প্রধানমন্ত্রী: ভূমিসেবা নিতে মানুষকে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না এবং দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভূমির মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ, মৌজা, সি-এস, আর-এস কিংবা ডি-এস—এসব বিষয়ের সঙ্গে জমির মালিকরা পরিচিত। আগে এসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের জন্য মানুষকে ভূমি অফিসে যেতে হতো। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এখন ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে।”

তিনি বলেন, “বর্তমানে সেবাগ্রহীতারা ঘরে বসেই অনলাইনে জমিজমা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। আর যারা নিজেরা অনলাইনে খাজনা পরিশোধ বা প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী জানান, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় দেশের ৬১টি জেলায় বর্তমানে ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে নাগরিকরা সহজেই ভূমিসেবার আবেদন ও সরকারি ফি পরিশোধ করতে পারছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, “নাগরিকদের হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা পৌঁছে দিতে ‘ভূমি’ মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যায়, জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত সহজ হয়ে যায়।”

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, অনলাইনভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনার ফলে জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ কমবে এবং ভূমি অফিসে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে চলমান ভূমিমেলা জনগণকে আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও সচেতন করবে।

তিনি বলেন, “দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা ও জটিলতাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পারিবারিক শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।”

এ বাস্তবতায় পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা সময়ের অপরিহার্য দাবি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুতে কাজ করছে ভূমি মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।”

তারেক রহমান বলেন, “দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে ভূমিসেবা মেলার আয়োজন এবং জমি ব্যবস্থাপনাকে সহজ করার বিষয়টি জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারেও উল্লেখ ছিল।”

তিনি বলেন, “আজ থেকে সারাদেশে তিনদিনব্যাপী এ ধরনের ভূমিসেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেওয়া আরও একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জমি শুধু একটুকরো সম্পদ নয়, এটি মানুষের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।”

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।”

এরপর বোতাম টিপে মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ভূমি মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকাশনার মোড়কও উন্মোচন করেন তিনি।

উদ্বোধনের পর একযোগে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় মেলা শুরু হয়। আগামী ২১ মে পর্যন্ত এ মেলা চলবে। নাগরিকদের নতুন ডিজিটাল ভূমিসেবা সম্পর্কে পরিচিত করা এবং কিছু সেবা সরাসরি মেলা প্রাঙ্গণে প্রদান করাই এ মেলার মূল উদ্দেশ্য।

উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী ভূমি ভবনের বিভিন্ন স্টল ও সেবাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে কল সেন্টার, নাগরিক সেবাকেন্দ্র ও ডে-কেয়ার সেন্টারও ঘুরে দেখেন।

মেলার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা ভূমি পোর্টালে নিবন্ধন, অনলাইনে ই-নামজারির আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও ডিআরসি সংগ্রহ এবং মৌজা ম্যাপ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা সম্পর্কে জানতে পারবেন।

এছাড়া, মেলা প্রাঙ্গণেই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সেবা দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ই-নামজারির আবেদন গ্রহণ, খতিয়ানের সত্যায়িত অনুলিপি বিতরণ এবং ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ।