক্যাম্পাসে অবাধে চলাফেরা করে। প্রশাসন জানলেও অনেক সময় ব্যবস্থা নেয় না।”

এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নৃবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “জাকসু এখন অনেকটাই দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জায়াগা। এদের কেউই প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের কন্ঠস্বর হতে পারছেনা। স্পষ্ট দলীয় বিভাজন ও ভিপি-জিএস কোরাম নিয়ে চলছে। একটা প্রতিবাদ কর্মসূচিও সবাই আলাদা আলাদা ব্যানারে ডাকে। এখানে শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত কাজ করার মতো কোনো কার্যকর প্রতিনিধিই নেই।”

শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-এর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জাকসুতে দলীয় বিভাজন থাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন সংকট কিংবা হয়রানির মতো ইস্যুতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি।

সম্প্রতি বছরগুলোতে একাধিকবার শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, ধর্ষণচেষ্টা, মাদক, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনার পর প্রশাসন বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, অছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ এবং নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বলছেন, বাস্তবে সেসব উদ্যোগের বেশিরভাগই কার্যকর হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্জন এলাকা বিশেষ করে পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হল এলাকা, সুইমিংপুলসংলগ্ন অংশ, বোটানিক্যাল গার্ডেন, লেকপাড় ও আবাসিক হলের পেছনের অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তাঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতেই নয়, গোটা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই অনেকটা অকার্যকর, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসিটিভি নেই, এছাড়া অনেক সিসিটিভি কেবল নামমাত্র আছে, নিরাপত্তা কর্মীদের সংকট এবং সীমিত টহল। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেফরুল বলেন, “আমরা সেদিনের ঘটনা জানতে পেরেই পুরো এলাকায় তল্লাশি চালাই, কিন্তু অভিযুক্তকে খুঁজে পাইনি। তবে তার ব্যবহৃত জুতাসহ যে জাল দিয়ে শিক্ষার্থীকে আক্রমণ করা হয় এসব আলামত পেয়েছি। পরে ফুটেজ দেখে আমরা প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তকে শনাক্ত করতে পেরেছি।“

জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “নারী শিক্ষার্থীকে আক্রমণ ও ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।  আমরা পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে যেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি। প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি যাতে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও দোষী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে বিচার নিশ্চিত করা যায়।“

এ বিষয়য়ে আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “এ ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে একটি দল কাজ করছে এবং র‍্যাবও যুক্ত আছে। আশা করছি অতিদ্রুত আমরা অপরাধীকে ধরতে পারব।“