গোপালগঞ্জের ৩ যুবককে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ভুক্তভোগী পলাশ শেখের বাবা মো. জামিল শেখ একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগীরা হলেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোষেরচর উত্তরপাড়া গ্রামের মো. জামিল শেখের ছেলে পলাশ শেখ , সুতিয়ারকুল গ্রামের নুরুল ইসলাম ফকিরের ছেলে রনি ফকির ও বলাকৈড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে সৌরভ মোল্লা ।
অভিযোগে ভুক্তভোগী ৩ যুবকের বয়স উল্লেখ করা হয়নি।
এ ব্যাপারে ঢাকার খিলক্ষেত থানায় অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার “জাবাল ই নূর ইন্টার ন্যাশনাল লিমিটেডের” সত্ত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান গোপালগঞ্জের ৩ যুবককে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে রাশিয়ায় কনস্ট্রাকশন সাইটে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। পরে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা করে আদায় করেন। গত ৭ মে গোপালগঞ্জের ৩ জনসহ মোট ৩০ জন বাংলাদেশিকে একটি ফ্লাইটে রাশিয়ায় পাঠান।
রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেশটির সেনা বাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে জানানো হয়েছে।
ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রাশিয়া পৌঁছানোর পর তাদের চুল কেটে দেওয়া হয়। সামরিক পোশাকের মাপও নেয়। তাদের দিয়ে যুদ্ধ করানো হবে বলে জানিয়ে মোবাইলও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তারা ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে।
পলাশ শেখের স্বজনের অভিযোগ, টেকনোলজি কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে রুশ আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে ১ বছরের চুক্তিতে বিক্রি করা হয় তাদের।
তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে জাবাল ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এজেন্সি আগে থেকেই জানতো।
অভিযোগের বিষয়ে খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “গোপালগঞ্জের ৩ যুবককে রাশিয়ায় নিয়ে সে দেশের সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগকারীকে পরামর্শ দিয়েছি। তারা বৈধভাবে সরকারি প্রক্রিয়ায় বিদেশে গেছেন, তাই আগে বিএমইটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানাতে হবে। এছাড়া তাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে বিএমইটিতে অভিযোগ দায়ের করে সেই কপি আমাদের কাছে আনলে আমরা মামলা নেবো । এই মুহূর্তে আমরা শুধু অভিযোগটি থানায় নথিভুক্ত করে রেখেছি। এখনো কোনো মামলা দায়ের করিনি , কারণ বিষয়টি মূলত বিএমইটির আওতাধীন রয়েছে । এ ব্যাপারে বিএমইটি কাজ করবে। ”
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে প্রাণ নিয়ে সংশয়ে থাকা রনি ফকিরের স্ত্রী তৃষা বেগমের অভিযোগ, তার স্বামী ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দালালের মাধ্যমে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার জাবাল ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নির্মাণকাজের চাকরি দেওয়ার প্র্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো হয় তাকে।
“৭ লাখ টাকা পরিশোধের পর গত ৭ মে রনিসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে একটি ফ্লাইটে রাশিয়া নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।”
তার স্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী, এসএমএস ও অডিও বার্তার মাধ্যমে ভুক্তভোগী রনি জানিয়েছেন, তাদের একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, চুল কেটে ফেলা হয়েছে। বন্দুকের মুখে জিম্মি করে সীমান্তবর্তী ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে।
১৮ মে (সোমবার) শেষবার স্ত্রীকে রনি জানান, তারা রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি একটি সেনা ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। সেখানে গুলি ও বিফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে । জীবন নিয়ে সংশয় ও অজানা অতংকের মধ্যে আছেন বলেও তিনি স্ত্রীকে জানিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, “সৌরভের মাকে বিষয়টি বিস্তারিত জানানো হয়নি, কারণ তিনি অসুস্থ।”
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৌশিক আহমেদ বলেন, “বিষয়টি আমরা শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সবাইকে এ ধরনের ঘটনায় সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে এই অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরা সতর্ক হতে পারে।”
এছাড়া এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।