টাকা বাঁচাতে গিয়ে ট্রাকে ঈদযাত্রা, দুর্ঘটনায় ১৫ শ্রমজীবীর মৃত্যু 

টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাকে উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮ জন। নিহত-আহতদের সবাই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। 

সোমবার (২৫ মে) ভোরে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের উপজেলার জোগারচর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাকটিতে প্রায় ২২ জন যাত্রী ছিলেন। মূলত কম খরচে বাড়ি ফেরার তাড়না আর পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার স্বপ্নই কাল হয়েছে এই খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষগুলোর জন্য। 

নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নওগাঁর মান্দা উপজেলার মো. সাগর মিয়া (২০), একই এলাকার রবিউল ইসলাম (২৫), রাজশাহীর তানুর উপজেলার ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল (৬০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মামুন (৪৫), নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার সারিকুল (২৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার মো. বারি (২১), একই উপজেলার বাদশা (৩২) নওগাঁর পাকুরিয়া গ্রামের গিয়াস (২০) একই এলাকার মাইনুল (২৮) রাজেন্দ্রবাটি এলাকার ইয়াকুব ও একই এলাকার তারেক (২০)।  বাকি ৩ জনের পরিচয় সংবাদ লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 

আহতরা হলেন- নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাবু (৩৫), একই উপজেলার আব্দুল রহমান (৩৫), নাটোরের নয়ন বিশ্বাস (৩২), দশপাড়া গ্রামের তুহিন,  নওগাঁর মান্দা উপজেলার আলমগীর (৪০), একই উপজেলার সিদ্দিক আলী (৪০), খোরশেদ এবং সমেজ। 

ট্রাকের যাত্রী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রডবোঝাই ট্রাকটি চট্টগ্রামের অলংকার থেকে বেশ কয়েকজনযাত্রী নিয়ে কম ভাড়ায় নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার উদ্দেশ্য রওনা হয়। পরে ফেনী থেকে আরো বেশ কয়েকজন যাত্রী উঠেন। ভোর ৪ টার দিকে ট্রাকটি ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের জোগারচর এলাকায় পৌঁছালে উল্টে যায়। এতে রড ও ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। 

পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয়দের সহযোগীতায় আহত ও নিহতের উদ্ধার করা হয়। 

পুলিশ জানায়, প্রথমে নিহতদের লাশ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। 

এ ব্যাপারে যমুনা সেতু পূর্ব থানার এসআই আব্দুল হান্নান বলেন, “রডবোঝাই ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে। মূলত চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে রাস্তার পাশেই পড়ে যায়।” 

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে ১৫ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। এছাড়া আহত অবস্থায় ৯ জন ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ৫ জন ছুটি নিয়ে চলে যায়। এছাড়া বাকিরা ভর্তি রয়েছেন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।” 

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশেই ট্রাকটি উল্টে রয়েছে। এর মধ্যে রডগুলো মাটিতে পড়ে রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ভিড় করছেন। নিহত ও আহতদের সবাই নোয়াখালী ও ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুল ও পুরোনো মোবাইল ফোন কিনতেন। 

ট্রাকের যাত্রী রবান্নী বলেন, “আমি ঘুমের অবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ করেই দেখি ট্রাক উল্টে গিয়েছে। এরপরে আর কিছুই বলতে পারবো না। আমরা ট্রাকে ২২ জন যাত্রী ছিলাম।” 

ট্রাকের আরেক যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, “ট্রাকটি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলা যাবে। আমরা চাপাইনবাবগঞ্জের যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অলংকার থেকে উঠেছিলাম। মূলত বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৭০০ থেকে ১৮০০ করে চাওয়া হয়। কম টাকার জন্য আমরা ট্রাকে উঠি। আমরা ৪ জনে ২৩০০ টাকা ভাড়া দি। আমার ২ জন মারা গেছে।” 

নিহতের এক আত্মীয় বলেন, “আমার ৩ জন আত্মীয় মারা গেছে। রাত ১০ টায় তারা নওয়া যাওয়ার জন্য কম টাকায় ফেনী থেকে ট্রাকে উঠে। ফেনী থেকে বাস ভাড়া ১৭০০-১৮০০ টাকা চাওয়া হয়। কিন্তু ট্রাকে জনপ্রতি ভাড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। কম টাকায় ট্রাকে উঠায় তাদের এমন মৃত্যু হলো।”